জীবন সংগ্রামের পাতা থেকে

মোঃ আব্দুস সামাদ
ব্যাচ-১৯৮২
বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে পিছন ফিরে দেখার বা তাকাবার সময় কই। সবাই আমরা ব্যস্ত জীবন সংগ্রামের লড়ায়ে। তবুও পুনর্মিলনী বলে কথা। সবাই একসাথে হলে শিশুকাল, বাল্যকাল, কৈশর, শৈশবের অনেক কথাই স্মৃতির পাতায় জেগে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। এরই কিছু কথা আসন্ন পুনর্মিলনীর স্মরণিকার পাতায় আটকে রাখতেই আমার আজকের লেখা। পবিত্র কুর'আনে মাহন আল্লাহ তালা বলেছেন" আসলে আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতির অবস্থা বদলান না যতক্ষণ না তারা নিজেদের কর্ম বা গুনাবলী বদলে ফেলে"। সুরা রাদ, আয়াত-১১ (আয়াতাংশ)। আর এই অবস্থা বদলানোর জন্যই যত লেখাপড়া, কর্মব্যস্ততা ও সংগ্রাম। তাই ফিরে দেখা স্কুল জীবনের শুরু থেকে শেষ।

বাঘইল প্রাথমিক বিদ্যালয় ছোট ওয়ান, বড় ওয়ান, টু থ্রি ফোর ফাইভ শেষ। তারপর বাঘইল উচ্চ বিদ্যালয় ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী, শুধুমাত্র মানবিক বিভাগ, তখনও ভিজ্ঞান ও বানিজ্য বিভাগ খোলা হয়নি। বেশ বড় হোলেই বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছোট ওয়ানে ভর্তি করে দেন। সবুজ সাথী, ধারাপাত ও আদর্শ লিপি বই নিয়ে লেখাপড়ার যাত্রাশুরু হয়। শ্রেণীকক্ষে আসনের তুলনায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশী হওয়ায় গাদাগাদি করে বসার পরেও দু-চারজনকে দাড়িয়ে থাকতে হতো। এখনকার মত ড্রেস কোডের কোন বালাই ছিল না। বেশীর ভাগ ছাত্র ছাত্রী যে যার মত জুতা স্যান্ডেল ছাড়াই হাফপ্যান্ট, পাজামা, লুঙ্গি, গেঞ্জি, জামা পরে স্কুলে যেতাম। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মানও তেমন ভাল ছিলনা। বাচ্চাদেরকে যে যার মত করে পোষাক পরিয়ে স্কুলে পাঠাতো। বড় ওয়ানের বার্ষিক পরীক্ষা হওয়ার আগেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে যায় এবং স্কুলের ক্লাসও বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে সাবাই অটো পাশ। আব্বা তাতে নারাজ, অটো পাশ না নিয়ে আমাকে পূর্বের ক্লাসেই পড়ালেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাষ্টারগন খুবই ভাল অভিভাবক সুলভ ছিলেন। লেখা পাড়ার ব্যপারে সবাই খুব যত্ন গুরুত্ব দিতেন এবং যত্ন নিতেন। বিশেষ করে হেড মাষ্টার করিম মৌলোভী স্যার, ওলি স্যার, ইয়াকুব স্যার ও বিশু স্যার (পুরা নাম না জানার কারনে সংক্ষিপ্ত নাম লিখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি) লেখাপড়া ও শৃংখলার ব্যপারে খুবই কঠোর ছিলেন। ভয় দেখানোর জন্য বেত ক্লাসে নিয়ে আসতেন তবে পড়া না হলে শান্তির জন্য বেত দিয়ে খুব কমই পেটাতেন। বেত দেখেই আমরা ভয় পেতাম। বেতের মারের কারনে সে সময় স্যারদের নির্দয় মনে হলেও বড় হয়ে বুঝেছি তাঁরা সে সময় যা করেছেন তা আমাদের কল্যাণের জন্যই করেছেন। আনেক স্যার পড়া না পারলে বসার বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন। আবার কোন কোন সময় যারা পড়া পারত না তাদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখে একই পড়া যে পারত তাকে দিয়ে তাদের কান মোলিয়ে দিতেন। ছোট ওয়ান এবং বড় ওয়ানের ক্লাস শেষে ঈদগাহের ভিতরে আমগাছ তলায় গোল হয়ে বৃত্তের মত দাঁড় করানো হত এবং বৃত্তের মাঝখানে একজনকে ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসাবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাকে দিয়ে শুরের তালে তালে শতকিয়া ও নামতা পড়ানো হত। তারপর ছুটি দেয়া হত। ছোট বেলায় শীতের সকালে খালি পায়ে, বর্ষাকালে কাদা পায়ে, বৃষ্টিতে কলাপাতা ও মানপাতা মাথায় দিয়ে এবং গরমকালে বিশেষ করে চৈত্র মাসের সূর্যের তাপে রাস্তার গরম ধুলায় খালি পায়ে পাড়ার সকল ছেলে মেয়েরা দলবেঁধে গলাগলি ধরে স্কুলের যাতায়াতের স্মৃতিগুলো, বাবই পাখির বাসা গোল করে সুতলি দিয়ে বেঁধে অথবা কারো গাছের বাদাম (জাম্বুরা) পেড়ে ফুটবল বানিয়ে খেলার স্মৃতিগুলো মনের কোনায় ভেষে উঠে। সত্যই এগুলোছিল অদোপাড়াগাঁয়ের অকৃত্তিম মেলামেশা ও ভালবাসার দৈনন্দিনের চিত্র যার সাথে বর্তমানের কোন দূরতম মিল নেই। বর্তমানের আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে এগুলো রূপকথার কাহিনীর মত মনে হয়। যুদ্ধপরবর্তী দেশের সামাজিক/আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল।
 
ফলে প্রাথমিক স্তরেই আমাদের অনেক সহপাঠির লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া জীবনের কিছু স্মরণীয় ঘটনা মনে হলে একা একাই হাঁসি পায়, কখনও নিজেকে খুব বোকা লাগে আবার কখনও সেগুলো আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রেরণা জুগিয়েছে। যেমন আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র, শিক্ষকগন বলে দিলেন যে, বার্ষিক পরীক্ষায় দশ লাইন কবিতা মুখস্থ বলতে হবে। কবিতা মুখস্থ বলতে হবে শুনে আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম, কোথায় পাই কবিতা। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের যেয়ে কবিতার বই বিক্রেতার কাছ থেকে গরিবের ছেলে শাহজাহান এবং ফুল মালা নামে দুইটি কবিতার বই কিনে এনে দুই পাতা করে চার পাতা মুখস্থ করে নিলাম। মনের কাছে খুব পুলকিত ভাব লাগছে। এখন আর ঠেকায় কে? কিন্তু তারপরও মনের কাছে কেমন যেন খটকা লাগছে এই ভেবে যে, ক্লাসের পরীক্ষায় ক্লাসের বইয়ের পড়া বাদ দিয়ে বাহিরের বইয়ের পরীক্ষা নিবে এ আবার কেমন কথা। আমি যে এমন প্রস্তুতি নিয়েছি বিষয়টি ক্লাসের অন্য কারো সাথে আলাপও করছি না সবাই জেনে যাবে বলে। পরীক্ষার দিন সমাগত হল। আমার রোল তিন, প্রথম জন পরীক্ষা দিয়ে বের হলে দ্বিতীয় জন পরীক্ষা দিতে ঢুকল এই ফাঁকে আমি প্রথম জনকে "সে কোন কবিতার ১০ লাইন মুখস্থ বলেছে জিজ্ঞাসা করতেই বলল আমাদের গ্রাম কবিতার প্রথম ১০ লাইন বলেছে"। এবার মনের খটকা ভাঙলো। বাংলা বইয়ের সূচীপত্রে লেখা ছিল "গদ্য" মানে গল্প এবং "পদ্য" মানে কবিতা। পদ্য মানে কবিতা এটা তখনও আমার অজানা ছিল বিধায় এমন ঘটনা ঘটেছিল। আর একটি ঘটনা ৫ম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষার সকল প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষা দিতে না পারা। বৃত্তি পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল নাজিমউদ্দিন হাইস্কুল। কথা ছিল প্রথম পরীক্ষার দিন সকালে রিক্সাযোগে সবাই একসাথে যাব। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মত ভাল ছিল না। রিক্সা কমছিল, ইটের রাস্তা ও পায়ে হাঁটা পথ। পরীক্ষার আগের দিন যোগাযোগ না হওয়ায় পরীক্ষার দিন আমাকে ছাড়াই নতুন হাট হয়ে পাকা রাস্তা দিয়ে সবাই পরীক্ষা সেন্টারে চলে যায়। আমি বাড়ির সামনে অনেকক্ষন দাড়িয়ে থেকে কাউকে না পেয়ে হেঁটেই ঈশ্বরদী যায়। কিন্তু নাজিমউদ্দিন হাইস্কুল কোথায় চিনি না। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর পরীক্ষা কেন্দ্র পেলেও ততক্ষনে এক ঘন্টা সময় পার হয়ে গেছে। দুঃখ কষ্টে পরীক্ষা না দিয়েই বাড়ি ফিরি। ইনফরমেশন এবং কমিউনিকেশন গ্যাপের কারনে এমন ঘটনা ঘটেছিল। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমার জীবনে এমন ঘটনা আর ঘটতে দেইনি। এভাবেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে।

বাঘইল প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাঘইল উচ্চ বিদ্যালয় এল প্যাটার্নে দুটি পাকা ভবন। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে শুরু হল হাইস্কুল জীবন। তবে হাইস্কুল শুধু একটি ভবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাদের সময় ঈদগাহের দেয়ালের পাশ দিয়ে একটি এবং কলের খাদের পাড়দিয়ে একটি বাঁশের চ্যাগারের বেড়ার দুটি টিনের ঘর ছিল, সেখানে ক্লাস হত। প্রথমে ছেলেদের জন্য কোন টয়লেট ছিল না, পরে ছেলেদের জন্য একটি টয়লেট তৈরী করা হয়। যদিও হাইস্কুলের শিক্ষক মন্ডলিগনের মুখ পরিচিত ছিল তবুও লেখাপড়ার জন্য তাঁদের সাথে নতুন অধ্যায় শুরু হল। আগে বেতন দিতে হত না। এখন বেতন দিতে হয়। ৬ষ্ঠ শ্রেনীর মাসিক বেতন ছিল ৫.৫৫ টাকা আর ৭ম শ্রেণীর বেতন ছিল ৬.২৫ টাকা। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাস হত প্রাইমারী স্কুল ভবণ এবং হাইস্কুল ভবনের কোনে একটি ইটেরে দেয়ালের উপরে টিন সেড ঘরে। হাইস্কুল জীবনটা আমার খুব সরল সহজ ছিল না। জীবন সংগ্রামের প্রতিকূলতার সাথে সর্বদাই যুদ্ধ করে চলতে হয়েছে। আমি আগেই বলেছি সাধীনতা পরবর্তী দেশে তখন প্রায় প্রতিটি পরিবারকেই অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। তাছাড়াও সে সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল বেশ। গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারই কৃষি ও দিনমজুরের উপর নির্ভরশীল। এক বছর অতিবৃষ্টি অন্য বছর খরা এভাবে কৃষকরা ফসল না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ব্যবসায়ীরাও যুদ্ধে ক্ষাতিগ্রস্থ হওয়ার পর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তেমন ভাল করতে পারে নাই। হাতেগোনা কিছু চাকরীজীবিরাই কেবল দুবেলা চারটা খেতে পেরেছে। আমাদের ১৫/১৬ জন সদস্যের বড় সংসারটা মূলত কৃষি ও বাবার ব্যবসায় নির্ভর ছিল। প্রাকৃতিক কারনে কৃষি মন্দা এবং যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাবার ব্যবসায় মন্দা দুটোই আমাদের সংসারটাকে গলা চিপে ধরে। অভাব অনটনের কারণে এক পর্যায়ে বাবা জমি বিক্রয় করা শুরু করে।

এক বিঘা জমি বিক্রয়ের টাকায় ৫/৬ সপ্তাহের বেশী সংসার চলত না। দেখা দেয় চরম ও অবর্ণনীয় অভাব যা বর্ণিত হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বা বর্তমান প্রজন্মের কাছে রূপকথার কাহিনীর মত মনে হবে। সব বর্ণনা করে লেখার কলেবর বৃদ্ধি না করে সংক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা আসন্ন পুনর্মিলনীর স্মরণিকার পাতায় আবদ্ধ করলাম।

পূর্বেই বলেছি ৭ম শ্রেণীর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬.২৫ টাকা। অভাবের কারণে স্কুলের মাসিক বেতন দিতে না পারায় এক পর্যায় স্কুলের খাতা থেকে আমার নাম কেটে দেয়া হয়। এটা আমার বাবার জন্য যেমন খুবই অপমানজনক ছিল তেমনি বিব্রতকরও ছিল বটে। আর আমার কাছে ছিল যেমন জীবন গড়ার পথে অসম দেয়াল বা বাধা তেমনি ছিল জীবনে চলার পথে সকল বাধাকে অতিক্রম করার দৃঢ় প্রত্যয়ের এক অনুপ্রেরণা। স্কুলের প্রশাসনের বিরুদ্ধে আমার চরম ক্ষোভ ও জেদ জন্মে যে, যেই স্কুল থেকে আমার নাম কেটে দেয়া হল সেই স্কুলের সকল দায় পরিশোধ করে আমি আবার ভর্তি হব এবং কোন ক্রোমেই আমি এ জীবন সংগ্রামে পরাজিত হব না। সে বছর আর আমার পড়ালেখা হোল না। শুরু হোল লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিশ্রম করে উপার্জনের সংগ্রাম। নামাজ পড়ে অথবা নামাজ ছাড়া একাগ্র চিত্তে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতাম যেন মহান আল্লাহ আমার ও আমাদের পরিবারের প্রতি সহায় হন। জমিতে লাঙ্গল বওয়া, ধান বোনা, ধান নিড়ানো, ধান কাটা, রবি বা চৈতালী ফসল চাষ করা, কাটা মাড়াই করা। পদ্মা নদী, কলের খাদে, বাঘইলের গাঙ্গে, বলরামের খাদে, কৈমারা তিনকোনা বেলতলা ইত্যাদি খাদে মাছ ধরে হাট বাজারে বিক্রয় করা, বাবলা ও জিগা গাছের আঠা কেটে শুকিয়ে ঈশ্বরদীর বাজারে গাম হিসাবে বিক্রয় করা। ব্যবসায় করা যেমন হাট থেকে সবজি ক্রয় করে, আখের জমি থেকে আখ কিনে নিয়ে পাক্শীর বাজারে বিক্রয় করা। হাট বা গ্রামগঞ্জ থেকে পাট, হলুদ, মটর, মশুর, গম ইত্যাদি ক্রয় করে নিয়ে ঈশ্বরদীর বাজারে আড়তে বিক্রয় করা। আবার জানুয়ারী/ফেব্রুয়ারী (যে সময় বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ক্লাস হত না) মাসে কৃষকের কেশর আলুর ক্ষেত জমি ধরে ক্রয় করে নিয়ে সারাদিন ধরে তুলে রাতে ধুয়ে বস্তা ভরে রেখে শেষ রাতে আযানের আগে রিক্সা করে নিজে চালিয়ে ঈশ্বরদীর বাজার নিয়ে বিক্রয় করা। গমের বিনিময়ে রাস্তা নির্মাণের মাটি কাটা এবং বাড়ি বাড়ি টিউশনি করা। এ সংগ্রাম থেমে থাকার সংগ্রাম ছিল না, এটা ছিল প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ের সংগ্রাম আর স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফি ও অন্যান্য খরচের টাকা জমানোর সংগ্রাম। যেভাবেই হোক আমাকে আবার স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হবে এবং যে কোন মূল্যে এস এস সি পাশ করতেই হবে। কারন তখন আমি এতটুকু বুঝতাম যে, সে সময়কার সামাজিক/রাষ্ট্রিয় প্রেক্ষাপটে এস এস সি পাশের একটি বোর্ড সার্টিফিকেট হলে আমি একটা তৃতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকরী পাব। এটাই আমার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এ স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ দেয়ার পথটি ছিল বড়ই সংগ্রামের। একটি দরিদ্র পরিবারে অভাব নিত্যদিনের কিন্তু একটি মধ্যবিত্ত পরিবার অভাবে পড়লে তার চিত্র কেমন হয় তা প্রকৃত ভূক্তভুগী পরিবার সংশ্লিষ্ট সদস্য ছাড়া অন্য কোন পরিবারের বোঝার কোন ক্ষমতা নেই। পরের বছর সমস্ত বকেয়া বেতন পরিশোধ করে আবার ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। ততদিনে আমার ছোট ওয়ান থেকে একই সাথে বেড়ে উঠা ক্লাসের সাথীরা অষ্টম শ্রেণীতে উঠে গেছে। নীচের ক্লাসের সাথীদের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া ছিল আমার জন্য খুবই কষ্টের ও লজ্জার বিষয় ছিল। কিন্তু সেদিন আমাকে সকল কষ্ট ও লজ্জাকে উপেক্ষা করে অগ্রসর হতে হয়েছিল। কারণ এটা কোন অগৌরবের বিষয় ছিল না, এটা ছিল জীবনে সংগ্রামে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চ্যালেঞ্জ। আমাদের সময় ডক্টর মোঃ লুৎফর রহমানের একটি ছোট গল্পে (সম্ভবত শারীরিক পরিশ্রম গল্পে) পড়েছিলাম "কোন কাজই অগৌরব নয়, অগৌরব হয় মিথ্যা, মুর্খতায় আর হীনতায়"। অষ্টম শ্রেণীর একটি ঘটনা আমার জীবনের পরবর্তী সময়ের জন্য কষ্টের ও স্মরণীয় হয়ে আছে। একটি মাত্র জামা গরমের দিন গা-ঘেঁমে শরীরে টান লেগে ছিঁড়ে গেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মা আমার বড় ভাইকে তাঁর বিয়ের সময়ে দানে পাওয়া পিতলের ঘড়াটি (কলস) ঈশ্বরদী বাজারে বিক্রয় করে আমার জামা বানাতে এবং বাকি টাকা দিয়ে চাল কেনার জন্য বের করে দিলেন। বড় ভাই যথারিতী ঈশ্বরদীর বাজারে যেয়ে পুরাতন কাপড়ের বাজার থেকে একটি গাউন কিনে সে কাপড়ের জামা বানিয়ে ও বাকি টাকার চাল কিনে বাড়ি ফেরেন। সেই জামা গায়ে দিয়ে দুইদিন পর আমি স্কুলে যায়। অংকের মাষ্টার দুইদিন স্কুলে না আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে জামা না থাকায় স্কুলে আসতে পারিনি বলে অবগত করি।
 
তিনি আমাকে ফিরে আবার জিজ্ঞাসা করেন "এখন নতুন জামা হয়েছে"? উত্তরে আমি বলি হয়েছে এবং আমার গায়ের এটাই নতুন জামা। সেদিন আমার একথা শোনার পর ক্লাসের সকল ছাত্র/ছাত্রী এক সাথে তাচ্ছিল্যের অট্ট হাঁসিতে ফেটে পড়েছিল। কারণ জামাটি আমার কাছে নতুন হলেও ক্লাসের অন্য সবার কাছে ছিল নিতান্তই পুরাতন। তাই সেদিন সবাই হেঁসে উল্লোসিত হয়েছিল কিন্তু নিরবে আমার হৃদয় গভিরে যে বেদনার ক্ষত হয়েছিল তা কেহই সেদিন অনুধাবন করতে পারেনি। এখন আমার বা আমার পরিবারের কারো জামাকাপড় কিনার সময় সে সময়ের ক্লাসের দৃশ্যটি চোখে ভেসে ওঠে। অষ্টম শ্রেণী পেরিয়ে নবমে পদার্পন। তখনও আমাদের স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ খোলেনি। অনেকেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে বিধায় টিসি নেয়ে চন্দ্র প্রভা বিদ্যাপিঠ ও এস এম হাইস্কুলে চলে গেল। শত সংগ্রাম ও জীবনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমি অধম এখানেই রয়ে গেলাম কারণ আমার আর অন্য কোন পথ খোলা নেই। কিন্তু ঐ যে অভাগা যেদিকে চায় যেন সাগরও শুকিয়ে যায়। দশম শ্রেণী উঠার পরেই আমার লেখাপড়ায় প্রেরণার জোগানদাতা শ্রদ্ধেয়ে বড় ভাই হঠাৎ করেই মারা যান। যিনি প্রায়ই আমাকে এই বলে প্রেরণা জোগাতেন যে, দাদা আমরা লেখাপড়া না শিখে মুর্খ হয়েছি, তুমি ভাল করে লেখাপড়া কর যে লেখাপড়ার ভাগ আমরা কেউ নিতে পারব না। কৃষিনির্ভর সংসারের একমাত্র কান্ডারী ৭ সন্তানের জনক পৃথিবী ছেড়ে চলেগেলে আবার আমাদের সংসারটি অথৈ সাগরে পড়ে। আমার লেখাপড়া আবার বন্ধ করে সংসারের হাল ধরতে হয়। তিন মাস পেরিয়ে যাচ্ছে ক্লাসে যেতে পরছি না। অপর দিকে স্কুল থেকেও প্রধান শিক্ষক বার বার খবর পাঠাচ্ছেন ক্লাসে যোগদানের জন্য। বেতন না দিতে পারায় যে স্কুল থেকে ৭ম শ্রেণীতে আমার নাম কেটে দেয়া হয়েছিল আজ সেই স্কুল থেকেই বার বার ক্লাসে যোগদানের জন্য বাড়িতে খবর পাঠানো হচ্ছে। তার কারণটা প্রকাশ করে আমার প্রতিষ্ঠানের সুনাম খুয়াতে চাই না। তবে আমাকেও তো পরীক্ষা দিতেই এবং এস এস সি পাশ করতেই হবে। আর আমার এতটুকু আত্ববিশ্বাস আছে যে, আমাদের ব্যাচে যদি একজনও পাশ করে তবে সে জন হবো আমি। চতুর্মুখি প্রতিকূলতা, সংসারে অভাব, ৮ জন সদস্য রেখে বড় ভাই মারা গেলেন তাদের খরচ, এক্সট্রা ক্লাসের বেতন, এস এস সি পরীক্ষার ফিস ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চিন্তার শেষ নাই। আসন্ন এস এস সির ফরম পূরনের জন্য প্রয়োজন হবে ২৮০ টাকা কোথায় পাব। আগে থেকেই প্রস্তুতি নিলাম দুইটি খাসি ও কিছু মুরগী কিনে পালতে থাকলাম। অন্যদিকে প্রতিদিনের বাজার থেকে কিছু কিছু করে বাঁচিয়ে ঘরের বাঁশের খুঁটি কেটে পয়শা জমাতে থাকলাম। কিন্তু দুর্ভাগার দুর্ভাগ্য দুটি খাশির একটি খাশি মারা গেলে বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। অবশেষে ফরম পূরনের দিন সমাগত হলে খাশি মুরগি বিক্রির টাকা ও খুঁটি কাটার পয়সা মিলিয়ে মোট ২৮০ টাকা জমা দিতে পেরে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করি।

হাইস্কুল শিক্ষা জীবনে শত প্রতিকূলতার মধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষদের কাছে প্রেরণা পেয়েছি তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলায় ফরিদা আপা, অংকে মুকুল স্যার আর ইংরেজীতে খান স্যার। ফরিদা আপা অন্যান্যদের মত গাতানুগতিক ভাবধারায় পড়াতেন না। তিনি অনেকটা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়াতেন। ছাত্র ছাত্রীদের বাংলার নোট বই দেখে পড়তে নিষেধ করতেন। বাংলায় গল্প ও কবিতা তিনি এমন ভাবে বুঝিয়ে দিতেন যেন কোন ছাত্র/ছাত্রীর নোট বই পড়া না লাগে এবং আমি সুন্দর বুঝতাম আর অভিভূত হতাম এবং যে কোন প্রশ্নের উত্তর আমি নোট বই ছাড়াই লিখতে পারতাম। ছুটি গল্পের ফটিকের চরিত্র নিজে বানিয়ে লিখার প্রতিযোগীতায় আমি প্রথম হয়েছিলাম এবং প্রথম পুরষ্কারটি আমি পেয়ে ছিলাম। পুরষ্কার ঘোষনা করে অজানা নতুন বিষয়ের উপর তিনি লিখতে দিতেন যেমন "এই দিন সেই দিন", "যখন আমি ছোট্ট ছিলাম," "শীতের সকালে", "বসন্তের বিকেলে” ইত্যাদি। আনন্দের বিষয় হল প্রটিতেই প্রথম পুরষ্কারটি আমি লুফে নিয়েছি। বাংলা ছাড়া ইংরেজী বিষয়ে খান স্যার এবং অংকে মুকুল স্যার এমন সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিতেন ফলে এসব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ার কোন প্রয়োজন হয়নি আর প্রাইভেট পড়ার সামর্থ আমার ছিল না। ধর্মীয় শিক্ষক মুজিবুর রহমান স্যারের নামাজ পড়ানো ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে অবদানের কথা ভুলার নয়।
 
অনেক শিক্ষকের নাম উল্লেখ না করা হলেও তাঁদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্লাসরুমের পাশে স্কুলের জমিতে ক্লাস বিত্তিক সবজি বাগান করার প্রতিযোগতা হত। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা হত প্রতি বছর। খেলাধুলায় আমার তেমন কোন অংশ গ্রহন ছিল না। ছোট ওয়ান থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত শিশু, কিশোর, বাল্যজীবনের দূরন্তপনা, প্রতিযোগীতা, প্রতিকূলতা ও সকল সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে বিদায়ের ক্ষন উপস্থিত হয় ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে। এদিন আমাদের ক্লাসরুমটাকে লাল নীল রঙ্গিন কাগজের ফুলে সাজানো হয় এবং জানানো হয় আজ আমাদের এ স্কুল থেকে বিদায়ের পালা। একটি লালগোলাপ হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মায়া মমতার সুতো ছিঁড়ে বিদায় নিতে হল। সেদিন আমরা ১৪ জন বিদায় নিয়েছিলাম। আমাদের পরীক্ষার সেন্টার পড়েছিল ঈশ্বরদী সাড়া মাড়োয়ারী (এস এম) হাইস্কুলে। চন্দ্র প্রভা বিদ্যাপিঠ এর মানবিক বিভাগের রোল এক, এস এম হাইস্কুল মানবিক বিভাগের রোল এক এবং বাঘইল উচ্চ বিদ্যালয়ের রোল এক (আমার) আসন একই বেঞ্চে পড়েছিল। ফলাফল হয়েছিল প্রায় তিন মাস পরে। রেডিওতে বেলা তিনটার খবরে ফলাফল বের হবার খবর পাই। দৌড়ে চলে যায় পাকশী রেলওয়ে কন্ট্রোল অফিসে। সেখান থেকে বহু কষ্টে রাত আটার দিকে জানতে পারি দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছি। একদিন পরে স্কুল থেকে ফলাফল জানতে পারি। সেবছর আমরা ১৪ জনের মধ্যে ৪ জন পাশ করি। ২ জন (১ জন ছেলে ১ জন মেয়ে) দ্বিতীয় বিভাগে এবং ২ জন (১ জন ছেলে ১ জন মেয়ে) তৃতীয় বিভাগে। আমি সর্বোচ্চ ৫৫৬ নম্বর পেয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। এভাবেই বাইঘল প্রাইমারী ও হাইস্কুল জীবন সংগ্রামের ইতি ঘটেছিল। পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি আমাদের পথের দিশারী শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলীর মধ্যে যাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁদেরকে মহান রব ক্ষমা করুন এবং জান্নাতের উচ্চ আসন দান করুন এবং যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদেরকে ঈমান ও সৎ আমলের সাথে সুস্থ রাখুন। আমীন।

লেখক পরিচিতি:

মোঃ আব্দুস সামাদ, এস এস সি ব্যাচ-১৯৮২। জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারী ১৯৬৭ সার্টিফিকেট মোতাবেক। গ্রামের স্থায়ী ঠিকানা বাঘইল (পূর্বপাড়া সাঁকোর মুখ), ডাকঘর-পাক্শী, থানা-ঈশ্বরদী, জেলা-পাবনা। এস এস সি পাশ করে পাক্শী মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখানে ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে বিমানসেনা হিসাবে (নন-কমিশন) ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিয়ে চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হই এবং ১৬ জুলাই ১৯৮৩ তারিখে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগদান করি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হয়ে দেশে বিদেশে জাতীসংঘ মিশনে দক্ষতা ও সুনামের সাথে চাকুরী শেষে নন-কমিশনের সর্বশেষ পদ মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে ১২ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে অবসর গ্রহন করি। চাকুরীকালিন সময়ে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে Master of Arts Degree অর্জন করি। বর্তমানে আমি ঢাকাতে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত আছি। পরিবারিক ভাবে আমার দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে ঢাকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন