নিজস্ব প্রতিবেদক: থ্যাঙ্কসগিভিং ডে, ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও সাইবার মনডেসহ যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির মৌসুমে পোশাকের বিক্রি বাড়ে। কারণ, এ সময় ক্রেতারা বেশি কেনাকাটা করেন। ফলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রিটেইল ফেডারেশন ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন (এনআরএফ) বার্ষিক জিডিপিতে ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখে। সংস্থাটি বছরের ১ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বরকে ছুটির মৌসুম হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। দেশটিতে প্রতি বছরের ২৩ নভেম্বর থ্যাঙ্কসগিভিং ডে পালিত হয়, এ ছুটির পর প্রথম শুক্রবার ব্ল্যাক ফ্রাইডে এবং তার পরের সোমবার সাইবার মনডে পালিত হয়। আর ক্রিসমাস বা বড়দিন পালিত হয় ২৫ ডিসেম্বর।
এই ছুটির মৌসুমে পণ্য, বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্যের বিক্রি বাড়ে। কারণ এ সময় ত্রেতাদের জন্য বিরাট ছাড় দেয়া হয়, এতে তারা আকৃষ্ট হন। পোশাক ব্যবসায়ীরা এ সময় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে থাকেন, বিশেষ করে মাঝারি ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কেনাকাটায় উৎসাহী করতে এই ছাড় দেয়া হয়।
এনআরএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, এবার ছুটির ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ৩ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৯৫৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৯৬৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ফেডারেশনের সাম্প্রতিক বিক্রির রেকর্ড দিয়ে জানিয়েছে, সবচেয়ে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে পোশাক ও আনুষঙ্গিক ৪৯ শতাংশ, খেলনা ৩১ শতাংশ, উপহার কার্ড ২৫ শতাংশ, বই ও অন্যান্য মাধ্যম ২৩ শতাংশ এবং ২৩ শতাংশ ব্যক্তিগত পণ্য।
২৮ নভেম্বর এক বিবৃতিতে এনআরএফ জানিয়েছে, থ্যাঙ্কসগিভিং ডে থেকে সাইবার মনডে পর্যন্ত পাঁচ দিনের ছুটির সপ্তাহ শেষে রেকর্ড ২০০ দশমিক ৪ মিলিয়ন গ্রাহক কেনাকাটা করেছেন, যা গত বছরের ১৯৬ দশমিক ৭ মিলিয়নের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এই পরিসংখ্যান এনআরএফের ১৮২ মিলিয়ন ক্রেতার প্রাথমিক প্রত্যাশাকে ১৮ মিলিয়নেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে।
এনআরএফের প্রেসিডেন্ট ও সিইও ম্যাথিউ শাই বলেন, ‘থ্যাঙ্কসগিভিং ও সাইবার মনডের মধ্যে পাঁচ দিনের সময়টি বছরের ব্যস্ততম কেনাকাটার দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ সময় ভোক্তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রতিফলন ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক ক্রেতা আমাদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। বড় ও ছোট খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবা নিরাপদ, সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করতে প্রস্তুত ছিল।’ এভাবে বিক্রি বৃদ্ধির পর আশা করা হচ্ছে, আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ওয়ার্ক অর্ডারে বড় ধরনের উত্থান ঘটতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম পোশাক রপ্তানি গন্তব্য এবং চীন ও ভিয়েতনামের পর যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে চাহিদা মন্দা, পুরোনো স্টক জমে যাওয়া ও মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মারাত্মক পরিণতির কারণে উদ্ভূত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রপ্তানি কমেছে।
গত বছর বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা সেখানে ১০ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিও ২২ দশমিক ৮১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে। রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি এখনো ধীর গতিতে চলছে, কারণ ক্রেতাদের চাহিদা এখনো কম এবং আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে চালান বাড়তে পারে। তবে বিগত বছরগুলোর মতো এবারও সাধারণ নির্বাচনের আগে ক্রেতারা আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, আগামী বছরের শুরু থেকে দেশ থেকে রপ্তানিও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
মামলা আতঙ্কে শ্রমিকরা নিরাপত্তা শঙ্কায় মালিকরা
নিজস্ব প্রতিবেদক: সাভারের আশুলিয়া এলাকার হলিউড পোশাক কারখানায় কাজ করেন মো. শান্ত। শ্রমিক আন্দোলনের জেরে কয়েক দিন ধরেই বন্ধ রয়েছে তার কারখানা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা। তবে আয়ের অবলম্বন কারখানাটি এখনো খোলেনি। ১২ নভেম্বর রোববার সকালেও কারখানার সামনে এসে তালা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে এই শ্রমিককে। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধইরা আইসা নোটিশ দেইখা ফিরে গেছি। আমরা কাজের মানুষ ভাই, বইসা থাকতে পারি না, বইসা থাকলে আমার পরিবাররে খাওয়াইবো কে?’ মধ্যবয়সী এই শ্রমিক আরও বলেন, ‘কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে এভাবে বন্ধ রাখলে সমাধান হবে না, হেলপারদের বেতন আমরা মাইনা নিছি, এখন অপারেটরদের বেতনটা একটু সমাধান করলেই হয়।’
তার মতো কয়েক লাখ শ্রমিক এখন এমন হতাশার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাদের কারখানা কবে খুলবে কেউই তা জানে না। যদিও শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় বন্ধ থাকা ১৩০টি কারখানার মধ্যে খুলে দেয়া হয়েছে ৭০টি। তবে সেসব কারখানায় শ্রমিক উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
সাধারণ শ্রমিকরা যখন চিন্তিত তাদের পরিবারের জন্য খাবার জোগাতে তখন নতুন দুশ্চিন্তার নাম অজ্ঞাতনামে মামলা। একাধিক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকার পরও মামলা নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশুলিয়া এলাকার একজন শ্রমিক জানান, যারা ইউনিয়ন করেন তাদের পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকরাও এখন চরম আতঙ্কে রয়েছেন। ‘অনেক শ্রমিক এহন রুমে থাকতেও ভয় পাচ্ছে’ জানিয়ে তিনি বলেন, নিরীহ শ্রমিকদের কোনোভাবেই হয়রানি করা ঠিক হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ আশুলিয়া থানায় ৭-৮টা মামলা হয়েছে, এসব মামলায় আসামিও অজ্ঞাত, এহন কন কেমনে চিন্তা না কইরা থাকুম।’
আশুলিয়া এলাকার শ্রমিক কিসমত মিয়া জানান, এলাকাটিতে এখন এক প্রকার চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ‘প্রায় ফ্যাক্টরি বন্ধ রয়েছে, মালিকরা ১৩ ধারায় বন্ধ কইরা দিছে।’ আন্দোলন হলে মালিকরা কীভাবে কারখানা খুলবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যত লোকসান সব ভাই আমাগো, এহন কারখানা বন্ধ থাকলে এই আইনে কোনো বেতন পামু না, তাতে কেমনে আমগো সংসার চলবে সেই চিন্তা করতাছি।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শ্রমিক জানান, হেলপারদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে মিল নেই অপারেটরদের। এটা নিয়েই অসন্তোষ চলছে। ‘একজন অপারেটর এমনিতেই ১৩-১৪ হাজার টাকা বেতন পায়, এহন কইতেছে হেলপার পাইব সাড়ে ১২ হাজার, তাইলে সেই অনুযায়ী অপারেটরদের বাড়ানো উচিত, হেইডা তো বাড়াইব না। খালি হেলপারদের বেতন বাড়াইয়া একটা আইওয়াশ করতেছে, একটা লাইনে মাত্র দুই-তিনজন হেলপার থাকে।’
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও গতকাল খুলেছে সাভার এলাকার বেশ কিছু কারখানা। আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার জানান, ৭০টি কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় মালিকরা ১১ নভেম্বর শনিবার ১৩০টি কারখানা বন্ধ করেছিলেন বলেও জানান তিনি। বলেন, ‘যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বন্ধ কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি বিজিবিসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন।’
জামগড়া, বেরন, ছয়তলা ও নরসিংহপুর এলাকায় কারখানাগুলোতে ছিল বন্ধের নোটিশ। এ সময় কর্মস্থলের সামনে এসে অনেক শ্রমিককে বিষণ্ন মনে ফেরত যেতে দেখা যায়। কারখানার সামনে নোটিশে লেখা রয়েছে ‘মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বহিরাগত পোশাকশ্রমিকদের বে-আইনিভাবে কারখানার ভেতর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে কারখানা ভাঙচুর ও কারখানার কাজ বন্ধ রাখাসহ কর্মস্থলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় কারখানার উৎপাদন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এমতাবস্থায় কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা মোতাবেক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলো।’
সাভার প্রতিনিধি ইমতিয়াজ-উল-ইসলাম জানান, সাভার কিংবা আশুলিয়া এলাকায় তেমন কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত আশুলিয়া থানায় ১২টি মামলা হয়েছে বলে তিনি জানান। মামলায় প্রায় তিন হাজার জনকে আসামি করার পাশাপাশি গেপ্তার হয়েছে মোট পাঁচজন। আর এ জন্যই শ্রমিকরা আতঙ্কে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে গাজীপুরের তুসুকা গ্রুপের কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা করেছে কর্তৃপক্ষ। ১১ নভেম্বর শনিবার রাতে কোনাবাড়ী থানায় ২৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে এই মামলায়। কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ এনে মামলাটি দায়ের করেন তুসুকা গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ। গতকাল দুপুরে মামলার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম আশরাফ উদ্দিন।
কোনাবাড়ী এলাকার অধিকাংশ কারখানা বন্ধ থাকলেও সকাল থেকে গাজীপুরের কোথাও শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। কয়েক দিনের তুলনায় পরিবেশও রয়েছে বেশ শান্ত। জানা গেছে, গতকাল সদর উপজেলার গোল্ডেন রিফিউ নামক একটি কারখানায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বসে থাকলে বেলা ১১টার দিকে ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তবে শ্রমিকরা কোনো হট্টগোল না করেই কারখানা থেকে বের হয়ে যান। গাজীপুরেও কঠোর নজরদারি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
এদিকে আশুলিয়া ছাড়া সাভারের অন্যান্য এলাকায় গতকাল খোলা হয়েছে বেশির ভাগ কারখানা। কালিয়াকৈর, নন্দনপার্ক এলাকার কারখানাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ওই এলাকার ইন্টারস্টপ অ্যাপারেল কারখানার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের মালিকরা আন্দোলন নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন, তবে কোনোভাবেই যাতে কোনো হট্টগোল না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রয়েছে আমাদের।’ তিনি আরও জানান, দুই দিন বন্ধ থাকার পর এখন পুরোদমে চলছে তাদের উৎপাদন। ওই এলাকার ৫০টির অধিক কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে উৎপাদন চলছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত আরেক শ্রমিক মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার মধ্যরাতে মারা যান তিনি। নিহত শ্রমিকের নাম মো. জালাল উদ্দিন, তার বয়স ৪০ বছর। জানা গেছে, গত বুধবার সকালে কোনাবাড়ী এলাকায় বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পোশাকশ্রমিক আঞ্জুয়ারা খাতুন গুরুতর আহত হন। পরে তিনিও মারা যান।
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ পোশাকশ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা নিয়ে যা হচ্ছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। মালিকদের উচিত সব পক্ষের শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে সমাধান বের করা। তবে তা না করে পুলিশ দিয়ে ধরপাকড় করে সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মত দেন তিনি এবং বলেন, এখন পর্যন্ত চারজন শ্রমিক অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মৃত্যুবরণ করেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা শুধু ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনার দাবি করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘোষণা দেয়ার ১৪ দিন পর্যন্ত টাকার অঙ্ক পরিবর্তন করার বিধান রয়েছে। আমরা এখনো আশাবাদী সরকার শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হলেও মজুরি বাড়াবেন’।
এখন পর্যন্ত ২৫ ফ্যাক্টরিতে ভাংচুর, ১৩০টি বন্ধ : বিজিএমইএ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত ২৫টি ফ্যাক্টরিতে ভাঙচুরের ঘটনা এবং ১৩০টি ফ্যাক্টরি বন্ধ আছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। তবে বেতন বৈষম্য নাকি হরতাল-অবরোধের কারণে এমন হচ্ছে, সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি সংগঠনটি।
১২ নভেম্বর রোববার দুপুরের উত্তরার বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান।
ফারুক হাসান বলেন, আমরা যখন বৈশ্বিক ও আর্থিক চাপের মধ্যে থেকেই টিকে থাকার সংগ্রাম করছি, ঠিক তখন শিল্পকে নিয়ে শুরু হয়েছে নানা অপতৎপরতা। বিশেষ করে আমাদের শান্ত শ্রমিক গোষ্ঠীকে উসকানি দিয়ে অশান্ত করা হচ্ছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে সে লক্ষ্য করছি, মজুরি বৃদ্ধির পরও আন্দোলনের নামে বিভিন্ন জায়গায় কারখানা ভাঙচুর করা হচ্ছে। মজুরি ঘোষণার পর থেকে বেশ কিছু কারখানায় অজ্ঞাতপরিচয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক অযৌক্তিক দাবিতে বেআইনিভাবে কর্মবিরতি পালন করে কর্মকর্তাদের মারধর করেছে, কারখানার ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো এ ব্যাপারে আমাদেরকে ভিডিও ফুটেজ দিয়েছে, মামলার কপিও আমাদেরকে দিয়েছে।
তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশুলিয়া, কাশিমপুর, মিরপুর ও কোনাবাড়ি এলাকার প্রায় ১৩০টি পোশাক কারখানা কারখানা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং কারখানার সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে কারখানার সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেসব কারখানা শ্রমিকরা কাজ করতে আগ্রহী, সেগুলোতে কাজ চলছে। তাদের কাজ চলমান থাকবে। দুঃখের বিষয় যে, যখন মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড কাজ করছিল, তখনও কারখানা ভাঙচুর, কারখানায় অগ্নি-সংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, উদ্যোক্তারা কিন্তু অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই অনেক ঝুঁকি নিয়ে এই শিল্প পরিচালনা করছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। এমন অনেক উদ্যোক্তা আছেন, যারা লোকসান দিয়েও কারখানা সচল রেখেছেন, শুধুমাত্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য। শ্রমিকদেরকে বেতন দিচ্ছেন ঋণের বোঝা মাথায় রেখে।
তিনি বলেন, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৮৮৫টি পোশাক কারখানা বিজিএমইএ এর সদস্যপদ গ্রহণ করলেও কালের পরিক্রমায় ৩ হাজার ৯৬৪টি সদস্য কারখানা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ২ হাজার ৯২১টি সদস্য কারখানার মধ্যে ২ হাজার ৩৩৯টি কারখানা বিজিএমইএ-তে তাদের সদস্যপদ নবায়ন করেছে। এই ২ হাজার ৩৩৯টি সদস্য কারখানার মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৬০০টি সদস্য কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে সরাসরি অর্ডার এনে কাজ করছে। অর্থাৎ আমাদের এ মুহূর্তে সরাসরি রপ্তানিকারক কারখানার সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৬০০টি।
তিনি আরও বলেন, সদস্যপদ নবায়ন করা ২ হাজার ৩৩৯টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৬০০ কারখানা বাদে বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা বিভিন্ন ব্যাংক দেনা ও দায়ের কারণে সরাসরি ব্যাক-টু-ব্যাক খুলতে পারছে না। ফলে তারা ক্রেতাদের কাছ থেকে সরাসরি অর্ডার নিতে পারছে না। এই সদস্য কারখানাগুলো মূলত সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। অবশিষ্ট কারখানাগুলো ব্যাংক দেনা ও আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তারা আগামীতে দেনা পরিশোধ করে ব্যবসায় ফিরে আসতে ইচ্ছুক।
এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, শিল্পের উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্ধ কারখানার সংখ্যাও বাড়ছে। শুধু করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ সালে বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা ৩১৭টি এবং পরবর্তীতে অন্যান্য কারণে প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার কারণে ২৬০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, বলেও জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
শিল্প-কারখানার কর্মশক্তির সুরক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা জরুরি
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের তৈরি পোশাক খাতের কর্মশক্তির স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে টেকসই করতে বিভিন্ন সংস্থার পারস্পরিক সহযোগিতা খুবই জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশের পরিচালক তুমো পুতিয়েনাইন।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘কর্মশক্তির স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ইন্টিগ্রাল গ্লোবাল, বিজিএমইএ ও জেসিএম ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়াত অ্যাডুকেশন এ গোলবৈঠকের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি, বিজিএমইএ’র সভাপতি ও জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হাসান, জেসিএম ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও কর্মসূচী পরিচালক ড. লিলিয়ান লু, কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রামেশ সিং, আইএলও’র প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা সৈয়দ সাদ হোসেন জিলানী, আমান গ্রুপ অব কোম্পানিজ-এর ভাইস চেয়ারম্যান তাহসিন আমান, কার্লাস অ্যান্ড স্টিচ লি.-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাঈম ইমরান সেলিম, ড্রেসম্যান গ্রুপের পরিচালক মাসেদ আর আব্দুল্লাহ, অনন্ত গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ ইসতিয়াক আলম, এইচ অ্যান্ড এম-এর রিজিওনাল কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমান, বিজিএমইএ’র পরিচালক আসিফ ইব্রাহিম, এইচ অ্যান্ড এম-এর রিজিওনাল কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমান, ইন্টেগ্রাল গ্লোবাল হেলথ-এর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জেনা বুটল্ফ ইউনিভার্সিটি অব পেনিনসিলভানিয়া-এর ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নাহরীন আহমেদ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন আয়াত অ্যাডুকেশন-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নুসরাত আমান ও ইন্টেগ্রাল গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক নাবিল আহমেদ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি বলেন, কর্মীদের মানুষিক ও শারীরিক সুস্থতায় গুরুত্বারোপের পাশাপাশি উপযুক্ত ডাটাবেজ তৈরি করে তৈরি পোশাক খাতকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসা খুবই জরুরি। এটা শিল্প-কারখানার পরিবেশ উন্নত করা ও কর্মীদের উপযুক্ত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইএলও-এর বাংলাদেশের পরিচালক তুমো পুতিয়েনাইন বলেন, পোশাক খাতের জনবলের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে আরও গণতান্ত্রিক করতে হবে এবং স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে তা কমাতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ভ্যাকসিন প্রদান, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসাযোগ্য। আমরাও (আইএলও) কর্মীদের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য এসব উদ্যোগের পরিমাপযোগ্যতা ও অনুকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করি।
বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান তার বক্তব্যে আইএলও-এর প্রতিনিধির বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতের শিল্প কলকারখানায় গত এক দশকে আমরা বড় পরিবর্তন এনেছি। বিশ্বের অন্যতম গ্রিন ফ্যাক্টরির পাশাপাশি শতাধিক উন্নতমানের কারখানাও আমাদের দেশে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইন্টিগ্রাল গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা নাবিল আহমেদ অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আয়াত অ্যাডুকেশন ও আইজির বিস্তারিত কার্যক্রম তুলে ধরে তিনি বলেন, ৩টি টেক্সটাইল ও ৬টি তৈরি পোশাক কারখানার প্রায় ৩০ হাজার কর্মীকে নিয়ে এ দুই প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরির কারণে কারখানার কর্মীদের মধ্যে মাস্ক পড়ার প্রবণতা ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যথাযথভাবে হাত ধোয়ার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে।
আয়াত অ্যাডুকেশন-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নুসরাত আমান বলেন, পোশাক খাতের কর্মীদের প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য শুধু বাইরের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকলে হবে না। আমাদের সবার পারস্পরিক সহযোগিতায় কর্মীদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে। আয়াত অ্যাডুকেশন বিজিএমইএ ও আরএমজি কর্মীদের জন্য ডিজিটাল টুলকিট প্রণয়নের কাজ করছে, যেখানে তাদের স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও প্রতিরক্ষামুলক সেবার তথ্য থাকবে।
জেসিএম (জন সি মার্টিন) ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও কর্মসূচী পরিচালক ড.
লিলিয়ান লু বলেন, পোশাক কারখানায় পরিবর্তন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে
কমিউনিটি ও স্টেকহোল্ডার ইচ্ছাশক্তি এবং কর্মীদের সহায়তা খুবই
গুরুত্বপূর্ণ।





