অবরোধের শিকার খেটে খাওয়া মানুষ


নিজস্ব প্রতিবেদক: অক্টোবর ২৮ থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে ৬৪টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ১৫০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। হরতাল-অবরোধে শুধু পরিবহন খাতেই এ কদিনে ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অন্য একটি স্টাডিতে দেখা যায়, এক দিনের হরতালে আর্থিক ক্ষতি ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এখন যে বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসা দরকার তা হচ্ছে- এ ক্ষতির রেশ বহুমুখী। বিশেষ করে পরিবহন খাতের সঙ্গে যারা জড়িত আছে তাদের প্রত্যেকের আয়-রোজগারের বিষয়ে আমরা সবাই অবগত। তাদের অবস্থা অনেকটা দৈনিক মজুরির মতো অর্থাৎ কাজে থাকলে তাদের ঘরে মোটামুটিভাবে সচ্ছলতা বিরাজ করে। তা ছাড়া পরিবহন সেক্টরে নিত্যদিন শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, এ খাতের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং যারা বাসে কিংবা গাড়িতে ড্রাইভার, ‍সুপারভাইজার, হেলপারের দায়িত্ব পালন করেন তারা নিয়মিত কাজের সুযোগ পান না। তবে এ সেক্টরে দৈনিক যে মজুরি পাওয়া যায় তা দিয়ে তাদের সংসারের দুই দিনের পারিবারিক ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব। এখন যদি সপ্তাহান্তে পাঁচ দিন হরতাল-অবরোধ চলে তা হলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আয়-রোজগার দিয়ে পাঁচ দিনের পারিবারিক ব্যয় বহন করা অসম্ভব। হরতাল-অবরোধে পরিবহন খাতের শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতি সাধনের পাশাপাশি মানসিকভাবে তারাও ভেঙে পড়ছে। বিএনপি-জামায়াতের আহূত হরতাল কর্মসূচির কারণে তাদের পরিবারের অবস্থা ক্রমান্বয়ে শোচনীয় হয়ে পড়ছে।

সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে জানা যাচ্ছে, বাসে পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণে অংশ নিলে বিকাশে টাকা চলে আসে অগ্নিসংযোগকারীদের কাছে। আমরা যারা অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তারা সবাই অবগত রয়েছি সন্ত্রাসবাদের একটি আলাদা সিগনেচার রয়েছে। আলাদা সিগনেচার এ অর্থে বলা হয়ে থাকে; সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত রয়েছে এবং বহির্বিশ্ব থেকে অর্থের জোগান নিশ্চিত করা হয়। অগ্নিসন্ত্রাসের যে নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি এটার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেখা যাবে খেটে খাওয়া মানুষ ধীরে ধীরে আর্থিক অসঙ্গতিতে পড়ে যাবেন। বিকাশে যে টাকা সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে প্রকৃত অর্থে এর যোগানদাতা কারা? এ অর্থের যোগানদাতাদের একটি বড় অংশ বাইরে থেকে মদদ দিচ্ছে। দেশের কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে এবং এদের শুভাকাঙ্ক্ষী যারা বিদেশে অবস্থান করছে তাদের একটি বড় অংশ অর্থের মদদ দিচ্ছে।

২৮ অক্টোবরের পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াত ভিন্ন প্ল্যাটফরমে আলাদাভাবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সারা দেশে ঢিলেঢালাভাবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে, হরতালের সমর্থনে দেশের কোথাও উল্লেখ করার মতো মিছিল চোখে পড়েনি। এককথায় বললে বলা যায়, হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে জনগণের সাড়া পাওয়া যায়নি। জনগণ হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তা হলে বিএনপি-জামায়াত কেন বারবার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করে। কি উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাদের এ কর্মসূচি? এ বিষয়গুলোকে সচেতন মহলের অ্যাড্রেস করার প্রয়োজন রয়েছে। যাতে জনগণ সচেতন হয় সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে কাজ করে।

হরতাল-অবরোধ জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে এ কথা যেমনভাবে সত্য, ঠিক তেমনিভাবে হরতাল-অবরোধের কারণে মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি কাজ করে এ বিষয়টি সত্য। হরতাল-অবরোধে মানুষ ঘর থেকে কম বের হয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও স্থবির হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। করোনাকালে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেশের শিক্ষকসমাজ যেখানে বদ্ধপরিকর, শিক্ষা ক্ষেত্রে করোনার সংকট ক্রমান্বয়ে কমে আসছে সে জায়গায় হরতাল-অবরোধের মতো জনবিধ্বংসী কার্যক্রম ঘোষণা করে বিএনপি-জামায়াত জনগণ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ধরনের জনবিধ্বংসী কার্যক্রম ঘোষণার ফলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এ ধরনের বিষয়াদি বিভিন্ন সেক্টরে পরিলক্ষিত হওয়ায় অর্থনীতিবিদ আগাম আশঙ্কার কথা ঘোষণা করেছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে, তা না হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়বে।

আপনারা যারা দেশের পর্যটন খাতের খোঁজখবর রাখেন আপনারা নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। নামকরা হোটেলগুলোতে বুকিং কমে আসছে, বেশ কিছুদিন ধরে পর্যটন নগরীতে পর্যটকদের ট্রাভেলের ওপর নির্ভর করে যাদের জীবিকা জড়িয়ে আছে তারা ব্যাপক অর্থ সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়েছে। এ বিষয়গুলোতে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিদদের উল্লেখযোগ্য হারে ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে অন্যান্য সেক্টরে অপরাধীদের আনাগোনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে আমরা জানি জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা অপরাধীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে, জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে, চিহ্নিত আসামিদের আস্ফালন পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়গুলোর দায়ভার কিন্তু আগুনসন্ত্রাসীদের গ্রহণ করতে হবে। কিংবা আগুনসন্ত্রাসীদের মদদদাতাদের গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া যাদের নির্দেশে ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে গাড়িতে পেট্রোল বোমার কন্ট্রাক্ট গ্রহণ করা হয় তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এ শ্রেণির মদদদাতাদের চরিত্র উদ্ঘাটন করে জাতির সামনে মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং জনগণকে এ ব্যাপারে জানাতে হবে।

পরিশেষে উল্লেখ করা যায়, জনগণের সমর্থন না থাকলেও হরতাল-অবরোধের কারণে মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি পরিলক্ষিত হয়। রাস্তাঘাটে স্বাভাবিকভাবে যানবাহনের সংখ্যা কমে আসে। এ শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে যারা কাঁচামাল পরিবহনে নিয়োজিত থাকে তাদের অতিরিক্ত ভাড়া প্রদান করতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে কাঁচামালের দাম বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। কাজেই অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর বর্তায়। এদিকে একটি পক্ষ রয়েছে; তাদের ধারণা দুর্বৃত্তরা এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। আবার কেউ কেউ বলছে বিএনপির ওপর দায় চাপাতে একটি পক্ষ এ ধরনের কার্যক্রম করছে। আসল কথা হচ্ছে; বিএনপি-জামায়াত যদি হরতাল-অবরোধ আহ্বান না করত তাহলে দুর্বৃত্তরা কীভাবে এ ধরনের সুযোগ পায়? কাজেই এ জায়গা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সরে আসা উচিত। প্রকৃতকথা হচ্ছে- জনগণের ম্যান্ডেট ব্যতিরেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সে জায়গায় জনবিরোধী কার্যক্রম গ্রহণ করে কোনোভাবেই জনগণের কাছাকাছি আসার সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, বিএনপি জামায়াতের এ সংক্রান্তে বোধোদয় হওয়া উচিত এবং জনগণবিরোধী কার্যক্রম থেকে ফেরত এসে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে রাজনীতির স্বাভাবিকতা গ্রহণ করা উচিত।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন