জমি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জমি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঈশ্বরদীতে কৃষিজমির মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের মধ্যরাত অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক:  ঈশ্বরদীতে ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান সরকার। তার সঙ্গে ছিলেন ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার ও ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিনুজ্জামান। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধ করতে এই ‘রাত্রিকালীন অভিযান’ চালানো হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বিচারে মাটি কাটার ফলে উর্বর ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে এবং জমির দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এটি স্থানীয় পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, যারা আইন অমান্য করে অবৈধভাবে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ সময় তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ড রুখতে স্থানীয় জনগণকে সচেতন হওয়ার এবং তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

ঈশ্বরদীতে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়, হুমকিতে কৃষি ও সড়ক


নিজস্ব প্রতিবেদন: ঈশ্বরদীতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। দিন-রাত এস্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে পরিবহনের ফলে একদিকে যেমন আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ পাকা সড়ক।
 
বুধবার সরেজমিনে ঈশ্বরদী উপজেলার অরনকোলার বাগবাড়িয়া ও মুলাডুলির প্রতিরাজপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমিতে পুকুর খননের নামে চলছে মাটি কাটার মহোৎসব। অন্তত ১০টি ট্রাক্টর অবিরাম মাঠ ও রাস্তা দিয়ে মাটি বহন করছে। এতে এলাকায় প্রচণ্ড ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রতিরাজপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরিষা খেত থেকে এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে তিন থেকে চার ফুট গভীর করে মাটি কাটা হচ্ছে। এসব মাটি যাচ্ছে পাশের ইটভাটাগুলোতে। ভেকু চালক দেলোয়ার হোসেন জানান, অরনকোলা এলাকার মাটি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম তাঁদের ভাড়া করেছেন। ঘণ্টা ও দিন চুক্তিতে তাঁরা মাটি কেটে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন।

মাটি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম জানান, জমির মালিক সলিমপুর ইউনিয়নের মিরকামারি এলাকার জহুরুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গেই পুকুর খননের চুক্তি হয়েছে। তবে ফসলি জমির মাটি কাটা বা বিক্রির বিষয়ে প্রশাসনের কোনো অনুমতি তাঁর নেই। তবে সব পক্ষকে 'ম্যানেজ' করেই কাজ চালাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে মাটি ক্রেতা ইটভাটা মালিক জিন্নাহ আলী বলেন, ইট তৈরির জন্য মাটির প্রয়োজন, তাই আশরাফুলের কাছ থেকে কিনছি। তিনি কার জমি কাটছেন বা অনুমতি আছে কি না, তা আমাদের জানা নেই।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিন বলেন, জমির উপরিভাগের মাটিতেই ফসল উৎপাদনের মূল শক্তি থাকে। এই মাটি কেটে ফেললে সেই জমিতে পুনরায় আগের মতো ফলন পেতে অন্তত ২০ বছর সময় লাগে। অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা মাটি কাটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি আরও জানান, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমতির প্রয়োজন হয়, যা এখানে মানা হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে উপজেলায় আবাদি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে।

ঈশ্বরদীতে এক দশকে আবাদি জমি কমেছে ৬৪৮ হেক্টর

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈশ্বরদীতে যত্রতত্র কলকারখানা নির্মাণ, তিন ফসলি জমিতে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহনের কারণে গত এক দশকে চাষযোগ্য জমি কমেছে প্রায় ৬৪৮ হেক্টর। এতে প্রতি বছরে কেবল ধানের উৎপাদনই কমেছে ৯৩৫ মেট্রিক টন।

উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে মোট ফসলি জমি ছিল ১৮,২৪৯ হেক্টর, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭,৬০১ হেক্টরে। উপজেলার চরাঞ্চলের (পাকশী, লক্ষীকুন্ডা, নবীনগর) বিতৃর্ণ এলাকার ফসলি জমির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটভাটার কারণে। উপজেলায় মোট ৪৯টি বৈধ ও অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় ১৭০ হেক্টর চাষযোগ্য জমি নষ্ট করছে।

রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের জন্যও ২৯৪ একর জমি অধিগ্রহণ হয়েছে, যেখানে এক সময় গম, সবজি, ডাল ও তৈলজাতীয় শস্য উৎপাদন হতো, এখন সেখানে আবাসন গড়ে উঠেছে। এছাড়া অরকোলা মাঠ, বাঘহাছলা, মুলাডুলি, খয়েরবাড়িয়া, পতিরাজপুর ও আরকান্দি এলাকায় বিস্তীর্ণ তিন ফসলি জমিতে ছোট ছোট আবাসন ও মিল কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানা ও আশেপাশে খনন করা পুকুরের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যা ফসলি জমি ধ্বংস করছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত দশকে শুধু ধান ও সবজির জমি কমেছে ১৫০ থেকে ১৭০ হেক্টর। ফলে এ অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯,৩৫০ মেট্রিক টন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, রাজশাহী-ঢালারচর রেলপথ নির্মাণ ও খামার স্থাপনের কারণে তিন ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অরণকোলা মাঠে খামারের জন্য পুকুর খনন এবং জলাবদ্ধতার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই ধান তলিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাপক হারে কমছে।

কৃষি জমি সুরক্ষা আইনের খসড়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকার জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের সকল কৃষিজমি শুধু কৃষি কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং কৃষি জমিতে স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। দুই বা তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করা যাবে না।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, ফসলি জমিতে আবাসন ও অন্যান্য কাজের আগে স্থানীয় কৃষি অফিসের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা ছাড়া কৃষি জমির অপচয় রোধ সম্ভব নয়। নইলে দ্রুত ফসলি জমি কমার কারণে ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতির সমস্যা দেখা দেবে।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন