মতামত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মতামত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

জীবন সংগ্রামের পাতা থেকে

মোঃ আব্দুস সামাদ
ব্যাচ-১৯৮২
বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে পিছন ফিরে দেখার বা তাকাবার সময় কই। সবাই আমরা ব্যস্ত জীবন সংগ্রামের লড়ায়ে। তবুও পুনর্মিলনী বলে কথা। সবাই একসাথে হলে শিশুকাল, বাল্যকাল, কৈশর, শৈশবের অনেক কথাই স্মৃতির পাতায় জেগে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। এরই কিছু কথা আসন্ন পুনর্মিলনীর স্মরণিকার পাতায় আটকে রাখতেই আমার আজকের লেখা। পবিত্র কুর'আনে মাহন আল্লাহ তালা বলেছেন" আসলে আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতির অবস্থা বদলান না যতক্ষণ না তারা নিজেদের কর্ম বা গুনাবলী বদলে ফেলে"। সুরা রাদ, আয়াত-১১ (আয়াতাংশ)। আর এই অবস্থা বদলানোর জন্যই যত লেখাপড়া, কর্মব্যস্ততা ও সংগ্রাম। তাই ফিরে দেখা স্কুল জীবনের শুরু থেকে শেষ।

বাঘইল প্রাথমিক বিদ্যালয় ছোট ওয়ান, বড় ওয়ান, টু থ্রি ফোর ফাইভ শেষ। তারপর বাঘইল উচ্চ বিদ্যালয় ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী, শুধুমাত্র মানবিক বিভাগ, তখনও ভিজ্ঞান ও বানিজ্য বিভাগ খোলা হয়নি। বেশ বড় হোলেই বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছোট ওয়ানে ভর্তি করে দেন। সবুজ সাথী, ধারাপাত ও আদর্শ লিপি বই নিয়ে লেখাপড়ার যাত্রাশুরু হয়। শ্রেণীকক্ষে আসনের তুলনায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশী হওয়ায় গাদাগাদি করে বসার পরেও দু-চারজনকে দাড়িয়ে থাকতে হতো। এখনকার মত ড্রেস কোডের কোন বালাই ছিল না। বেশীর ভাগ ছাত্র ছাত্রী যে যার মত জুতা স্যান্ডেল ছাড়াই হাফপ্যান্ট, পাজামা, লুঙ্গি, গেঞ্জি, জামা পরে স্কুলে যেতাম। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মানও তেমন ভাল ছিলনা। বাচ্চাদেরকে যে যার মত করে পোষাক পরিয়ে স্কুলে পাঠাতো। বড় ওয়ানের বার্ষিক পরীক্ষা হওয়ার আগেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে যায় এবং স্কুলের ক্লাসও বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে সাবাই অটো পাশ। আব্বা তাতে নারাজ, অটো পাশ না নিয়ে আমাকে পূর্বের ক্লাসেই পড়ালেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাষ্টারগন খুবই ভাল অভিভাবক সুলভ ছিলেন। লেখা পাড়ার ব্যপারে সবাই খুব যত্ন গুরুত্ব দিতেন এবং যত্ন নিতেন। বিশেষ করে হেড মাষ্টার করিম মৌলোভী স্যার, ওলি স্যার, ইয়াকুব স্যার ও বিশু স্যার (পুরা নাম না জানার কারনে সংক্ষিপ্ত নাম লিখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি) লেখাপড়া ও শৃংখলার ব্যপারে খুবই কঠোর ছিলেন। ভয় দেখানোর জন্য বেত ক্লাসে নিয়ে আসতেন তবে পড়া না হলে শান্তির জন্য বেত দিয়ে খুব কমই পেটাতেন। বেত দেখেই আমরা ভয় পেতাম। বেতের মারের কারনে সে সময় স্যারদের নির্দয় মনে হলেও বড় হয়ে বুঝেছি তাঁরা সে সময় যা করেছেন তা আমাদের কল্যাণের জন্যই করেছেন। আনেক স্যার পড়া না পারলে বসার বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন। আবার কোন কোন সময় যারা পড়া পারত না তাদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখে একই পড়া যে পারত তাকে দিয়ে তাদের কান মোলিয়ে দিতেন। ছোট ওয়ান এবং বড় ওয়ানের ক্লাস শেষে ঈদগাহের ভিতরে আমগাছ তলায় গোল হয়ে বৃত্তের মত দাঁড় করানো হত এবং বৃত্তের মাঝখানে একজনকে ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসাবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাকে দিয়ে শুরের তালে তালে শতকিয়া ও নামতা পড়ানো হত। তারপর ছুটি দেয়া হত। ছোট বেলায় শীতের সকালে খালি পায়ে, বর্ষাকালে কাদা পায়ে, বৃষ্টিতে কলাপাতা ও মানপাতা মাথায় দিয়ে এবং গরমকালে বিশেষ করে চৈত্র মাসের সূর্যের তাপে রাস্তার গরম ধুলায় খালি পায়ে পাড়ার সকল ছেলে মেয়েরা দলবেঁধে গলাগলি ধরে স্কুলের যাতায়াতের স্মৃতিগুলো, বাবই পাখির বাসা গোল করে সুতলি দিয়ে বেঁধে অথবা কারো গাছের বাদাম (জাম্বুরা) পেড়ে ফুটবল বানিয়ে খেলার স্মৃতিগুলো মনের কোনায় ভেষে উঠে। সত্যই এগুলোছিল অদোপাড়াগাঁয়ের অকৃত্তিম মেলামেশা ও ভালবাসার দৈনন্দিনের চিত্র যার সাথে বর্তমানের কোন দূরতম মিল নেই। বর্তমানের আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে এগুলো রূপকথার কাহিনীর মত মনে হয়। যুদ্ধপরবর্তী দেশের সামাজিক/আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল।
 
ফলে প্রাথমিক স্তরেই আমাদের অনেক সহপাঠির লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া জীবনের কিছু স্মরণীয় ঘটনা মনে হলে একা একাই হাঁসি পায়, কখনও নিজেকে খুব বোকা লাগে আবার কখনও সেগুলো আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রেরণা জুগিয়েছে। যেমন আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র, শিক্ষকগন বলে দিলেন যে, বার্ষিক পরীক্ষায় দশ লাইন কবিতা মুখস্থ বলতে হবে। কবিতা মুখস্থ বলতে হবে শুনে আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম, কোথায় পাই কবিতা। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের যেয়ে কবিতার বই বিক্রেতার কাছ থেকে গরিবের ছেলে শাহজাহান এবং ফুল মালা নামে দুইটি কবিতার বই কিনে এনে দুই পাতা করে চার পাতা মুখস্থ করে নিলাম। মনের কাছে খুব পুলকিত ভাব লাগছে। এখন আর ঠেকায় কে? কিন্তু তারপরও মনের কাছে কেমন যেন খটকা লাগছে এই ভেবে যে, ক্লাসের পরীক্ষায় ক্লাসের বইয়ের পড়া বাদ দিয়ে বাহিরের বইয়ের পরীক্ষা নিবে এ আবার কেমন কথা। আমি যে এমন প্রস্তুতি নিয়েছি বিষয়টি ক্লাসের অন্য কারো সাথে আলাপও করছি না সবাই জেনে যাবে বলে। পরীক্ষার দিন সমাগত হল। আমার রোল তিন, প্রথম জন পরীক্ষা দিয়ে বের হলে দ্বিতীয় জন পরীক্ষা দিতে ঢুকল এই ফাঁকে আমি প্রথম জনকে "সে কোন কবিতার ১০ লাইন মুখস্থ বলেছে জিজ্ঞাসা করতেই বলল আমাদের গ্রাম কবিতার প্রথম ১০ লাইন বলেছে"। এবার মনের খটকা ভাঙলো। বাংলা বইয়ের সূচীপত্রে লেখা ছিল "গদ্য" মানে গল্প এবং "পদ্য" মানে কবিতা। পদ্য মানে কবিতা এটা তখনও আমার অজানা ছিল বিধায় এমন ঘটনা ঘটেছিল। আর একটি ঘটনা ৫ম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষার সকল প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষা দিতে না পারা। বৃত্তি পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল নাজিমউদ্দিন হাইস্কুল। কথা ছিল প্রথম পরীক্ষার দিন সকালে রিক্সাযোগে সবাই একসাথে যাব। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মত ভাল ছিল না। রিক্সা কমছিল, ইটের রাস্তা ও পায়ে হাঁটা পথ। পরীক্ষার আগের দিন যোগাযোগ না হওয়ায় পরীক্ষার দিন আমাকে ছাড়াই নতুন হাট হয়ে পাকা রাস্তা দিয়ে সবাই পরীক্ষা সেন্টারে চলে যায়। আমি বাড়ির সামনে অনেকক্ষন দাড়িয়ে থেকে কাউকে না পেয়ে হেঁটেই ঈশ্বরদী যায়। কিন্তু নাজিমউদ্দিন হাইস্কুল কোথায় চিনি না। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর পরীক্ষা কেন্দ্র পেলেও ততক্ষনে এক ঘন্টা সময় পার হয়ে গেছে। দুঃখ কষ্টে পরীক্ষা না দিয়েই বাড়ি ফিরি। ইনফরমেশন এবং কমিউনিকেশন গ্যাপের কারনে এমন ঘটনা ঘটেছিল। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমার জীবনে এমন ঘটনা আর ঘটতে দেইনি। এভাবেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে।

বাঘইল প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাঘইল উচ্চ বিদ্যালয় এল প্যাটার্নে দুটি পাকা ভবন। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে শুরু হল হাইস্কুল জীবন। তবে হাইস্কুল শুধু একটি ভবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাদের সময় ঈদগাহের দেয়ালের পাশ দিয়ে একটি এবং কলের খাদের পাড়দিয়ে একটি বাঁশের চ্যাগারের বেড়ার দুটি টিনের ঘর ছিল, সেখানে ক্লাস হত। প্রথমে ছেলেদের জন্য কোন টয়লেট ছিল না, পরে ছেলেদের জন্য একটি টয়লেট তৈরী করা হয়। যদিও হাইস্কুলের শিক্ষক মন্ডলিগনের মুখ পরিচিত ছিল তবুও লেখাপড়ার জন্য তাঁদের সাথে নতুন অধ্যায় শুরু হল। আগে বেতন দিতে হত না। এখন বেতন দিতে হয়। ৬ষ্ঠ শ্রেনীর মাসিক বেতন ছিল ৫.৫৫ টাকা আর ৭ম শ্রেণীর বেতন ছিল ৬.২৫ টাকা। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাস হত প্রাইমারী স্কুল ভবণ এবং হাইস্কুল ভবনের কোনে একটি ইটেরে দেয়ালের উপরে টিন সেড ঘরে। হাইস্কুল জীবনটা আমার খুব সরল সহজ ছিল না। জীবন সংগ্রামের প্রতিকূলতার সাথে সর্বদাই যুদ্ধ করে চলতে হয়েছে। আমি আগেই বলেছি সাধীনতা পরবর্তী দেশে তখন প্রায় প্রতিটি পরিবারকেই অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। তাছাড়াও সে সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল বেশ। গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারই কৃষি ও দিনমজুরের উপর নির্ভরশীল। এক বছর অতিবৃষ্টি অন্য বছর খরা এভাবে কৃষকরা ফসল না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ব্যবসায়ীরাও যুদ্ধে ক্ষাতিগ্রস্থ হওয়ার পর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তেমন ভাল করতে পারে নাই। হাতেগোনা কিছু চাকরীজীবিরাই কেবল দুবেলা চারটা খেতে পেরেছে। আমাদের ১৫/১৬ জন সদস্যের বড় সংসারটা মূলত কৃষি ও বাবার ব্যবসায় নির্ভর ছিল। প্রাকৃতিক কারনে কৃষি মন্দা এবং যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাবার ব্যবসায় মন্দা দুটোই আমাদের সংসারটাকে গলা চিপে ধরে। অভাব অনটনের কারণে এক পর্যায়ে বাবা জমি বিক্রয় করা শুরু করে।

এক বিঘা জমি বিক্রয়ের টাকায় ৫/৬ সপ্তাহের বেশী সংসার চলত না। দেখা দেয় চরম ও অবর্ণনীয় অভাব যা বর্ণিত হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বা বর্তমান প্রজন্মের কাছে রূপকথার কাহিনীর মত মনে হবে। সব বর্ণনা করে লেখার কলেবর বৃদ্ধি না করে সংক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা আসন্ন পুনর্মিলনীর স্মরণিকার পাতায় আবদ্ধ করলাম।

পূর্বেই বলেছি ৭ম শ্রেণীর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬.২৫ টাকা। অভাবের কারণে স্কুলের মাসিক বেতন দিতে না পারায় এক পর্যায় স্কুলের খাতা থেকে আমার নাম কেটে দেয়া হয়। এটা আমার বাবার জন্য যেমন খুবই অপমানজনক ছিল তেমনি বিব্রতকরও ছিল বটে। আর আমার কাছে ছিল যেমন জীবন গড়ার পথে অসম দেয়াল বা বাধা তেমনি ছিল জীবনে চলার পথে সকল বাধাকে অতিক্রম করার দৃঢ় প্রত্যয়ের এক অনুপ্রেরণা। স্কুলের প্রশাসনের বিরুদ্ধে আমার চরম ক্ষোভ ও জেদ জন্মে যে, যেই স্কুল থেকে আমার নাম কেটে দেয়া হল সেই স্কুলের সকল দায় পরিশোধ করে আমি আবার ভর্তি হব এবং কোন ক্রোমেই আমি এ জীবন সংগ্রামে পরাজিত হব না। সে বছর আর আমার পড়ালেখা হোল না। শুরু হোল লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিশ্রম করে উপার্জনের সংগ্রাম। নামাজ পড়ে অথবা নামাজ ছাড়া একাগ্র চিত্তে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতাম যেন মহান আল্লাহ আমার ও আমাদের পরিবারের প্রতি সহায় হন। জমিতে লাঙ্গল বওয়া, ধান বোনা, ধান নিড়ানো, ধান কাটা, রবি বা চৈতালী ফসল চাষ করা, কাটা মাড়াই করা। পদ্মা নদী, কলের খাদে, বাঘইলের গাঙ্গে, বলরামের খাদে, কৈমারা তিনকোনা বেলতলা ইত্যাদি খাদে মাছ ধরে হাট বাজারে বিক্রয় করা, বাবলা ও জিগা গাছের আঠা কেটে শুকিয়ে ঈশ্বরদীর বাজারে গাম হিসাবে বিক্রয় করা। ব্যবসায় করা যেমন হাট থেকে সবজি ক্রয় করে, আখের জমি থেকে আখ কিনে নিয়ে পাক্শীর বাজারে বিক্রয় করা। হাট বা গ্রামগঞ্জ থেকে পাট, হলুদ, মটর, মশুর, গম ইত্যাদি ক্রয় করে নিয়ে ঈশ্বরদীর বাজারে আড়তে বিক্রয় করা। আবার জানুয়ারী/ফেব্রুয়ারী (যে সময় বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ক্লাস হত না) মাসে কৃষকের কেশর আলুর ক্ষেত জমি ধরে ক্রয় করে নিয়ে সারাদিন ধরে তুলে রাতে ধুয়ে বস্তা ভরে রেখে শেষ রাতে আযানের আগে রিক্সা করে নিজে চালিয়ে ঈশ্বরদীর বাজার নিয়ে বিক্রয় করা। গমের বিনিময়ে রাস্তা নির্মাণের মাটি কাটা এবং বাড়ি বাড়ি টিউশনি করা। এ সংগ্রাম থেমে থাকার সংগ্রাম ছিল না, এটা ছিল প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ের সংগ্রাম আর স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফি ও অন্যান্য খরচের টাকা জমানোর সংগ্রাম। যেভাবেই হোক আমাকে আবার স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হবে এবং যে কোন মূল্যে এস এস সি পাশ করতেই হবে। কারন তখন আমি এতটুকু বুঝতাম যে, সে সময়কার সামাজিক/রাষ্ট্রিয় প্রেক্ষাপটে এস এস সি পাশের একটি বোর্ড সার্টিফিকেট হলে আমি একটা তৃতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকরী পাব। এটাই আমার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এ স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ দেয়ার পথটি ছিল বড়ই সংগ্রামের। একটি দরিদ্র পরিবারে অভাব নিত্যদিনের কিন্তু একটি মধ্যবিত্ত পরিবার অভাবে পড়লে তার চিত্র কেমন হয় তা প্রকৃত ভূক্তভুগী পরিবার সংশ্লিষ্ট সদস্য ছাড়া অন্য কোন পরিবারের বোঝার কোন ক্ষমতা নেই। পরের বছর সমস্ত বকেয়া বেতন পরিশোধ করে আবার ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। ততদিনে আমার ছোট ওয়ান থেকে একই সাথে বেড়ে উঠা ক্লাসের সাথীরা অষ্টম শ্রেণীতে উঠে গেছে। নীচের ক্লাসের সাথীদের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া ছিল আমার জন্য খুবই কষ্টের ও লজ্জার বিষয় ছিল। কিন্তু সেদিন আমাকে সকল কষ্ট ও লজ্জাকে উপেক্ষা করে অগ্রসর হতে হয়েছিল। কারণ এটা কোন অগৌরবের বিষয় ছিল না, এটা ছিল জীবনে সংগ্রামে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চ্যালেঞ্জ। আমাদের সময় ডক্টর মোঃ লুৎফর রহমানের একটি ছোট গল্পে (সম্ভবত শারীরিক পরিশ্রম গল্পে) পড়েছিলাম "কোন কাজই অগৌরব নয়, অগৌরব হয় মিথ্যা, মুর্খতায় আর হীনতায়"। অষ্টম শ্রেণীর একটি ঘটনা আমার জীবনের পরবর্তী সময়ের জন্য কষ্টের ও স্মরণীয় হয়ে আছে। একটি মাত্র জামা গরমের দিন গা-ঘেঁমে শরীরে টান লেগে ছিঁড়ে গেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মা আমার বড় ভাইকে তাঁর বিয়ের সময়ে দানে পাওয়া পিতলের ঘড়াটি (কলস) ঈশ্বরদী বাজারে বিক্রয় করে আমার জামা বানাতে এবং বাকি টাকা দিয়ে চাল কেনার জন্য বের করে দিলেন। বড় ভাই যথারিতী ঈশ্বরদীর বাজারে যেয়ে পুরাতন কাপড়ের বাজার থেকে একটি গাউন কিনে সে কাপড়ের জামা বানিয়ে ও বাকি টাকার চাল কিনে বাড়ি ফেরেন। সেই জামা গায়ে দিয়ে দুইদিন পর আমি স্কুলে যায়। অংকের মাষ্টার দুইদিন স্কুলে না আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে জামা না থাকায় স্কুলে আসতে পারিনি বলে অবগত করি।
 
তিনি আমাকে ফিরে আবার জিজ্ঞাসা করেন "এখন নতুন জামা হয়েছে"? উত্তরে আমি বলি হয়েছে এবং আমার গায়ের এটাই নতুন জামা। সেদিন আমার একথা শোনার পর ক্লাসের সকল ছাত্র/ছাত্রী এক সাথে তাচ্ছিল্যের অট্ট হাঁসিতে ফেটে পড়েছিল। কারণ জামাটি আমার কাছে নতুন হলেও ক্লাসের অন্য সবার কাছে ছিল নিতান্তই পুরাতন। তাই সেদিন সবাই হেঁসে উল্লোসিত হয়েছিল কিন্তু নিরবে আমার হৃদয় গভিরে যে বেদনার ক্ষত হয়েছিল তা কেহই সেদিন অনুধাবন করতে পারেনি। এখন আমার বা আমার পরিবারের কারো জামাকাপড় কিনার সময় সে সময়ের ক্লাসের দৃশ্যটি চোখে ভেসে ওঠে। অষ্টম শ্রেণী পেরিয়ে নবমে পদার্পন। তখনও আমাদের স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ খোলেনি। অনেকেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে বিধায় টিসি নেয়ে চন্দ্র প্রভা বিদ্যাপিঠ ও এস এম হাইস্কুলে চলে গেল। শত সংগ্রাম ও জীবনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমি অধম এখানেই রয়ে গেলাম কারণ আমার আর অন্য কোন পথ খোলা নেই। কিন্তু ঐ যে অভাগা যেদিকে চায় যেন সাগরও শুকিয়ে যায়। দশম শ্রেণী উঠার পরেই আমার লেখাপড়ায় প্রেরণার জোগানদাতা শ্রদ্ধেয়ে বড় ভাই হঠাৎ করেই মারা যান। যিনি প্রায়ই আমাকে এই বলে প্রেরণা জোগাতেন যে, দাদা আমরা লেখাপড়া না শিখে মুর্খ হয়েছি, তুমি ভাল করে লেখাপড়া কর যে লেখাপড়ার ভাগ আমরা কেউ নিতে পারব না। কৃষিনির্ভর সংসারের একমাত্র কান্ডারী ৭ সন্তানের জনক পৃথিবী ছেড়ে চলেগেলে আবার আমাদের সংসারটি অথৈ সাগরে পড়ে। আমার লেখাপড়া আবার বন্ধ করে সংসারের হাল ধরতে হয়। তিন মাস পেরিয়ে যাচ্ছে ক্লাসে যেতে পরছি না। অপর দিকে স্কুল থেকেও প্রধান শিক্ষক বার বার খবর পাঠাচ্ছেন ক্লাসে যোগদানের জন্য। বেতন না দিতে পারায় যে স্কুল থেকে ৭ম শ্রেণীতে আমার নাম কেটে দেয়া হয়েছিল আজ সেই স্কুল থেকেই বার বার ক্লাসে যোগদানের জন্য বাড়িতে খবর পাঠানো হচ্ছে। তার কারণটা প্রকাশ করে আমার প্রতিষ্ঠানের সুনাম খুয়াতে চাই না। তবে আমাকেও তো পরীক্ষা দিতেই এবং এস এস সি পাশ করতেই হবে। আর আমার এতটুকু আত্ববিশ্বাস আছে যে, আমাদের ব্যাচে যদি একজনও পাশ করে তবে সে জন হবো আমি। চতুর্মুখি প্রতিকূলতা, সংসারে অভাব, ৮ জন সদস্য রেখে বড় ভাই মারা গেলেন তাদের খরচ, এক্সট্রা ক্লাসের বেতন, এস এস সি পরীক্ষার ফিস ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চিন্তার শেষ নাই। আসন্ন এস এস সির ফরম পূরনের জন্য প্রয়োজন হবে ২৮০ টাকা কোথায় পাব। আগে থেকেই প্রস্তুতি নিলাম দুইটি খাসি ও কিছু মুরগী কিনে পালতে থাকলাম। অন্যদিকে প্রতিদিনের বাজার থেকে কিছু কিছু করে বাঁচিয়ে ঘরের বাঁশের খুঁটি কেটে পয়শা জমাতে থাকলাম। কিন্তু দুর্ভাগার দুর্ভাগ্য দুটি খাশির একটি খাশি মারা গেলে বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। অবশেষে ফরম পূরনের দিন সমাগত হলে খাশি মুরগি বিক্রির টাকা ও খুঁটি কাটার পয়সা মিলিয়ে মোট ২৮০ টাকা জমা দিতে পেরে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করি।

হাইস্কুল শিক্ষা জীবনে শত প্রতিকূলতার মধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষদের কাছে প্রেরণা পেয়েছি তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলায় ফরিদা আপা, অংকে মুকুল স্যার আর ইংরেজীতে খান স্যার। ফরিদা আপা অন্যান্যদের মত গাতানুগতিক ভাবধারায় পড়াতেন না। তিনি অনেকটা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়াতেন। ছাত্র ছাত্রীদের বাংলার নোট বই দেখে পড়তে নিষেধ করতেন। বাংলায় গল্প ও কবিতা তিনি এমন ভাবে বুঝিয়ে দিতেন যেন কোন ছাত্র/ছাত্রীর নোট বই পড়া না লাগে এবং আমি সুন্দর বুঝতাম আর অভিভূত হতাম এবং যে কোন প্রশ্নের উত্তর আমি নোট বই ছাড়াই লিখতে পারতাম। ছুটি গল্পের ফটিকের চরিত্র নিজে বানিয়ে লিখার প্রতিযোগীতায় আমি প্রথম হয়েছিলাম এবং প্রথম পুরষ্কারটি আমি পেয়ে ছিলাম। পুরষ্কার ঘোষনা করে অজানা নতুন বিষয়ের উপর তিনি লিখতে দিতেন যেমন "এই দিন সেই দিন", "যখন আমি ছোট্ট ছিলাম," "শীতের সকালে", "বসন্তের বিকেলে” ইত্যাদি। আনন্দের বিষয় হল প্রটিতেই প্রথম পুরষ্কারটি আমি লুফে নিয়েছি। বাংলা ছাড়া ইংরেজী বিষয়ে খান স্যার এবং অংকে মুকুল স্যার এমন সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিতেন ফলে এসব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ার কোন প্রয়োজন হয়নি আর প্রাইভেট পড়ার সামর্থ আমার ছিল না। ধর্মীয় শিক্ষক মুজিবুর রহমান স্যারের নামাজ পড়ানো ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে অবদানের কথা ভুলার নয়।
 
অনেক শিক্ষকের নাম উল্লেখ না করা হলেও তাঁদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্লাসরুমের পাশে স্কুলের জমিতে ক্লাস বিত্তিক সবজি বাগান করার প্রতিযোগতা হত। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা হত প্রতি বছর। খেলাধুলায় আমার তেমন কোন অংশ গ্রহন ছিল না। ছোট ওয়ান থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত শিশু, কিশোর, বাল্যজীবনের দূরন্তপনা, প্রতিযোগীতা, প্রতিকূলতা ও সকল সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে বিদায়ের ক্ষন উপস্থিত হয় ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে। এদিন আমাদের ক্লাসরুমটাকে লাল নীল রঙ্গিন কাগজের ফুলে সাজানো হয় এবং জানানো হয় আজ আমাদের এ স্কুল থেকে বিদায়ের পালা। একটি লালগোলাপ হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মায়া মমতার সুতো ছিঁড়ে বিদায় নিতে হল। সেদিন আমরা ১৪ জন বিদায় নিয়েছিলাম। আমাদের পরীক্ষার সেন্টার পড়েছিল ঈশ্বরদী সাড়া মাড়োয়ারী (এস এম) হাইস্কুলে। চন্দ্র প্রভা বিদ্যাপিঠ এর মানবিক বিভাগের রোল এক, এস এম হাইস্কুল মানবিক বিভাগের রোল এক এবং বাঘইল উচ্চ বিদ্যালয়ের রোল এক (আমার) আসন একই বেঞ্চে পড়েছিল। ফলাফল হয়েছিল প্রায় তিন মাস পরে। রেডিওতে বেলা তিনটার খবরে ফলাফল বের হবার খবর পাই। দৌড়ে চলে যায় পাকশী রেলওয়ে কন্ট্রোল অফিসে। সেখান থেকে বহু কষ্টে রাত আটার দিকে জানতে পারি দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছি। একদিন পরে স্কুল থেকে ফলাফল জানতে পারি। সেবছর আমরা ১৪ জনের মধ্যে ৪ জন পাশ করি। ২ জন (১ জন ছেলে ১ জন মেয়ে) দ্বিতীয় বিভাগে এবং ২ জন (১ জন ছেলে ১ জন মেয়ে) তৃতীয় বিভাগে। আমি সর্বোচ্চ ৫৫৬ নম্বর পেয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। এভাবেই বাইঘল প্রাইমারী ও হাইস্কুল জীবন সংগ্রামের ইতি ঘটেছিল। পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি আমাদের পথের দিশারী শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলীর মধ্যে যাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁদেরকে মহান রব ক্ষমা করুন এবং জান্নাতের উচ্চ আসন দান করুন এবং যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদেরকে ঈমান ও সৎ আমলের সাথে সুস্থ রাখুন। আমীন।

লেখক পরিচিতি:

মোঃ আব্দুস সামাদ, এস এস সি ব্যাচ-১৯৮২। জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারী ১৯৬৭ সার্টিফিকেট মোতাবেক। গ্রামের স্থায়ী ঠিকানা বাঘইল (পূর্বপাড়া সাঁকোর মুখ), ডাকঘর-পাক্শী, থানা-ঈশ্বরদী, জেলা-পাবনা। এস এস সি পাশ করে পাক্শী মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখানে ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে বিমানসেনা হিসাবে (নন-কমিশন) ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিয়ে চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হই এবং ১৬ জুলাই ১৯৮৩ তারিখে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগদান করি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হয়ে দেশে বিদেশে জাতীসংঘ মিশনে দক্ষতা ও সুনামের সাথে চাকুরী শেষে নন-কমিশনের সর্বশেষ পদ মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে ১২ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে অবসর গ্রহন করি। চাকুরীকালিন সময়ে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে Master of Arts Degree অর্জন করি। বর্তমানে আমি ঢাকাতে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত আছি। পরিবারিক ভাবে আমার দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে ঢাকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান


নিজস্ব প্রতিবেদক: আপনার কি গ্রামের বাড়ি আছে? অথবা আপনি কি গ্রামে বসবাস করেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয় তবে এই দুই ক্ষেত্রেই আপনি টের পেয়েছেন গ্রামের নারীদের কর্মকাণ্ড কেমন, কী নিয়ে এবং সেটা কত ব্যাপক! আমি যদি গেরস্তবাড়ির কিংবা দিনমজুরের ঘর থেকে শুরু করি তাহলে বলবো গ্রামের কোনো বাড়িতে হাঁস-মুরগির মাংস ও ডিম কিনে খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, এমনকি কিনে খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না সবজিরও।

উপরন্তু প্রতিটা বাড়ির গৃহিণীরা উঠান খামার করে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পরে আয়ও করে থাকেন। যুগ যুগ ধরে উঠান খামার খুব জনপ্রিয় একটা মাধ্যম গৃহিণীদের হাত খরচের পয়সা জোগাড়ের জন্য। সেটাই বর্তমানে আধুনিকায়ন হয়েছে অর্গানিক খাবারের হাত ধরে।

বিভাগীয় শহরগুলোয় এখন অর্গানিক খাবার খুব জনপ্রিয়। সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে বাজারজাত করা হয় গ্রামের নারীদের উঠান খামার থেকে সংগৃহীত পণ্য। তালিকায় কী নেই! শুটকি, ডালের বড়ি কিংবা পিঠা থেকে শুরু করে হাতে তৈরি নানাবিধ ঘরোয়া শুকনা খাদ্যদ্রব্য ও দুগ্ধজাত খাদ্যদ্রব্য!

এত গেল শুধু খাবারের কথা। গ্রামের নারীদের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম সেলাই ও হস্তশিল্প। সেই ক্ষেত্রটাও ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া পেয়ে এখন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। মধ্যসত্ত্বভোগী কিংবা বলা যায় আউটসোর্সিং করেন এমন ব্যক্তিরা দেশের বাইরে থেকে অর্ডার এনে গ্রামের নারীদের মাধ্যমে হস্তশিল্পের কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। ফলে নারীর আর্থিক সচ্ছলতা বহুগুণে বেড়েছে।

একটা ব্যাপার এখানে বেশ স্পষ্ট সেটা হলো—যতই প্রত্যন্ত গ্রাম হোক কোনো নারী চাইলেই তার নিজস্ব গণ্ডিকে এখন বর্ধিত করার ক্ষমতা রাখেন কারণ; ইন্টারনেট সুবিধা। প্রচুর নারীকে দেখেছি প্রথমে অন্যদের চাহিদা মতো সাপ্লাই দেওয়া শুরু করে পরবর্তীতে নিজেই অনলাইনে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সারা দেশব্যাপী তার উঠান খামারের বা হাতে তৈরি খাবারের বা হস্তশিল্প ডেলিভারি দিচ্ছেন। প্রি অর্ডার নিয়ে পণ্য তৈরি করছেন।

    গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সম্পর্কে আমরা জানি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। কৃষিভিত্তিক সেই কর্মযজ্ঞে মোট শ্রমদানকারীর ৫৭ শতাংশ যে নারী এটাও আমরা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানি। আরও জানি কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত ২১ ধাপের মধ্যে ১৭টির সাথেই নারী যুক্ত।

গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সম্পর্কে আমরা জানি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। কৃষিভিত্তিক সেই কর্মযজ্ঞে মোট শ্রমদানকারীর ৫৭ শতাংশ যে নারী এটাও আমরা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানি। আরও জানি কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত ২১ ধাপের মধ্যে ১৭টির সাথেই নারী যুক্ত।

মূলত প্রাচীনকাল থেকেই বিষয়টা গ্রামীণ জীবনাচরণে ভীষণরকম সহজাত। কিছু কিছু কাজে তো আবার নারীই অগ্রণী। তবে যুগ বদলের সাথে কৃষির সবক্ষেত্রেই নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। সেখানে নারীর সম্পৃক্ততাও নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনতে কখনো একেবারে নতুন, দ্রুত ফলনশীল ও উন্নত জাতের বিদেশি কৃষিপণ্য গ্রামীণ নারীদের হাত ধরেই উৎপাদিত হচ্ছে ও প্রসার পাচ্ছে।

কৃষিবিভাগ এসব ট্র্যাক রাখে। বাৎসরিক তথ্য ডকুমেন্ট আকারে জনসম্মুখে শেয়ার করে। তবে খুব নীরবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে অনেক নতুন খাত। অর্থনীতিতে অবদান রাখা সেই খাতগুলোর কি ট্র্যাক রাখা হচ্ছে! ঠিক জানি না। সেসব নিয়ে কথা বলতে চাই।

গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুধু শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ নেই। সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল। মোবাইল মানেই ইন্টারনেট থাকা চাই। তাই প্রায় সবাই তথ্য সমৃদ্ধ। ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে ভিডিও ও রিলের মাধ্যমে উপার্জনের কথা সবার জানা।

অসংখ্য নারী এখন তাদের প্রাত্যহিক গ্রামীণ জীবনযাপনের ভিডিও ও রিল তৈরি করে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে উপার্জন করছে। তাদের বলা হচ্ছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর। মিলিয়ন মিলিয়ন ফলোয়ার তাদের। ডিজিটালাইজেশনের এই সময়ে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে উপার্জন এখন শুধু গ্রামীণ নয় জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে নতুন এই খাত।

বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ফ্রিল্যান্সিং খাতকে যেমন জিডিপিতে কাউন্ট করা হয় ঠিক তেমনভাবে ফেসবুক ও ইউটিউব মনিটাইজেশন থেকে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রাকেও জিডিপিতে কাউন্ট করা হচ্ছে। কত নারী এই খাতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কাজ করছেন এই ব্যাপারে বিশদ পরিসংখ্যান দরকার।

    গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবদানের খাতগুলো যা মূলত চোখে দেখা যায় সেটারই কেবল পরিসংখ্যানগত মূল্যায়ন হয়, অথচ যা চোখে দেখা যায় না সেটা আরও অনেকখানি ব্যাপক!

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নিঃসন্দেহে এটি নতুন মাত্রা। বিভিন্ন বয়সী নারীদের কেউ এককভাবে কনটেন্ট ক্রিয়েট করছেন, কয়েকজন মিলে কনটেন্ট ক্রিয়েট করছেন আবার কখনো পরিবারের সদস্যরা মিলে করছেন। সেই কনটেন্ট তৈরিতে বিশেষ মেধাবী হতে হয় এমন নয়। কোনো একটা ভিডিও এডিটিং অ্যাপের ব্যবহার শিখে নিলেই কাজ চালানো যায়।

গ্রামের সহজসরল জীবনাচরণ শহুরে মানুষকে মুগ্ধ করে। এই মুগ্ধতাকে কেন্দ্র করেই কনটেন্ট ক্রিয়েট খাত আস্তে আস্তে বিশাল হচ্ছে। এক মিনিটের রিল, ছোট ছোট একবার ভিডিও দেখতে শুরু করলে ঘণ্টা পার করে দেয় মানুষ। উপার্জনের এই খাতে সারাদেশের লাখ লাখ কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মতো প্রচুর গ্রামীণ নারীও কাজ করছেন। এবং এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

মানুষের এলাকাভিত্তিক জীবনাচরণ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। যেমন উত্তরবঙ্গের কৃষির সাথে নারীর সম্পর্ক পুরোনো। শস্য লাগানো ও কাটার মৌসুমে শ্রমদানকারী বাঙালি বা সাঁওতাল নারীর সাথে গেরস্ত বাড়ির নারীকেও যুগপৎ কাজ করতে দেখা যায়।

অনেকক্ষেত্রেই পুরুষ ঘরে বসে থাকে। উত্তরবঙ্গের শ্রমজীবী শ্রেণির ভেতরে বহু বিবাহের চল আছে। নিজে কাজ না করে তারা স্ত্রীদের কাজে পাঠায় কিন্তু দিনশেষে বা মাস শেষে পারিশ্রমিক স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। সেটাই স্বামী খরচ করে। স্ত্রীদের কখনো টাকার প্রয়োজন হলে স্বামীর কাছ থেকে নিজের উপার্জিত টাকা চেয়ে নিতে হয়। প্রয়োজন মনে না করলে স্বামী টাকা দিতে অস্বীকারও করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে উত্তরবঙ্গের শ্রমজীবী শ্রেণি বহু বিবাহ করেই স্ত্রীর উপার্জিত টাকা বসে বসে খাওয়ার জন্য। এটাও একটা জীবনাচরণ এবং সেখানে নারীই অর্থনীতির ধারক।

যত যাই বলি না কেন গ্রামীণ অর্থনীতিকে চিরকালই লিড করবে কৃষি, অন্তত যতক্ষণ না কৃষিজমি বসতবাড়িতে রূপান্তরিত হচ্ছে। হয়তো সময়ের ব্যবধানে ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় মাঝে মাঝেই কিছু অর্থনৈতিক উৎপাদনশীল খাত ভেতরে ঢুকে পড়বে। হয়তো সেটা আবার কয়েকবছর গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদানও রাখবে।

একবিংশ শতাব্দী এত দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে যে কোনোকিছুরই স্থিতি নেই। এ ওকে টপকে যাচ্ছে তো, ও তাকে! মনে হচ্ছে সবই যেন ঘটছে চোখের পলকে। এই পরিস্থিতিতে কৃষির পাশাপাশি নারীর কাজেরও ডাইভারসিটি বাড়বে। গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবদানের খাতগুলো যা মূলত চোখে দেখা যায় সেটারই কেবল পরিসংখ্যানগত মূল্যায়ন হয়, অথচ যা চোখে দেখা যায় না সেটা আরও অনেকখানি ব্যাপক!

আমরা অনেকেই জানি আবার হয়তো অনেকেই জানি না ‘গ্রামীণ নারী’ দিবস নামক একটা ব্যাপার আছে। সেখানে নারীর জন্য কয়েকটা প্রপঞ্চ যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সম্পদের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের কথা উল্লেখ আছে। কথাগুলো শুনতে মনে হচ্ছে যেন অনেক দূর থেকে শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু আশা রাখি নিশ্চয় একদিন সবগুলো প্রপঞ্চই নারীদের অধিকারে আসবে।আপনার কি গ্রামের বাড়ি আছে? অথবা আপনি কি গ্রামে বসবাস করেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয় তবে এই দুই ক্ষেত্রেই আপনি টের পেয়েছেন গ্রামের নারীদের কর্মকাণ্ড কেমন, কী নিয়ে এবং সেটা কত ব্যাপক! আমি যদি গেরস্তবাড়ির কিংবা দিনমজুরের ঘর থেকে শুরু করি তাহলে বলবো গ্রামের কোনো বাড়িতে হাঁস-মুরগির মাংস ও ডিম কিনে খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, এমনকি কিনে খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না সবজিরও।

উপরন্তু প্রতিটা বাড়ির গৃহিণীরা উঠান খামার করে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পরে আয়ও করে থাকেন। যুগ যুগ ধরে উঠান খামার খুব জনপ্রিয় একটা মাধ্যম গৃহিণীদের হাত খরচের পয়সা জোগাড়ের জন্য। সেটাই বর্তমানে আধুনিকায়ন হয়েছে অর্গানিক খাবারের হাত ধরে।

বিভাগীয় শহরগুলোয় এখন অর্গানিক খাবার খুব জনপ্রিয়। সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে বাজারজাত করা হয় গ্রামের নারীদের উঠান খামার থেকে সংগৃহীত পণ্য। তালিকায় কী নেই! শুটকি, ডালের বড়ি কিংবা পিঠা থেকে শুরু করে হাতে তৈরি নানাবিধ ঘরোয়া শুকনা খাদ্যদ্রব্য ও দুগ্ধজাত খাদ্যদ্রব্য!

এত গেল শুধু খাবারের কথা। গ্রামের নারীদের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম সেলাই ও হস্তশিল্প। সেই ক্ষেত্রটাও ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া পেয়ে এখন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। মধ্যসত্ত্বভোগী কিংবা বলা যায় আউটসোর্সিং করেন এমন ব্যক্তিরা দেশের বাইরে থেকে অর্ডার এনে গ্রামের নারীদের মাধ্যমে হস্তশিল্পের কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। ফলে নারীর আর্থিক সচ্ছলতা বহুগুণে বেড়েছে।

একটা ব্যাপার এখানে বেশ স্পষ্ট সেটা হলো—যতই প্রত্যন্ত গ্রাম হোক কোনো নারী চাইলেই তার নিজস্ব গণ্ডিকে এখন বর্ধিত করার ক্ষমতা রাখেন কারণ; ইন্টারনেট সুবিধা। প্রচুর নারীকে দেখেছি প্রথমে অন্যদের চাহিদা মতো সাপ্লাই দেওয়া শুরু করে পরবর্তীতে নিজেই অনলাইনে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সারা দেশব্যাপী তার উঠান খামারের বা হাতে তৈরি খাবারের বা হস্তশিল্প ডেলিভারি দিচ্ছেন। প্রি অর্ডার নিয়ে পণ্য তৈরি করছেন।

    গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সম্পর্কে আমরা জানি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। কৃষিভিত্তিক সেই কর্মযজ্ঞে মোট শ্রমদানকারীর ৫৭ শতাংশ যে নারী এটাও আমরা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানি। আরও জানি কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত ২১ ধাপের মধ্যে ১৭টির সাথেই নারী যুক্ত।

গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সম্পর্কে আমরা জানি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। কৃষিভিত্তিক সেই কর্মযজ্ঞে মোট শ্রমদানকারীর ৫৭ শতাংশ যে নারী এটাও আমরা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানি। আরও জানি কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত ২১ ধাপের মধ্যে ১৭টির সাথেই নারী যুক্ত।

মূলত প্রাচীনকাল থেকেই বিষয়টা গ্রামীণ জীবনাচরণে ভীষণরকম সহজাত। কিছু কিছু কাজে তো আবার নারীই অগ্রণী। তবে যুগ বদলের সাথে কৃষির সবক্ষেত্রেই নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। সেখানে নারীর সম্পৃক্ততাও নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনতে কখনো একেবারে নতুন, দ্রুত ফলনশীল ও উন্নত জাতের বিদেশি কৃষিপণ্য গ্রামীণ নারীদের হাত ধরেই উৎপাদিত হচ্ছে ও প্রসার পাচ্ছে।

কৃষিবিভাগ এসব ট্র্যাক রাখে। বাৎসরিক তথ্য ডকুমেন্ট আকারে জনসম্মুখে শেয়ার করে। তবে খুব নীরবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে অনেক নতুন খাত। অর্থনীতিতে অবদান রাখা সেই খাতগুলোর কি ট্র্যাক রাখা হচ্ছে! ঠিক জানি না। সেসব নিয়ে কথা বলতে চাই।

গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুধু শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ নেই। সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল। মোবাইল মানেই ইন্টারনেট থাকা চাই। তাই প্রায় সবাই তথ্য সমৃদ্ধ। ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে ভিডিও ও রিলের মাধ্যমে উপার্জনের কথা সবার জানা।

অসংখ্য নারী এখন তাদের প্রাত্যহিক গ্রামীণ জীবনযাপনের ভিডিও ও রিল তৈরি করে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে উপার্জন করছে। তাদের বলা হচ্ছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর। মিলিয়ন মিলিয়ন ফলোয়ার তাদের। ডিজিটালাইজেশনের এই সময়ে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে উপার্জন এখন শুধু গ্রামীণ নয় জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে নতুন এই খাত।

বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ফ্রিল্যান্সিং খাতকে যেমন জিডিপিতে কাউন্ট করা হয় ঠিক তেমনভাবে ফেসবুক ও ইউটিউব মনিটাইজেশন থেকে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রাকেও জিডিপিতে কাউন্ট করা হচ্ছে। কত নারী এই খাতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কাজ করছেন এই ব্যাপারে বিশদ পরিসংখ্যান দরকার।

    গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবদানের খাতগুলো যা মূলত চোখে দেখা যায় সেটারই কেবল পরিসংখ্যানগত মূল্যায়ন হয়, অথচ যা চোখে দেখা যায় না সেটা আরও অনেকখানি ব্যাপক!

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নিঃসন্দেহে এটি নতুন মাত্রা। বিভিন্ন বয়সী নারীদের কেউ এককভাবে কনটেন্ট ক্রিয়েট করছেন, কয়েকজন মিলে কনটেন্ট ক্রিয়েট করছেন আবার কখনো পরিবারের সদস্যরা মিলে করছেন। সেই কনটেন্ট তৈরিতে বিশেষ মেধাবী হতে হয় এমন নয়। কোনো একটা ভিডিও এডিটিং অ্যাপের ব্যবহার শিখে নিলেই কাজ চালানো যায়।

গ্রামের সহজসরল জীবনাচরণ শহুরে মানুষকে মুগ্ধ করে। এই মুগ্ধতাকে কেন্দ্র করেই কনটেন্ট ক্রিয়েট খাত আস্তে আস্তে বিশাল হচ্ছে। এক মিনিটের রিল, ছোট ছোট একবার ভিডিও দেখতে শুরু করলে ঘণ্টা পার করে দেয় মানুষ। উপার্জনের এই খাতে সারাদেশের লাখ লাখ কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মতো প্রচুর গ্রামীণ নারীও কাজ করছেন। এবং এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

মানুষের এলাকাভিত্তিক জীবনাচরণ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। যেমন উত্তরবঙ্গের কৃষির সাথে নারীর সম্পর্ক পুরোনো। শস্য লাগানো ও কাটার মৌসুমে শ্রমদানকারী বাঙালি বা সাঁওতাল নারীর সাথে গেরস্ত বাড়ির নারীকেও যুগপৎ কাজ করতে দেখা যায়।

অনেকক্ষেত্রেই পুরুষ ঘরে বসে থাকে। উত্তরবঙ্গের শ্রমজীবী শ্রেণির ভেতরে বহু বিবাহের চল আছে। নিজে কাজ না করে তারা স্ত্রীদের কাজে পাঠায় কিন্তু দিনশেষে বা মাস শেষে পারিশ্রমিক স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। সেটাই স্বামী খরচ করে। স্ত্রীদের কখনো টাকার প্রয়োজন হলে স্বামীর কাছ থেকে নিজের উপার্জিত টাকা চেয়ে নিতে হয়। প্রয়োজন মনে না করলে স্বামী টাকা দিতে অস্বীকারও করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে উত্তরবঙ্গের শ্রমজীবী শ্রেণি বহু বিবাহ করেই স্ত্রীর উপার্জিত টাকা বসে বসে খাওয়ার জন্য। এটাও একটা জীবনাচরণ এবং সেখানে নারীই অর্থনীতির ধারক।

যত যাই বলি না কেন গ্রামীণ অর্থনীতিকে চিরকালই লিড করবে কৃষি, অন্তত যতক্ষণ না কৃষিজমি বসতবাড়িতে রূপান্তরিত হচ্ছে। হয়তো সময়ের ব্যবধানে ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় মাঝে মাঝেই কিছু অর্থনৈতিক উৎপাদনশীল খাত ভেতরে ঢুকে পড়বে। হয়তো সেটা আবার কয়েকবছর গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদানও রাখবে।

একবিংশ শতাব্দী এত দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে যে কোনোকিছুরই স্থিতি নেই। এ ওকে টপকে যাচ্ছে তো, ও তাকে! মনে হচ্ছে সবই যেন ঘটছে চোখের পলকে। এই পরিস্থিতিতে কৃষির পাশাপাশি নারীর কাজেরও ডাইভারসিটি বাড়বে। গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবদানের খাতগুলো যা মূলত চোখে দেখা যায় সেটারই কেবল পরিসংখ্যানগত মূল্যায়ন হয়, অথচ যা চোখে দেখা যায় না সেটা আরও অনেকখানি ব্যাপক!

আমরা অনেকেই জানি আবার হয়তো অনেকেই জানি না ‘গ্রামীণ নারী’ দিবস নামক একটা ব্যাপার আছে। সেখানে নারীর জন্য কয়েকটা প্রপঞ্চ যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সম্পদের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের কথা উল্লেখ আছে। কথাগুলো শুনতে মনে হচ্ছে যেন অনেক দূর থেকে শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু আশা রাখি নিশ্চয় একদিন সবগুলো প্রপঞ্চই নারীদের অধিকারে আসবে।

জনশক্তি যেভাবে অর্থনীতির বড় হাতিয়ার হতে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্রম এবং উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কিন্তু শুদ্ধ শ্রমশক্তি বা যেনতেন উদ্যোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিময় করতে পারে না, তার জন্য শ্রমশক্তি এবং উদ্যোগকে সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন হতে হবে।

অন্য কথায়, শ্রমশক্তিকে মানবসম্পদ হতে হবে। এটা অনস্বীকার্য যে, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভৌগোলিক আয়তন নয়, তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তার সুদক্ষ মানুষ এবং বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ অপ্রতুল জনবহুল দেশে এ কথাটি আরও সত্যি।

একটি দেশের মানবসম্পদ তিনটা পন্থায় তার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে।

প্রথমত: উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানবসম্পদের সক্ষমতা ও অন্যান্য উপকরণকে সার্থক এবং কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে। মানবসম্পদের অনুপস্থিতিতে ভূমি, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য উৎপাদন, উপকরণ কিছু জড় পদার্থ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

দ্বিতীয়ত: উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির প্রভাব এবং অবদান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্য যথার্থ মানবসম্পদ প্রয়োজন। আজকের বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের কালে সক্ষম এবং সংশ্লিষ্ট মানবসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম।

মজিদ মাহমুদ: এক অনন্য সাহিত্য-স্রষ্টা

কবি মজিদ মাহমুদ

এক

কবিগুরু কবিকে তার জীবনচরিতে খঁুজতে নিষেধ করেছিলেন। তাই বলে কি আমরা কবির ব্যক্তি জীবনের দিকে তাকাবো না? তাহলে চরিত সাহিত্য কী করে তৈরি হবে? আমার তো মনে হয় সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের সৃষ্টিকর্ম ঠিকঠাক বুঝতে চাইলে তার ব্যক্তিজীবনটাও জানা জরুরি অন্তত খানিকটা। এবং সৃষ্টিকর্মের সাথে সাথে তার ব্যক্তিজীবনও আমাদেরকে কিন্তু কম আকর্ষণ করে না। যে সব লেখা আমাদেরকে আনন্দ দেয়, আমাদেরকে পথ দেখিয়ে দেয়, তার স্্রষ্টা কি আমাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ? মোটেই না। আজকের এই ছোট্ট লেখা মূলত কবি মজিদ মাহমুদকে নিয়ে। মজিদ মাহমুদকে দেখছি কমবেশি একযুগ ধরে। কিছুটা বিষ্ময়ই জাগে। প্রায় সময়ই তাকে গল্প করতে দেখি, আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে দেখি। অথচ ফি বছরই দুই—তিনটা করে বই প্রকাশ হতে দেখি। তাহলে তিনি কখন পড়েন? কখন লেখেন? আর কখনইবা সম্পাদনা করেন? তার বই যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার আড্ডাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমনকি কখনোসখনো একটি ছোট্ট আড্ডা সহস্্র পৃষ্ঠার পাঠকে অতিক্রম করে যায়। সেই আড্ডা যে সব সময় বৈঠকী আড্ডা তাও কিন্তু নয়। কোথাও দাঁড়িয়ে কিংবা হাঁটতে হাঁটতেও হয়ে যায়।

 দুই
কবি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮—১৯৭৪) নাকি আড্ডা থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। অন্তত ‘আড্ডা’ নামক নিবন্ধে তিনি এমনটিই জানিয়েছিলেন। মজিদ মাহমুদের আড্ডা কিন্তু এমনই। অন্তত আমাদের মতো ঊনজনদের জন্য। সর্বশেষ পাবনায় (চরগড়গড়ি) মহিয়সী সাহিত্য উৎসবের (২০২৪) কথাই বলি। ভেতরে একটি সেমিনার চলছে। কবি—সাহিত্যিকরা কথা বলছে। আমরা বেশ কয়েকজন বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। সাহিত্যসহ সমসাময়িক সময়, সমাজ, রাজনীতি নিয়ে বৈঠকী মেজাজে টুকটাক আলাপ হচ্ছে। সেই আলাপের মধ্যমণি মজিদ মাহমুদ। আমরা কিছুটা প্রশ্নের সুরে আলাপ উত্থাপন করছি। আর মজিদ মাহমুদ সেই আলাপকে আরও গভীর করে তুলছেন। কেউ একজন বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গে কথা তুলতেই মজিদ মাহমুদ মুহূর্তেই সেই আলাপে যুক্ত হলেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে। মজিদ মাহমুদ এভাবেই সেদিন শুরু করেছিলেনÑরাম এসে গেছে আমরা রাবণকে কোথায় রাখব? মধুসূদনকে কোথায় রাখব? সাথে সাথে মধুসূদনের জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, আধুনিকতা, তার মানবিকতার নানা ব্যাখ্যা, নানা বিশ্লেষণ উত্থাপন করলেন। সেই সঙ্গে রাম—রাবণের যুদ্ধের একটি অন্যতম কারণ যে নারীর দিকে হাত বাড়ানো—সেটিও দেখিয়ে দিলেন। এরপর সীতা থেকে শুরু করে মজিদ মাহমুদ মুহূর্তের মধ্যে দ্রোপদী, হেলেনসহ বেশকিছু নারী প্রসঙ্গ উল্লেখপূর্বক রামায়ণ—মহাভারত, ইলিয়াড—ওডেসিসহ  প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্ত্য জগতের ক্লাসিক সাহিত্যের নানা গলিঘুঁজি আমাদের কাছে বেশ স্পষ্ট করে তুললেন। তখন আমার বুদ্ধদেব বসুর কথাটি মনে পড়ে গেল। এই কবি যে আড্ডা থেকে অনেক কিছু শেখার কথা বলেছিলেন সেটি একেবারে মিথ্যে নয়। তবে সেই আড্ডা হতে হবে মজিদ মাহমুদের মতো সাহিত্যের অফিসারের সঙ্গে। 

কবি মজিদ মাহমুদ
 

তিন
অনেক সময় বাছুর কবিদের বেশ গুতোগুতি করতে দেখা যায়। দুএকটি কবিতার বই লিখে এদের কেউকেউ প্রবীণকে অস্বীকার করতে চায়। আবার প্রবীণরাও মৌখিকভাবে নবীনদের টুকটাক প্রশংসা করলেও এদের লেখালেখি নিয়ে লিখিতভাবে কিছু বলতে চান না। এক্ষেত্রে মজিদ মাহমুদ কিন্তু অনেকটাই ব্যতিক্রম বলা যায়। প্রবল ব্যক্তিত্বের বদান্যতায় উত্তমের মতো তিনি প্রায় সবার সঙ্গে নিশ্চিন্তে মিশতে পারেন। কাউকে দূরে ঠেলে দেন না। রবীন্দ্র—নজরুল কিংবা জীবনানন্দ দাসের মতো প্রবীণ কবিদের কাব্যকর্মের আলোচনা যেমন মজিদ মাহমুদের প্রবন্ধসাহিত্য শোভা বর্ধন করে, তেমনই আজকের নব্বই দশকের নবীন কবিদের কবিতাকর্মও তার আলোচনায় ঠাঁই পায়। অর্থাৎ যাপিত জীবনে সমন্বয়ের কাজটি কিন্তু বলা যায় তার প্রায় স্বভাবজাত। কাউকে তিনি ছোট মনে করেন না। আবার কাউকে বড়ও মনে করেন না। ছোট ছোট পুরস্কারের প্রতি তার অবহেলা নেই। বড় বড় পুরস্কারের প্রতি তার বাসনা নেই। অন্তত ‘ক্ষণচিন্তা’ প্রবন্ধগ্রন্থের ‘পুরস্কার’ নিবন্ধটি তো তা—ই বলে। নিবন্ধ হলেও এটিকে আবার কবিতা হিশেবেও পাঠ করা যায়। যা হোক, সমসাময়িক সাহিত্য ও স্বদেশ—বাস্তবতা কবিকে যে একেবারে স্পর্শ করে না—এমনটিও কিন্তু নয়। বলা যায় ‘নিদারুণ মাস ফেব্রুয়ারি’ কবিতাটি তারই নিদারুণ দৃষ্টান্ত।

 চার  
ব্যক্তির পাশাপাশি মজিদ মাহমুদের সাহিত্যকর্মও কি কম বিষ্ময়ের? মাত্র বাইশ—তেইশ বছর বয়সে ‘মাহফুজামঙ্গল’ (১৯৮৯) হাতে নিয়ে তিনি পাঠকের সামনে হাজির হয়েছিলেন। এই সময়ে, এই বয়সে, এই একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে যখন উত্তরাধুনিক সাহিত্য নিয়ে বিপুল মাতামাতি, তখন এমন একটি কাব্যশৈলী কিংবা এমন একটি নামকরণ কি কম সাহসের কথা? ‘মাহফুজামঙ্গল’ এর মধ্য দিয়ে কাব্যপাড়ায় তিনি একটি নতুন আলো ও আলোড়ন তুলতে পেরেছিলেন, কাব্যপাঠককে তিনি চমকে দিতে পেরেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, মোর্নিং শোজ দ্যা ডে। মজিদ মাহমুদও কিন্তু ঠিক তেমনই। শুরুতেই তার সাহিত্যিক শক্তি ও সামর্থে্যর পরিচয় সেদিন তিনি তুলে ধরতে পেরেছিলেন। কবিতা দিয়ে শুরু হলেও গল্প, গদ্যপদ্য, প্রবন্ধনিবন্ধ, উপন্যাসসহ সাহিত্যের নানা দিকে, নানা শাখায় ইকারুসের ন্যায় তার উড়ে চলা। সেই উড়ে চলায়  একদিকে যেমন আছে নিজস্ব ছন্দ—আনন্দ; তেমনই আছে প্রবল বোধ ও ব্যক্তিত্ব।  

কবি মজিদ মাহমুদ
 
পাঁচ
মজিদ মাহমুদ এক অনন্য সাহিত্য—স্্রষ্টা বিশেষ করে প্রবন্ধসাহিত্যে। প্রবন্ধসাহিত্যে এ দেশের সৃষ্টিশীল কবিরা কিন্তু খুব একটা সময় দেননি কিংবা দিতে পারেননি। আল মাহমুদ (১৯৩৬—২০১৯) কিংবা শামসুর রাহমানের (১৯২৩—২০০৬) মতো বড় বড় কবিদের বড়ত্ব তাদের কবিতায় এবং কথাসাহিত্যে। কিন্তু প্রবন্ধসাহিত্যে তাদের উল্লেখযোগ্য অবস্থান আছে কি? আল মাহমুদের রচনাবলি (ঐতিহ্য) তন্ন তন্ন করে খুঁজলে প্রবন্ধসাহিত্য খুব সামান্যই মেলে। এই কবির কবিতা ও কথাসাহিত্য চম্বুকের মতো আকর্ষণ করলেও প্রবন্ধসাহিত্য কিন্তু অনেকটাই উল্টো বলা যায়। অন্তত আমার পাঠ—অভিজ্ঞতা তো তা—ই বলে। শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রেও অনেকটা তা—ই। সত্যি বলতে কি, এই কবির ‘একান্ত ভাবনা’ বইটির পাঠ ধরে রাখতে পারিনি। অন্যদিকে মজিদ মাহমুদের প্রবন্ধ—সাহিত্য কিন্তু বাস্তবিকই খানিকটা বিষ্ময় জাগায়। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ—সাহিত্যের বিপুল ভাণ্ডার গড়ে তুলছেন তিনি। বিষয়বৈচিত্র্য, তার গতি ও গভীরতা নানা দিক থেকে এক বিপুল প্রবন্ধ সাহিত্যের স্্রষ্টা তিনি। ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতার দিক থেকে বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮—১৯৭৪) কিংবা শঙ্খঘোষ (১৯৩২—২০২১) পরবর্তী আর কোনো কবির হাতে কি এতো প্রবন্ধসাহিত্য রচিত হয়েছে? আর উপন্যাস? সেখানেও কি মজিদ মাহমুদ কম যান? ‘মেমোরিয়াল ক্লাব’ (২০২০) সাম্প্রতিক সময়ের প্রকাশনা হলেও এটি রচনাকালের ব্যাপ্তি দুদশকেরও বেশি। ‘দুদশকের বেশি’ বলতে এটি বোঝায় না যে তিনি এতো লম্বা সময় ধরে এটি লিখেছেন। বরং ভাবনার কালটিকেই ইঙ্গিত করে। আনন্দের খবর, গ্রন্থটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিতও হচ্ছে এবং এটি প্রকাশের জন্য অ্যামাজানের পথে রয়েছে। নজরুল—জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘তুমি শুনিতে চেয়ো না’ (২০২৪) কি কম সাড়া ফেলেছে? এরপর এবারের ঈদ সংখ্যায় (ভোরের কাগজ) ‘উনুন’ (২০২৪) এসছে। আচ্ছা, এই যে কবিতা, এই যে কথাসাহিত্য কিংবা প্রবন্ধ সাহিত্যÑ সাহিত্যের কোনো একটি শাখায় কি তাকে অস্বীকার করা যায়? সাহিত্য ছাড়া সংগঠক হিশেবেও মজিদ মাহমুদের তুল্য ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের সাহিত্য কি খুব একটা আছে?  

ছয়
নদী যেমন বন্ধুর গিরিপথ অতিক্রম করে সাগরে মিলতে চায়, বটবৃক্ষ যেমন ক্রংক্রিটের মধ্য দিয়ে সযত্নে তার শিকড় সম্প্রসারিত করে দেয়, একজন কবিও তা—ই করেন। একজন মজিদ মাহমুদও তা—ই করেন। তিনিও সাহিত্যের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে মিলতে চান; তার সময়, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চান। ১৬ এপ্রিল এই কবি পাবনা জেলায় পদ্মার পাড় ঘেষে গড়ে ওঠা চরগড়গড়ি গ্রামে এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে জন্মেছিলেন। স্বকাল, স্বসমাজ ও অভিজ্ঞতার ছেঁায়ায় তার সাহিত্যসাধনা সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক জন্মদিনে এই কামনা।  

লেখক:  ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ শাহজাদপুর সরকারি কলেজ।   

অবরোধের শিকার খেটে খাওয়া মানুষ


নিজস্ব প্রতিবেদক: অক্টোবর ২৮ থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে ৬৪টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ১৫০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। হরতাল-অবরোধে শুধু পরিবহন খাতেই এ কদিনে ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অন্য একটি স্টাডিতে দেখা যায়, এক দিনের হরতালে আর্থিক ক্ষতি ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এখন যে বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসা দরকার তা হচ্ছে- এ ক্ষতির রেশ বহুমুখী। বিশেষ করে পরিবহন খাতের সঙ্গে যারা জড়িত আছে তাদের প্রত্যেকের আয়-রোজগারের বিষয়ে আমরা সবাই অবগত। তাদের অবস্থা অনেকটা দৈনিক মজুরির মতো অর্থাৎ কাজে থাকলে তাদের ঘরে মোটামুটিভাবে সচ্ছলতা বিরাজ করে। তা ছাড়া পরিবহন সেক্টরে নিত্যদিন শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, এ খাতের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং যারা বাসে কিংবা গাড়িতে ড্রাইভার, ‍সুপারভাইজার, হেলপারের দায়িত্ব পালন করেন তারা নিয়মিত কাজের সুযোগ পান না। তবে এ সেক্টরে দৈনিক যে মজুরি পাওয়া যায় তা দিয়ে তাদের সংসারের দুই দিনের পারিবারিক ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব। এখন যদি সপ্তাহান্তে পাঁচ দিন হরতাল-অবরোধ চলে তা হলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আয়-রোজগার দিয়ে পাঁচ দিনের পারিবারিক ব্যয় বহন করা অসম্ভব। হরতাল-অবরোধে পরিবহন খাতের শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতি সাধনের পাশাপাশি মানসিকভাবে তারাও ভেঙে পড়ছে। বিএনপি-জামায়াতের আহূত হরতাল কর্মসূচির কারণে তাদের পরিবারের অবস্থা ক্রমান্বয়ে শোচনীয় হয়ে পড়ছে।

সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে জানা যাচ্ছে, বাসে পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণে অংশ নিলে বিকাশে টাকা চলে আসে অগ্নিসংযোগকারীদের কাছে। আমরা যারা অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তারা সবাই অবগত রয়েছি সন্ত্রাসবাদের একটি আলাদা সিগনেচার রয়েছে। আলাদা সিগনেচার এ অর্থে বলা হয়ে থাকে; সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত রয়েছে এবং বহির্বিশ্ব থেকে অর্থের জোগান নিশ্চিত করা হয়। অগ্নিসন্ত্রাসের যে নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি এটার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেখা যাবে খেটে খাওয়া মানুষ ধীরে ধীরে আর্থিক অসঙ্গতিতে পড়ে যাবেন। বিকাশে যে টাকা সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে প্রকৃত অর্থে এর যোগানদাতা কারা? এ অর্থের যোগানদাতাদের একটি বড় অংশ বাইরে থেকে মদদ দিচ্ছে। দেশের কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে এবং এদের শুভাকাঙ্ক্ষী যারা বিদেশে অবস্থান করছে তাদের একটি বড় অংশ অর্থের মদদ দিচ্ছে।

২৮ অক্টোবরের পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াত ভিন্ন প্ল্যাটফরমে আলাদাভাবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সারা দেশে ঢিলেঢালাভাবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে, হরতালের সমর্থনে দেশের কোথাও উল্লেখ করার মতো মিছিল চোখে পড়েনি। এককথায় বললে বলা যায়, হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে জনগণের সাড়া পাওয়া যায়নি। জনগণ হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তা হলে বিএনপি-জামায়াত কেন বারবার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করে। কি উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাদের এ কর্মসূচি? এ বিষয়গুলোকে সচেতন মহলের অ্যাড্রেস করার প্রয়োজন রয়েছে। যাতে জনগণ সচেতন হয় সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে কাজ করে।

হরতাল-অবরোধ জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে এ কথা যেমনভাবে সত্য, ঠিক তেমনিভাবে হরতাল-অবরোধের কারণে মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি কাজ করে এ বিষয়টি সত্য। হরতাল-অবরোধে মানুষ ঘর থেকে কম বের হয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও স্থবির হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। করোনাকালে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেশের শিক্ষকসমাজ যেখানে বদ্ধপরিকর, শিক্ষা ক্ষেত্রে করোনার সংকট ক্রমান্বয়ে কমে আসছে সে জায়গায় হরতাল-অবরোধের মতো জনবিধ্বংসী কার্যক্রম ঘোষণা করে বিএনপি-জামায়াত জনগণ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ধরনের জনবিধ্বংসী কার্যক্রম ঘোষণার ফলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এ ধরনের বিষয়াদি বিভিন্ন সেক্টরে পরিলক্ষিত হওয়ায় অর্থনীতিবিদ আগাম আশঙ্কার কথা ঘোষণা করেছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে, তা না হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়বে।

আপনারা যারা দেশের পর্যটন খাতের খোঁজখবর রাখেন আপনারা নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। নামকরা হোটেলগুলোতে বুকিং কমে আসছে, বেশ কিছুদিন ধরে পর্যটন নগরীতে পর্যটকদের ট্রাভেলের ওপর নির্ভর করে যাদের জীবিকা জড়িয়ে আছে তারা ব্যাপক অর্থ সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়েছে। এ বিষয়গুলোতে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিদদের উল্লেখযোগ্য হারে ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে অন্যান্য সেক্টরে অপরাধীদের আনাগোনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে আমরা জানি জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা অপরাধীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে, জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে, চিহ্নিত আসামিদের আস্ফালন পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়গুলোর দায়ভার কিন্তু আগুনসন্ত্রাসীদের গ্রহণ করতে হবে। কিংবা আগুনসন্ত্রাসীদের মদদদাতাদের গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া যাদের নির্দেশে ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে গাড়িতে পেট্রোল বোমার কন্ট্রাক্ট গ্রহণ করা হয় তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এ শ্রেণির মদদদাতাদের চরিত্র উদ্ঘাটন করে জাতির সামনে মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং জনগণকে এ ব্যাপারে জানাতে হবে।

পরিশেষে উল্লেখ করা যায়, জনগণের সমর্থন না থাকলেও হরতাল-অবরোধের কারণে মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি পরিলক্ষিত হয়। রাস্তাঘাটে স্বাভাবিকভাবে যানবাহনের সংখ্যা কমে আসে। এ শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে যারা কাঁচামাল পরিবহনে নিয়োজিত থাকে তাদের অতিরিক্ত ভাড়া প্রদান করতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে কাঁচামালের দাম বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। কাজেই অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর বর্তায়। এদিকে একটি পক্ষ রয়েছে; তাদের ধারণা দুর্বৃত্তরা এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। আবার কেউ কেউ বলছে বিএনপির ওপর দায় চাপাতে একটি পক্ষ এ ধরনের কার্যক্রম করছে। আসল কথা হচ্ছে; বিএনপি-জামায়াত যদি হরতাল-অবরোধ আহ্বান না করত তাহলে দুর্বৃত্তরা কীভাবে এ ধরনের সুযোগ পায়? কাজেই এ জায়গা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সরে আসা উচিত। প্রকৃতকথা হচ্ছে- জনগণের ম্যান্ডেট ব্যতিরেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সে জায়গায় জনবিরোধী কার্যক্রম গ্রহণ করে কোনোভাবেই জনগণের কাছাকাছি আসার সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, বিএনপি জামায়াতের এ সংক্রান্তে বোধোদয় হওয়া উচিত এবং জনগণবিরোধী কার্যক্রম থেকে ফেরত এসে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে রাজনীতির স্বাভাবিকতা গ্রহণ করা উচিত।

মানুষের এমন চলাচলে সংক্রমণ আবার বাড়বে

মোজাহেরুল হক

মোজাহেরুল হক: ঈদের সময় মানুষ ঘরমুখী হবে, এটা সবাই জানত। গত বছরও তা-ই হয়েছে। এবারও যে একই ঘটনা ঘটবে, তা কারও অনুমানের বাইরে ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে উচিত ছিল, জনসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিতসংখ্যক যাত্রী নিয়ে যাতে যানবাহন চলাচল করে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে নজরদারির প্রয়োজন ছিল।

বাস্তবে দূরপাল্লার গণপরিবহন ছাড়া বাকি সবকিছুই চলছে। এ অবস্থায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা এমনিতেই রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বহু মানুষ একসঙ্গে চলাচল করেছে। এই পুরো যাত্রাতেই সংক্রমণের ঝুঁকি আছে এবং তা সামনে আরও বাড়াবে। বলা যায়, সংক্রমণ এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে ছড়াবে।

গত কয়েক দিনে মানুষের যে চলাচল দেখা গেল তাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা শতভাগ। দেশব্যাপী মানুষ চলাচল করেছে। মানুষকে সচেতন করতে হবে যেন কোনো রকম লক্ষণ দেখা মাত্রই অ্যান্টিজেন (নমুনা পরীক্ষার ফল দ্রুত পাওয়া যায়, তবে উপসর্গ না থাকলে নির্ভুল ফল আসে না) পরীক্ষা করে এবং করোনার চিকিৎসা নেয়।

বিশ্বে করোনার নতুন নতুন ধরন দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ভেরিয়েন্ট (ধরন) বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতের ভেরিয়েন্ট খুব দ্রুত ফুসফুসের সংক্রমণ ঘটিয়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। এই ভেরিয়েন্ট আমাদের দেশে পাওয়া গেছে। যেহেতু এটা দ্রুত ফুসফুসে ছড়ায়, তাই তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নিতে হবে। লক্ষণ দেখা মাত্রই পরীক্ষা করাতে হবে। করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য আরটিপিসিআরের (এই যন্ত্রের মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে একটু সময় লাগলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রায় নির্ভুল ফল আসে) অপেক্ষা না করে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতে হবে। ভারত থেকে বাংলাদেশে যে কেউ ঢোকামাত্রই তার করোনা পরীক্ষা করাতে হবে।

মোজাহেরুল হক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা

কারখানার চাপে রোগীর অক্সিজেন নেই!

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদন: দেশের করোনা পরিস্থিতি যতই খারাপের দিকে যাচ্ছে ততই সংকট বাড়ছে মেডিক্যাল অক্সিজেনের। সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে উৎপাদক ও খুচরা বিক্রেতারা। করতে হচ্ছে আমদানিও। শিল্প-কারখানায় অক্সিজেন সরবরাহ অনেকে বন্ধ করার কথা জানালেও সেখানকার চাহিদাও ভূমিকা রাখছে চলমান সংকটে।

সক্ষমতা ও ঘাটতি

দেশে এখন চাহিদার তুলনায় দিনে প্রায় ৬০ টন অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন উৎপাদনকারীরা। হাসপাতাল এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় দৈনিক অক্সিজেন চাহিদা আছে ১৮০ টনের।

দেশের বহুজাতিক অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লিন্ডে জানিয়েছে, চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এরইমধ্যে তারা উৎপাদন বাড়িয়েছে। রূপগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের প্লান্টে দিনে ৯৫ টন উৎপাদন করছে এবং পুরোটাই সরবরাহ করছে।

পাশপাশি চাহিদা মেটাতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লিকুইড অক্সিজেনও আমদানি করা শুরু করেছে লিন্ডে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২টি প্লান্টের এখন সর্বাধিক উৎপাদন ক্ষমতা ৯৫ টন।

আরেকটি মেডিক্যাল গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৫ টন। অন্যদিকে দেশের শিল্পকারখানায় প্রতিদিন চাহিদা আছে ১০-১৫ টনের।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিফিল হচ্ছে বেশি

মিরপুরের বাসিন্দা হারুন-উর-রশিদ অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে শুধু ঘুরছেন রিফিল করানোর জন্য। মিরপুর থেকে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই তেজগাঁওয়ের কলোনি বাজারে এসেছেন একটু অক্সিজেনের আশায়। শেষে পেলেনও। বিক্রেতা জানালেন সংকটের কথা। কিছুক্ষণের জন্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও দুশ্চিন্তায় আছেন হারুন-উর-রশিদ। এই অক্সিজেন শেষ হলে আবার কোথায় পাবেন।

তেজগাঁয়ের তাহের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকার আবু তাহেরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘অক্সিজেন সরবরাহ কমে গেছে। আমরা বেশ হিমশিম খাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ফিলিং স্টেশনে মেডিক্যাল রিফিল কম হয়। তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিফিল করছে বেশি। অথচ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিফিল এখন বন্ধ থাকার কথা। আমাদের কাছে বাড়তি চাপ আসে। আমরা ফেরত পাঠাই। এখন নতুন কোনও হাসপাতাল এলেও আমরা দিই না। আগে থেকে যাদের দিয়ে আসছি তাদেরকেই প্রাধান্য দিচ্ছি।

মগবাজারের আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মালিক লতিফ রেজা বলেন, ‘এখন প্লান্টে গাড়ি পাঠালে ৩-৪ দিন অপেক্ষা করতে হয়। আগে গাড়ি পাঠালে দিনে দিনে গ্যাস পেতাম।’

গাড়ি প্লান্টে যাওয়ার পর ফেরত আসছে বলে অভিযোগ প্রায় সব অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রেতারই। তবে কেউ কেউ চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদনকেই বেশি দুষছেন।

মগবাজারের ওই বিক্রেতা আরও জানালেন, ‘নতুন সিলিন্ডার এখন বিক্রি কমিয়ে দিয়েছি। বিশেষ ক্ষেত্রে যাচাই বাছাই করে দিচ্ছি। কারণ অনেকেই রোগী না থাকলেও শুধু দুশ্চিন্তার কারণে সিলিন্ডার ঘরে নিয়ে রাখছে। এ জন্য আমরা রিফিলই করছি বেশি। যারা খালি সিলিন্ডার কষ্ট করে নিয়ে আসে, বোঝা যায় তাদের ঘরেই রোগী আছে।’

পাশেই আরেক বিক্রেতা জানান, ‘নতুন সিলিন্ডার বিক্রি চালু আছে তবে কম। বেশিরভাগই রিফিল নিচ্ছে।’

উৎপাদকরা যা বলছেন

লিন্ডের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সায়কা মাজেদ বলেন, ‘যতটুকু সম্ভব পুরোটাই মেডিক্যাল অক্সিজেন দিচ্ছি। ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে আমদানিও করছি। ভারতেও লিন্ডের নিজস্ব প্লান্ট আছে। সরকারও আমাদের সহায়তা দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় কোনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িনি। বড় হাসপাতালগুলোতে লিকুইড অক্সিজেন দিই আমরা। এখনও চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি। তবে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়াতে আমাদের ক্লোজ মনিটরিংয়ে থাকতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে মানসম্মত বিদ্যুতের সমস্যা আছে। সেকারণে যদি কোনও প্লান্ট বন্ধ হয়ে যায়, সেটি চালু করতে ৩ ঘণ্টা লেগে যায়। আমাদের প্লান্ট বিদ্যুৎ ও গ্যাস জেনারেটরে চলে।’

বিক্রেতাদের অভিযোগ সম্পর্কে জানালে তিনি বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাসের জন্য মেডিক্যাল গ্যাসের সরবরাহ দিতে দেরি হচ্ছে- ব্যাপারটা এমন নয়। শিল্পকারাখানা কিন্তু চালু আছে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও। তারপরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেডিক্যালকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারখানা খোলা থাকলে আমাদের জন্য একটু চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে একটা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করতে হয়। সিলিন্ডার দিলেও আমাদের গাড়ির সীমাবদ্ধতা আছে। চাহিদা দ্বিগুণ হলেও লজিস্টিক তো বেড়ে যায়নি।’

অপর এক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, মেডিক্যাল অক্সিজেনের জন্য সিরিয়াল লেগে আছে। একটি বড় সিলিন্ডার রিফিলে ঘণ্টাখানেক লাগে। আমরা দিনে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার কিউবিক মিটার অক্সিজেন রিফিল করতে পারি। কিন্তু চাহিদা এর প্রায় ৩ গুণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে ১৭ হাজার ৭২৪টি। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে ১ হাজার ৩৪৮টি এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে ১ হাজার ১৩২টি।

নারীর জীবনে বড় বাঁধা লোকের কথা

ইয়ারা যোহারীন
ইয়ারা যোহারীন: মানুষ হিসেবে পুরুষের সমমর্যাদা পেতে আজও আন্দোলন করতে হচ্ছে গোটা বিশ্বের নারীদের। ডিজিটাল যুগে সবকিছুতে পরিবর্তন আসলেও নারীকে আলাদা করে দেখার বিষয়টিতে পরিবর্তন আসেনি। নারী নেতৃত্বে চলমান এদেশে প্রায়শই সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী। নারীকে পুরুষের সমমর্যাদা দিতে সরকারি বেসরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। তারপরও প্রয়োজন দেশের সর্বস্তরের নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরন।

শহরে শিক্ষিত পরিবেশ আর আবহমান কাল ধরে গ্রামীন রীতিনীতিতে বেড়ে উঠা মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। শহরের মেয়েদের পরিবারের সদস্যরাই মূলত: তাদের ভবিষ্যত জীবন গড়তে সহযোগিতা করে। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণ, কাজে অংশগ্রহনে সহযোগিতা তো দূরের কথা : রয়েছে অনেক বাঁধা।

শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলের নারীদের একটি কমন সমস্যা হল তারা লোকের কথায় মানসিক নির্যাতনের শিকার। বয়স,গায়ের রং, উচ্চতা , কাজের  যোগ্যতাসহ প্রতিটি পদক্ষেপে এদেশের নারীদের সহ্য করতে হয় ভয়াবহ টিজিং।

নারী হওয়ার কারনে এ কাজ করা যাবে না ; সে কাজ করা যাবে না। ঘর থেকে বের হলে পাড়া প্রতিবেশী জানতে চাইবে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? শিক্ষা কিংবা কাজের জন্য বাইরে গেলে মেয়েদের যেমন সন্দেহের চোখে দেখা হয়। একটি ছেলের ক্ষেত্রে সে রকম কোন আচরণ করে না পরিবার কিংবা সমাজের লোকজন। বর্তমানে অনেক মেয়ে আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হবার পরে বিয়ের কথা চিন্তা করে। কিন্তু সেই মেয়েকে নিয়ে নিজ পরিবারসহ চারপাশের মানুষের চিন্তার শেষ নেই। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় মেয়েদের স্বপ্নপূরনের ক্ষেত্রে পাছে লোকে কিছু বলে গোছের লোকগুলোর বেশির ভাগই 'মেয়েলোক। সবসময় ঈর্ষান্বিতভাবে  নয় : অনেক সময় চলমান সমাজধারাকে ফোকাস করে। এখানে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হবার রেওয়াজ আজও চলমান। বিয়ে ছাড়া কোন মেয়ে একাকী জীবনযাপন করবে তা যেন ভয়ংকর কিছু। কোনক্রমে কোন নারী তালাকপ্রাপ্ত হলে যেন সব দোষ নারীর। সিঙ্গেল মাদার বিষয়টা এদেশে মেনে নেওয়া যেন পর্বতসমান পাপ। স্বামী দেশের বাইরে থাকা , কাজের কারণে দূরে থাকা , তালাকপ্রাপ্ত কিংবা প্রাপ্ত বয়স্কা।  সিঙ্গেল নারীদের চারপাশের পুরুষরা এমনভাবে বিরক্ত করে যেন নারীর একা থাকা অস্বাভাবিক কিছু।

একা মানেই একটা নারীকে লড়াই করে বাঁচতে হয়। গোটা সমাজের সাথে কেবল নারী হয়ে জন্মানোর কারনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজের লাঞ্ছনা গঞ্জনার শিকার হতে হয় নারীকে। কন্যাশিশুরা শিকার হয় ব্যাড টাচের। ভীড়ে যেন নারীর যাওয়া নিষেধ। পথেঘাটে সর্বত্র থাকেনা নারীর বাক্ স্বাধীনতা। ভদ্র মেয়ে বলতে পরিবার থেকে শিক্ষা দেওয়া হয় মাথা নীচু করে নীচু গলায় কথা বলা। কেউ খারাপ কিছু বললে উত্তর না দেওয়া। অথচ শেখানোর কথা ছিল মাথা উঁচু করে বাঁচার সাহসী জীবন যাপন করার। 

নারী নেতৃত্ব বাস্তবায়ন করতে হলে শিশুকাল থেকেই কন্যাশিশুকে বিশেষ যত্নে মানুষ করতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন তার মানসিক শক্তিকে শক্তিশালী করা। সমাজে মানুষের কথার চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় অনেক মেয়ে। অনেকে লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করে। আবেগে ইতি টানে জীবনের। সমীক্ষা চালালে দেখা যাবে এদেশের অনেক মেয়ে তার ইচ্ছায় জীবন যাপন করতে পারেনি লোকের ভয়ে। নিজের স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়তে পারেনি কেবল লোকে কি বলবে ভেবে। কারণ লোকগুলো খুব দূরের নয়। একদম নিজস্ব কাছের লোক।

আমরা প্রতিদিন অনেক ইউটিউব কন্টেন্ট দেখি। যেখানে নারীদের ছোট করা হয়। বিভিন্নভাবে নারী অগ্রগতিকে ভয় দেখানো। আমরা এখনও সেই সমাজেই বাস করি। কোন তারকার তালাক কিংবা দ্বিতীয় বিয়েতে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

নারী পুরুষের সমতা অর্জন কেবল নারীদের উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহন করানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। যতদিন না মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ একে অন্যকে সম্মান করতে না জানবে ততদিন সমতা কল্পনা রয়ে যাবে। 

কারো একা পক্ষে দ্রুত মান্ধাতার আমলের ধ্যান ধারনাকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেকের এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে। পজেটিভ চিন্তার চর্চা ও প্রসার ঘটাতে হবে। কেউ নেগেটিভ কথা বললে প্রতিবাদ করে সেটাকে পজেটিভে পরিবর্তন করতে হবে। নারীর জীবনের বড় বাঁধা তার চারপাশের মানুষগুলো।

বেশিরভাগ মানুষই চান না অন্য কেউ ভাল কিছু করুক। তাই একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রবনতা কম।  অনেক নারী তার মেধাকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারেন না সহযোগিতা না পাওয়ার ফলে। যে নারীর চারপাশে টক্সিক মানুষ যত কম সে নারী তত সুখী ও তত উন্নয়ন করতে পারে। 

দু:খের বিষয় গোটা পৃথিবী প্রযুক্তির কারণে আমূল পরিবর্তন হলেও মানুষের নেগেটিভ ধ্যান ধারনার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। আমাদের দেশে সমতা অর্জনের লক্ষ্যে নারী নেতৃত্ব বাস্তবায়ন করতে চাইলে চাই নারীর জন্য সুস্থ মানসিক পরিবেশ, জনসচেতনতা। মিডিয়ায় নারীবান্ধব কন্টেট উপস্হাপন,
 নারীকে নীচু করা হয় কিংবা ভয় দেখানো হয়  এমন কন্টেট অনলাইনে প্রদর্শিত হতে না দেওয়া জরুরী। লোকের কথা একটা "ভয়" মাত্র। আর এ ভয়কে জয় করেই নারীকে অর্জন করতে হবে সমতা।

প্রতিষ্ঠাতা, ইয়ারা , নারীর ক্ষমতায়নে গ্রামভিত্তিক অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রম

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন