নিজস্ব প্রতিবেদক: সাভারের আশুলিয়া এলাকার হলিউড পোশাক কারখানায় কাজ করেন মো. শান্ত। শ্রমিক আন্দোলনের জেরে কয়েক দিন ধরেই বন্ধ রয়েছে তার কারখানা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা। তবে আয়ের অবলম্বন কারখানাটি এখনো খোলেনি। ১২ নভেম্বর রোববার সকালেও কারখানার সামনে এসে তালা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে এই শ্রমিককে। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধইরা আইসা নোটিশ দেইখা ফিরে গেছি। আমরা কাজের মানুষ ভাই, বইসা থাকতে পারি না, বইসা থাকলে আমার পরিবাররে খাওয়াইবো কে?’ মধ্যবয়সী এই শ্রমিক আরও বলেন, ‘কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে এভাবে বন্ধ রাখলে সমাধান হবে না, হেলপারদের বেতন আমরা মাইনা নিছি, এখন অপারেটরদের বেতনটা একটু সমাধান করলেই হয়।’
তার মতো কয়েক লাখ শ্রমিক এখন এমন হতাশার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাদের কারখানা কবে খুলবে কেউই তা জানে না। যদিও শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় বন্ধ থাকা ১৩০টি কারখানার মধ্যে খুলে দেয়া হয়েছে ৭০টি। তবে সেসব কারখানায় শ্রমিক উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
সাধারণ শ্রমিকরা যখন চিন্তিত তাদের পরিবারের জন্য খাবার জোগাতে তখন নতুন দুশ্চিন্তার নাম অজ্ঞাতনামে মামলা। একাধিক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকার পরও মামলা নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশুলিয়া এলাকার একজন শ্রমিক জানান, যারা ইউনিয়ন করেন তাদের পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকরাও এখন চরম আতঙ্কে রয়েছেন। ‘অনেক শ্রমিক এহন রুমে থাকতেও ভয় পাচ্ছে’ জানিয়ে তিনি বলেন, নিরীহ শ্রমিকদের কোনোভাবেই হয়রানি করা ঠিক হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ আশুলিয়া থানায় ৭-৮টা মামলা হয়েছে, এসব মামলায় আসামিও অজ্ঞাত, এহন কন কেমনে চিন্তা না কইরা থাকুম।’
আশুলিয়া এলাকার শ্রমিক কিসমত মিয়া জানান, এলাকাটিতে এখন এক প্রকার চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ‘প্রায় ফ্যাক্টরি বন্ধ রয়েছে, মালিকরা ১৩ ধারায় বন্ধ কইরা দিছে।’ আন্দোলন হলে মালিকরা কীভাবে কারখানা খুলবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যত লোকসান সব ভাই আমাগো, এহন কারখানা বন্ধ থাকলে এই আইনে কোনো বেতন পামু না, তাতে কেমনে আমগো সংসার চলবে সেই চিন্তা করতাছি।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শ্রমিক জানান, হেলপারদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে মিল নেই অপারেটরদের। এটা নিয়েই অসন্তোষ চলছে। ‘একজন অপারেটর এমনিতেই ১৩-১৪ হাজার টাকা বেতন পায়, এহন কইতেছে হেলপার পাইব সাড়ে ১২ হাজার, তাইলে সেই অনুযায়ী অপারেটরদের বাড়ানো উচিত, হেইডা তো বাড়াইব না। খালি হেলপারদের বেতন বাড়াইয়া একটা আইওয়াশ করতেছে, একটা লাইনে মাত্র দুই-তিনজন হেলপার থাকে।’
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও গতকাল খুলেছে সাভার এলাকার বেশ কিছু কারখানা। আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার জানান, ৭০টি কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় মালিকরা ১১ নভেম্বর শনিবার ১৩০টি কারখানা বন্ধ করেছিলেন বলেও জানান তিনি। বলেন, ‘যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বন্ধ কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি বিজিবিসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন।’
জামগড়া, বেরন, ছয়তলা ও নরসিংহপুর এলাকায় কারখানাগুলোতে ছিল বন্ধের নোটিশ। এ সময় কর্মস্থলের সামনে এসে অনেক শ্রমিককে বিষণ্ন মনে ফেরত যেতে দেখা যায়। কারখানার সামনে নোটিশে লেখা রয়েছে ‘মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বহিরাগত পোশাকশ্রমিকদের বে-আইনিভাবে কারখানার ভেতর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে কারখানা ভাঙচুর ও কারখানার কাজ বন্ধ রাখাসহ কর্মস্থলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় কারখানার উৎপাদন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এমতাবস্থায় কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা মোতাবেক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলো।’
সাভার প্রতিনিধি ইমতিয়াজ-উল-ইসলাম জানান, সাভার কিংবা আশুলিয়া এলাকায় তেমন কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত আশুলিয়া থানায় ১২টি মামলা হয়েছে বলে তিনি জানান। মামলায় প্রায় তিন হাজার জনকে আসামি করার পাশাপাশি গেপ্তার হয়েছে মোট পাঁচজন। আর এ জন্যই শ্রমিকরা আতঙ্কে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে গাজীপুরের তুসুকা গ্রুপের কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা করেছে কর্তৃপক্ষ। ১১ নভেম্বর শনিবার রাতে কোনাবাড়ী থানায় ২৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে এই মামলায়। কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ এনে মামলাটি দায়ের করেন তুসুকা গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ। গতকাল দুপুরে মামলার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম আশরাফ উদ্দিন।
কোনাবাড়ী এলাকার অধিকাংশ কারখানা বন্ধ থাকলেও সকাল থেকে গাজীপুরের কোথাও শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। কয়েক দিনের তুলনায় পরিবেশও রয়েছে বেশ শান্ত। জানা গেছে, গতকাল সদর উপজেলার গোল্ডেন রিফিউ নামক একটি কারখানায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বসে থাকলে বেলা ১১টার দিকে ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তবে শ্রমিকরা কোনো হট্টগোল না করেই কারখানা থেকে বের হয়ে যান। গাজীপুরেও কঠোর নজরদারি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
এদিকে আশুলিয়া ছাড়া সাভারের অন্যান্য এলাকায় গতকাল খোলা হয়েছে বেশির ভাগ কারখানা। কালিয়াকৈর, নন্দনপার্ক এলাকার কারখানাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ওই এলাকার ইন্টারস্টপ অ্যাপারেল কারখানার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের মালিকরা আন্দোলন নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন, তবে কোনোভাবেই যাতে কোনো হট্টগোল না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রয়েছে আমাদের।’ তিনি আরও জানান, দুই দিন বন্ধ থাকার পর এখন পুরোদমে চলছে তাদের উৎপাদন। ওই এলাকার ৫০টির অধিক কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে উৎপাদন চলছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত আরেক শ্রমিক মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার মধ্যরাতে মারা যান তিনি। নিহত শ্রমিকের নাম মো. জালাল উদ্দিন, তার বয়স ৪০ বছর। জানা গেছে, গত বুধবার সকালে কোনাবাড়ী এলাকায় বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পোশাকশ্রমিক আঞ্জুয়ারা খাতুন গুরুতর আহত হন। পরে তিনিও মারা যান।
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ পোশাকশ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা নিয়ে যা হচ্ছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। মালিকদের উচিত সব পক্ষের শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে সমাধান বের করা। তবে তা না করে পুলিশ দিয়ে ধরপাকড় করে সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মত দেন তিনি এবং বলেন, এখন পর্যন্ত চারজন শ্রমিক অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মৃত্যুবরণ করেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা শুধু ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনার দাবি করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘোষণা দেয়ার ১৪ দিন পর্যন্ত টাকার অঙ্ক পরিবর্তন করার বিধান রয়েছে। আমরা এখনো আশাবাদী সরকার শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হলেও মজুরি বাড়াবেন’।
মামলা আতঙ্কে শ্রমিকরা নিরাপত্তা শঙ্কায় মালিকরা
এই সময়ে
সোমবার, নভেম্বর ১৩, ২০২৩

