নারীর জীবনে বড় বাঁধা লোকের কথা

ইয়ারা যোহারীন
ইয়ারা যোহারীন: মানুষ হিসেবে পুরুষের সমমর্যাদা পেতে আজও আন্দোলন করতে হচ্ছে গোটা বিশ্বের নারীদের। ডিজিটাল যুগে সবকিছুতে পরিবর্তন আসলেও নারীকে আলাদা করে দেখার বিষয়টিতে পরিবর্তন আসেনি। নারী নেতৃত্বে চলমান এদেশে প্রায়শই সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী। নারীকে পুরুষের সমমর্যাদা দিতে সরকারি বেসরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। তারপরও প্রয়োজন দেশের সর্বস্তরের নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরন।

শহরে শিক্ষিত পরিবেশ আর আবহমান কাল ধরে গ্রামীন রীতিনীতিতে বেড়ে উঠা মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। শহরের মেয়েদের পরিবারের সদস্যরাই মূলত: তাদের ভবিষ্যত জীবন গড়তে সহযোগিতা করে। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণ, কাজে অংশগ্রহনে সহযোগিতা তো দূরের কথা : রয়েছে অনেক বাঁধা।

শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলের নারীদের একটি কমন সমস্যা হল তারা লোকের কথায় মানসিক নির্যাতনের শিকার। বয়স,গায়ের রং, উচ্চতা , কাজের  যোগ্যতাসহ প্রতিটি পদক্ষেপে এদেশের নারীদের সহ্য করতে হয় ভয়াবহ টিজিং।

নারী হওয়ার কারনে এ কাজ করা যাবে না ; সে কাজ করা যাবে না। ঘর থেকে বের হলে পাড়া প্রতিবেশী জানতে চাইবে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? শিক্ষা কিংবা কাজের জন্য বাইরে গেলে মেয়েদের যেমন সন্দেহের চোখে দেখা হয়। একটি ছেলের ক্ষেত্রে সে রকম কোন আচরণ করে না পরিবার কিংবা সমাজের লোকজন। বর্তমানে অনেক মেয়ে আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হবার পরে বিয়ের কথা চিন্তা করে। কিন্তু সেই মেয়েকে নিয়ে নিজ পরিবারসহ চারপাশের মানুষের চিন্তার শেষ নেই। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় মেয়েদের স্বপ্নপূরনের ক্ষেত্রে পাছে লোকে কিছু বলে গোছের লোকগুলোর বেশির ভাগই 'মেয়েলোক। সবসময় ঈর্ষান্বিতভাবে  নয় : অনেক সময় চলমান সমাজধারাকে ফোকাস করে। এখানে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হবার রেওয়াজ আজও চলমান। বিয়ে ছাড়া কোন মেয়ে একাকী জীবনযাপন করবে তা যেন ভয়ংকর কিছু। কোনক্রমে কোন নারী তালাকপ্রাপ্ত হলে যেন সব দোষ নারীর। সিঙ্গেল মাদার বিষয়টা এদেশে মেনে নেওয়া যেন পর্বতসমান পাপ। স্বামী দেশের বাইরে থাকা , কাজের কারণে দূরে থাকা , তালাকপ্রাপ্ত কিংবা প্রাপ্ত বয়স্কা।  সিঙ্গেল নারীদের চারপাশের পুরুষরা এমনভাবে বিরক্ত করে যেন নারীর একা থাকা অস্বাভাবিক কিছু।

একা মানেই একটা নারীকে লড়াই করে বাঁচতে হয়। গোটা সমাজের সাথে কেবল নারী হয়ে জন্মানোর কারনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজের লাঞ্ছনা গঞ্জনার শিকার হতে হয় নারীকে। কন্যাশিশুরা শিকার হয় ব্যাড টাচের। ভীড়ে যেন নারীর যাওয়া নিষেধ। পথেঘাটে সর্বত্র থাকেনা নারীর বাক্ স্বাধীনতা। ভদ্র মেয়ে বলতে পরিবার থেকে শিক্ষা দেওয়া হয় মাথা নীচু করে নীচু গলায় কথা বলা। কেউ খারাপ কিছু বললে উত্তর না দেওয়া। অথচ শেখানোর কথা ছিল মাথা উঁচু করে বাঁচার সাহসী জীবন যাপন করার। 

নারী নেতৃত্ব বাস্তবায়ন করতে হলে শিশুকাল থেকেই কন্যাশিশুকে বিশেষ যত্নে মানুষ করতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন তার মানসিক শক্তিকে শক্তিশালী করা। সমাজে মানুষের কথার চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় অনেক মেয়ে। অনেকে লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করে। আবেগে ইতি টানে জীবনের। সমীক্ষা চালালে দেখা যাবে এদেশের অনেক মেয়ে তার ইচ্ছায় জীবন যাপন করতে পারেনি লোকের ভয়ে। নিজের স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়তে পারেনি কেবল লোকে কি বলবে ভেবে। কারণ লোকগুলো খুব দূরের নয়। একদম নিজস্ব কাছের লোক।

আমরা প্রতিদিন অনেক ইউটিউব কন্টেন্ট দেখি। যেখানে নারীদের ছোট করা হয়। বিভিন্নভাবে নারী অগ্রগতিকে ভয় দেখানো। আমরা এখনও সেই সমাজেই বাস করি। কোন তারকার তালাক কিংবা দ্বিতীয় বিয়েতে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

নারী পুরুষের সমতা অর্জন কেবল নারীদের উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহন করানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। যতদিন না মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ একে অন্যকে সম্মান করতে না জানবে ততদিন সমতা কল্পনা রয়ে যাবে। 

কারো একা পক্ষে দ্রুত মান্ধাতার আমলের ধ্যান ধারনাকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেকের এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে। পজেটিভ চিন্তার চর্চা ও প্রসার ঘটাতে হবে। কেউ নেগেটিভ কথা বললে প্রতিবাদ করে সেটাকে পজেটিভে পরিবর্তন করতে হবে। নারীর জীবনের বড় বাঁধা তার চারপাশের মানুষগুলো।

বেশিরভাগ মানুষই চান না অন্য কেউ ভাল কিছু করুক। তাই একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রবনতা কম।  অনেক নারী তার মেধাকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারেন না সহযোগিতা না পাওয়ার ফলে। যে নারীর চারপাশে টক্সিক মানুষ যত কম সে নারী তত সুখী ও তত উন্নয়ন করতে পারে। 

দু:খের বিষয় গোটা পৃথিবী প্রযুক্তির কারণে আমূল পরিবর্তন হলেও মানুষের নেগেটিভ ধ্যান ধারনার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। আমাদের দেশে সমতা অর্জনের লক্ষ্যে নারী নেতৃত্ব বাস্তবায়ন করতে চাইলে চাই নারীর জন্য সুস্থ মানসিক পরিবেশ, জনসচেতনতা। মিডিয়ায় নারীবান্ধব কন্টেট উপস্হাপন,
 নারীকে নীচু করা হয় কিংবা ভয় দেখানো হয়  এমন কন্টেট অনলাইনে প্রদর্শিত হতে না দেওয়া জরুরী। লোকের কথা একটা "ভয়" মাত্র। আর এ ভয়কে জয় করেই নারীকে অর্জন করতে হবে সমতা।

প্রতিষ্ঠাতা, ইয়ারা , নারীর ক্ষমতায়নে গ্রামভিত্তিক অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রম

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন