পয়লা বৈশাখ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পয়লা বৈশাখ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঈশ্বরদীতে তিন দিনের ‘চরনিকেতন বৈশাখী সাহিত্য উৎসব’ শুরু কাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ‘চরনিকেতন বৈশাখী সাহিত্য উৎসব-১৪৩৩’। ওসাকা চরনিকেতন কাব্যমঞ্চে আয়োজিত এই উৎসবে দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্বরা অংশ নেবেন।

উৎসবকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে ওসাকা চত্বরে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথিদের জন্য আবাসনসহ অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আয়োজক কমিটি। স্থানীয়দের মতে, রাজধানী ঢাকার বাইরে এটি এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ সাহিত্যিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

উৎসবের প্রথম দিন থাকছে মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা ও বাউল গানের আসর। দ্বিতীয় দিনে থাকছে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার, কবিদের স্বকণ্ঠে কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সমাপনী দিন তথা তৃতীয় দিনে গুণীজনদের মতবিনিময় ও সেমিনারের পাশাপাশি প্রখ্যাত কবি মজিদ মাহমুদের জন্মদিন উদযাপন করা হবে। এছাড়াও আয়োজনে থাকছে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা, জারিগান এবং নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন।

এই উৎসবের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রবর্তক বিশিষ্ট কবি ও গবেষক মজিদ মাহমুদ। নিজ গ্রাম চরগড়গড়িকে শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় এখানে গড়ে উঠেছে ‘চরনিকেতন কমপ্লেক্স’, যা বর্তমানে একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার, গবেষণা কেন্দ্র ও প্রবীণদের সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। বর্তমানে সেখানে একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের কাজও চলছে।

২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত আয়োজিত এই উৎসব বর্তমানে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম প্রধান মঞ্চ। স্থানীয়দের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মেলা ও সাহিত্য আসর নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে।

বিশিষ্টজনদের মতে, শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে এমন একটি মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ বাংলাদেশে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিবছরের মতো এবারও এই মিলনমেলা আধুনিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে মুখর হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।

‘যে নামেই হোক, শোভাযাত্রায় দেশজ কৃষ্টি ও ঐতিহ্য থাকুক’

নিজস্ব প্রতিবেদক: চার দশক আগের কথা। ১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল বা বাংলা ১৩৯২ সনের প্রথম দিন। পয়লা বৈশাখের ভোরে সর্বপ্রথম যশোরে বের হয়েছিল নববর্ষের এক বর্ণিল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। তখনো তাঁরা জানতেন না, পরের বছরগুলোয় এটা জেলার সীমানা ডিঙিয়ে যাবে এবং বাংলা বর্ষবরণের প্রধান ঐতিহ্য হয়ে উঠবে।

ওই বৈশাখী শোভাযাত্রার অন্যতম উদ্যোক্তা চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামিল শামীম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বন্ধু শিল্পী হিরণ্ময় চন্দ্রসহ আরও কয়েকজন।

শুক্রবার দুপুরে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ সংবাদ সম্মেলন করে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ ঘোষণা এল। তখন শোভাযাত্রার অন্যতম উদ্যোক্তা শামীম তাঁর প্রিয় প্রাঙ্গণ যশোর পৌর পার্কে অবস্থিত চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে শোভাযাত্রার প্রস্তুতির কাজ করছিলেন। বয়সে রুগ্‌ণ হয়ে যাওয়া মাহবুব জামিল শামীম গভীর মনোযোগে রং করছিলেন একটি কুমিরের প্রপসে।

মাহবুব জামিল শামীম জানান, বিধ্বংসী নানা কর্মকাণ্ড থেকে পরিবেশ, প্রতিবেশ আর প্রাণিকুলকে রক্ষায় সচেতনতার বার্তা তুলে ধরা হবে যশোরের এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। যেখানে থাকবে বন, বনের প্রাণী, যেমন—বাঘ, হরিণ, হাতি, ঘোড়া, পাখপাখালি, পাহাড়, নদী ইত্যাদি। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মতো সেজে হইহুল্লোড় করে, নেচে, গেয়ে পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলবেন। শুরুর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে দলমত-নির্বিশেষে যশোরের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন।

তাঁর কাজের মধ্যে জানতে চাওয়া হলো বৈশাখের শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার গল্প। একটু মৃদু হেসে বললেন, ‘একুশের প্রভাতফেরি থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার চিন্তা মাথায় আসে। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রের আন্দোলনে তারুণ্যের রক্তে গড়া একুশের পথ ধরে এসেছে আমাদের ভাষা ও স্বাধীনতা। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার মিলন। এ একুশের প্রভাতফেরিকেই যেন ফেলে আসা সব শিল্প ঐতিহ্যের সম্ভারে সাজিয়ে এ উৎসব রচনা করা হয়েছিল।’

মাহবুব জামিল বলেন, ‘নিগৃহীত ৯৫ ভাগ গ্রাম্য মানুষের মাঝে লালিত দেশজ কৃষ্টি। তাকেই আজ আমরা আদরে নয়ন মেলে দেখছি। শিল্প মর্যাদায় অনুভব করছি। তারই প্রাণবন্ত অথই জলের ধারা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নগরের মাঝ দিয়ে মৃত্তিকা ভেঙে যেন নদী হয়ে আশ্চর্য সুন্দর দেশজ কৃষ্টির রাজসিক উৎসব মঙ্গল শোভাযাত্রা। দলমত-নির্বিশেষে সব পর্যায়ের মানুষ এ আয়োজনে যুক্ত হয়েছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” সত্যিকার অর্থেই মাঙ্গলিক এক বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। বাংলা ১৪০০ বর্ষবরণ উৎসবের ইতিহাস তো সবার জানা। যা যশোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছিল এক নতুন মহাকাব্য।’

১৯৮৮ সালে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য মাহবুব জামিল শামীম ও হিরণ্ময় চন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হন। তাঁদের প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটির চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা বের করেন ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।

এই শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ইতিহাস বলতে গিয়ে মাহবুব জামিল জানান, ১৯৯০ সালের দিকে ঢাকাতে বিভিন্ন সংস্কৃতিমনা মানুষেরা দাবি ওঠাল, বছরের প্রথম দিন মানেই নতুন একটি বছর বা শিশুর জন্ম হলো। জন্মের প্রথম দিনে তাঁর শুভ বা মঙ্গল কামনা করা উচিত। সেই থেকেই আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য়। এ মঙ্গল শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের নানা প্রান্তে। এখন যা বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। শোভাযাত্রা বের হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন স্থান করে নিয়ে বিশ্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও। বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এখন জাতিসংঘের ইউনেসকো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে চারুপীঠ যশোর থেকে।

হঠাৎ নাম পরিবর্তন হওয়াতে কিছু করার নেই বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম শুরু করি, তখনই বলেছিলাম বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন নাম রাখতে পারবে এই শোভাযাত্রার। শোভাযাত্রা উদ্দেশ্য ছিল, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের শোভাযাত্রায় ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি উঠে আসবে। আর সেসব সংস্কৃতি জাতীয় কৃষ্টি-কালচার চর্চার অংশ হবে। আর্ট কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এটার চর্চা হবে। এখন নাম পরিবর্তন হয়েছে; সেটা তো আমার কিছু করার নাই। আমি একজন সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতিকর্মীরা বিবাদে জড়ায় না। তাঁরা চায় বন্ধুত্ব। অনেক বাধা-বিপত্তি পার করেই আমরা শোভাযাত্রা অব্যাহত রেখেছি। যে শোভাযাত্রার শুরু হয়েছিল সেটা তো সবার উৎসব। রাষ্ট্রের উৎসব, আন্তর্জাতিক উৎসব।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামীণ মানুষের মাঝে লালিত দেশজ কৃষ্টি তুলে ধরা হয় এই শোভাযাত্রাতে। এটা আমাদের শিল্প মর্যাদা। এখন যে নামেই হোক না কেন; এটার যে লক্ষ্য ছিল, সেটা থেকে লক্ষ্যচ্যুত না হই আমরা, আমাদের শিল্প, মর্যাদা ও ঐতিহ্য যাতে বন্ধ না হয় সেটাই আমার কাম্য।’

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন