অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিলেন জাহেদুল হাসান

নিজস্ব প্রতিবেদক: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে ১৬ মেগাপাসকেল চাপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া গত শনিবার দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও দেশে এসে পৌঁছেছে। এমন সময় প্রকল্পের ব্যয়, নিরাপত্তা ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু নেতিবাচক প্রচারণা সামনে এসেছে। এ বিষয়ে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ড. জাহেদুল হাসান প্রাতিষ্ঠানিক নথি, পরিসংখ্যান ও সরকারি আদেশের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রকল্পের শুরু থেকেই পারমাণবিক ভীতি, ব্যয় ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হলেও সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসানকে লক্ষ্য করে কিছু অভিযোগ প্রচার করা হয়। কর্মরত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা বলছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের তথ্য প্রচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পুরো কর্মীবাহিনীর মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আজ সোমবার ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে গঠনমূলক সমালোচনা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অসম্পূর্ণ তথ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করলে প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা এবং একাধিক পদের জন্য পৃথক বেতন নেওয়ার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে ড. জাহেদুল বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁকে উচ্চতর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ২০২৫ সালের জুন থেকে এনপিসিবিলের পূর্ণকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে শুধু নির্ধারিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।

একইভাবে জনবল ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানে মোট ১ হাজার ৯২২ জন নিয়োগ পেলেও ৯৯৭ জন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ২৭ জন (প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ) প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন। ১৬ থেকে ১৯ গ্রেডের প্রায় ১০০ কর্মীর প্রস্থানকে বিশেষায়িত পারমাণবিক জনবলের পদত্যাগ হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই, কারণ তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন সহায়ক পদের কর্মীরাও ছিলেন। এ ছাড়া শপ ম্যানেজারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্ষমতাপ্রাপ্ত বোর্ড কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়ে থাকে।

রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসান স্পষ্ট করেন, এই ব্যবস্থা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হয়নি। তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাশিয়ায় অবস্থানরত পরিদর্শকদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার আর্থিক বিষয়াদি প্রকল্পের জেনারেল কন্ট্রাক্টর জেএসসি এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (এএসই) পরিচালনা করে। বিভিন্ন সময়ে ৪১ জন কর্মকর্তা সরকারি আদেশ (জিও) নিয়ে এসব অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন এবং তাঁরা কোনো হোটেল ভাতাও গ্রহণ করেননি। প্রায় ৭৭ লাখ টাকা বাসা ভাড়া আত্মসাতের অভিযোগকে ‘মূলহীন ও ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ছয় সদস্যের অভ্যন্তরীণ অডিট দল (যাতে রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের দুই কর্মকর্তাও যুক্ত ছিলেন) বিষয়টি তদন্ত করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

ড. জাহেদুল হাসান আরও উল্লেখ করেন, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আর এনপিসিবিএল হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেটিং অর্গানাইজেশন। তাই কমিশনিংয়ের মতো প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া ও বিলম্বের বিষয়গুলোকে এককভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর চাপানো যৌক্তিক নয়। রূপপুর দেশের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বৃহৎ জাতীয় প্রকল্প উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে অফিস আদেশ, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত, সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং অডিট প্রতিবেদন যাচাই করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন