নিজস্ব প্রতিবেদক: কম দামে কিনে শত শত মণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত মার্চ মাস থেকে সংরক্ষিত ওই আলু এখন তাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। লাভের আশায় রাখা আলু বিক্রি করতে গিয়ে এখন লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। হিমাগারে সংরক্ষণের সময় ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু বাজারে দাম বাড়ার কোনো লক্ষণ নেই। এতে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন সংরক্ষণকারীরা।
জানা গেছে, গত বছর দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছিল চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি। উৎপাদন বেশি হওয়ায় তখন আলুর দাম ছিল একেবারেই কম। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে দাম বাড়বে- এ আশায় আলু কম দামে কিনে হিমাগারে রাখেন। কিন্তু এ বছর বাজারে দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। অনেকেই জানাচ্ছেন, এবার আলুর দাম এতটাই কম যে, সংরক্ষিত আলু বেচে মূলধনও উঠবে না।
ঈশ্বরদীতে রয়েছে ‘আলহাজ আহম্মদ আলী হিমাগার’। যার ধারণক্ষমতা ৬৫ হাজার বস্তা বা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টন। ঈশ্বরদীতে বাণিজ্যিকভাবে আলু উৎপাদন কম হলেও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আলু এনে সংরক্ষণ করেন।
হিমাগারটি ঘুরে দেখা যায়, হিমাগার ভর্তি হাজার হাজার বস্তা আলু। শ্রমিকরা ব্যস্ত বাছাই ও স্থানান্তরের কাজে। একদল নারী শ্রমিক আলু পরিষ্কার করছেন। হিমাগারের মালিক রুহুল ইসলাম মন্টু বলেন, ‘আমাদের হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৬৫ হাজার বস্তা। এবার রাখা হয়েছে ৬০ হাজার বস্তা। প্রতি বছর এই সময়ের মধ্যে চার ভাগের তিন ভাগ আলু বেচা হয়ে যায়। কিন্তু এবার অর্ধেকও হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘৬০ হাজার বস্তার মধ্যে এখনো ৪২ হাজার বস্তা আলু হিমাগারে রয়েছে। মাত্র ১৮ হাজার বস্তা বের হয়েছে। এবারের মতো এমন পরিস্থিতিতে আমরা কখনো পড়িনি। কেউই আগে লোকসানে পড়েনি। কিন্তু এবার অনেকে আলু বেচে বিনিয়োগের অর্ধেক টাকাও ফিরে পাবেন না।’
রুহুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ঈশ্বরদীতে আলু উৎপাদন কম হলেও ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী ও বাঘা এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখানে আলু সংরক্ষণ করে থাকেন। এখন তারা সরকার থেকে কোনো সুসংবাদের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিছুদিন আগে সরকার হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করে পরিপত্র জারি করেছিল। কিন্তু বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।’
স্থানীয় সবজি ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, তিনি চার গাড়ি আলু কিনে ঈশ্বরদীর হিমাগারে রেখেছিলেন। আশা ছিল, ‘গতবারের মতো ৮০ টাকা না হলেও অন্তত ৪০ টাকা কেজি পাওয়া যাবে।’ কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। গত সপ্তাহে তাকে লোকসানে এক গাড়ি আলু বেচতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দাম না বাড়লে বাকি আলুও লোকসানে বেচতে হবে। এতে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।’
হিমাগার মালিকদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ের (নভেম্বর) পরে আলু রাখা সম্ভব হবে না। তখন সবাই কম দামে বেচতে বাধ্য হবেন। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হিমাগার মালিকরাও বিপাকে পড়বেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে চাহিদার ঘাটতি এবং রপ্তানির অনিশ্চয়তার কারণে আলুর দাম স্থিতিশীল হতে পারছে না। সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর না হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, আলু উৎপাদনে পরিশ্রম ও খরচ অনেক বেশি। তাই বিক্রির সময় সঠিক দাম না পেলে চাষে উৎসাহ কমে যায়। তাদের দাবি, সরকার যেন রপ্তানি বাড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করে।
.jpg)
