ইমাম গাজ্জালী: যে সমাজে গুণী মানুষের সম্মান নেই, সেখানে গুণী মানুষ জন্ম নিতে পারে না। যদিওবা কোনো গুণী ব্যক্তির জন্ম হয়, তাঁকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। এটা অনেকটা দুর্ঘটনার মতো; মুজিবর রহমান বিশ্বাসের জন্মও ছিল তেমনই এক ঘটনা। গুণীর যথাযথ মূল্যায়নের পরিবর্তে তাঁকে সীমাহীন লাঞ্ছনা, অপমান ও নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছিল। গ্রামীণ সমাজ তাঁকে গ্রহণ করতে পারেনি, দিতে পারেনি নূন্যতম মর্যাদা; মূল্যায়ন তো অনেক দূরের কথা। মুজিবর রহমান বিশ্বাস নিজের জীবন দিয়ে সেটিই প্রমাণ করে গেছেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে গুণী মানুষের কদর নেই। সেখানকার মানুষ অর্থ, বিত্ত ও প্রতিপত্তির কাছে মাথা নত করে। সেই অর্থ-বিত্ত বা ক্ষমতা অন্যায় পথে অর্জিত হলেও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। ক্ষমতা জনবিরোধী হলেও তার তোষামোদ করতে তারা ভুল করে না। এই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে মুজিবর রহমান বিশ্বাস ‘পাগল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মুজিবর রহমান বিশ্বাস ছিলেন একজন পন্ডিত সাহিত্য সাধক, বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক সদস্য, লেখক, গণবুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক। জ্ঞানতপস্বী এই মানুষটি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমার প্রত্যন্ত কামারখন্দ থানার জামতৈল ধোপাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।
বিদ্যালয়টির সৌভাগ্য যে, এমন একজন ব্যক্তিত্ব সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। একই সঙ্গে কামারখন্দবাসীর জন্য এটি গর্বের বিষয় যে, এমন একজন গুণী মানুষ তাদের এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি তাদের দুর্ভাগ্য যে, সেই গর্বের কথা তারা ভুলে গেছেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় মুজিবর রহমান বিশ্বাস কারাগারে বন্দি ছিলেন। একই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানও সেই জেলে বন্দি ছিলেন। সেখানে তাঁদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে ‘জেল মিতা’ বলে ডাকতেন। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন মুজিবর রহমান বিশ্বাস। আমাদের জানামতে, তিনি ৫৪টি বই লিখেছেন।
তিনি অল্প আহার করতেন। বিয়ে করলেও তাঁর সংসার টেকেনি। তাঁর পোশাক-আশাক খুব একটা পরিচ্ছন্ন ছিল না; পরতেন পাঞ্জাবি ও পায়জামা। শিক্ষকতার বেতনের টাকায় বই কিনতেন, পড়তেন আর লিখতেন। তৃণমূলের মানুষের ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা, তুচ্ছ অহংকার ও সংকীর্ণ মানসিকতাকে তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
‘শিক্ষার সমস্যা’ নামে লেখা একটি বইয়ে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সমাজের মাতব্বর কারা? টাউট, বাটপার, চোর-গুণ্ডা আর নিচু মনের সংকীর্ণ মানুষদেরই এখন রাজত্ব।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘এই ছন্নছাড়া অভিশপ্ত জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে মোড়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছি? আমি দেখছি, মানুষ প্রতিনিয়ত তার বিবেক ও সত্তাকে হারাচ্ছে। সামান্যতম উদারতাকেও গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। এই সময়টা হলো উঠতি মধ্যবিত্তের অহেতুক অহংকারের যুগ; বর্বর, নিচু ও সংকীর্ণমনা শিক্ষকদের যুগ। হায়রে মনুষ্যত্বহীন শিক্ষক ও ছাত্র! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন উচ্ছৃঙ্খল খারাপ ছাত্র আর অমানুষ লোভী শিক্ষকদের জমিদারিতে পরিণত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্ররা আজকাল শিক্ষকের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক রাখতে চায় না। তারা উচ্ছৃঙ্খল ও বেয়াদব হয়েছে—এসবই মানলাম। কিন্তু শিক্ষকদের ইশারা না থাকলে ছাত্র কি শিক্ষককে মারধর করতে পারে? শিক্ষক যদি লোভী, সংকীর্ণ, নিচু মনের ও ছোটখাটো দাম্ভিক মানুষ হন, তবে তাঁকে দিয়ে কোনো আশা নেই।’
একই বইয়ের অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘শিক্ষকরাই ছাত্রদের ব্যক্তিগতভাবে পড়ানো (প্রাইভেট) এবং পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের মধ্যে আটকে রেখেছেন। সমাজ পরিবর্তন ও শিক্ষার মানবিক মূল্যবোধের ধার তথাকথিত শিক্ষকরা ধারেন না। অনেক শিক্ষক গ্রাম্য দলাদলি ও টাউটগিরিতে লিপ্ত। পরীক্ষায় নকল ও প্রাইভেট পড়ানো—এই দুটি অভ্যাসকে তথাকথিত শিক্ষকরাই টিকিয়ে রেখেছেন।’
চরম ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘অযোগ্যকে ভালো কিছু দেওয়া যে ভুল, সেটা জীবনের বিনিময়ে বুঝতে পেরেছি। আমাদের নিজেদের দোষ তাহলে কী? আমাদের কোনো সাংসারিক জ্ঞান ছিল না। মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসা যে সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়, বরং ভুল—সেটাও বুঝতে পারিনি। আমার আরও একটি দোষ হলো, কোনো এক জায়গায় গেলে কতদিন থাকতে পারব সেটা না জেনেই মনে করেছি, এখানেই হয়তো দীর্ঘদিনের জন্য আশ্রয় হবে। শিক্ষকতা জীবনে কোনোভাবেই বালকের মন সংকীর্ণ হয়ে উঠুক, সেটা মেনে নিতে পারিনি। আর পারিনি বলেই এত চেষ্টা ও লড়াই করেছি।’
তাহলে কি কোনো ভালো শিক্ষকই নেই? এর জবাবে তিনি নিজের একজন মহান শিক্ষকের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘আমার পরম শ্রদ্ধেয় মণীন্দ্র কুমার ঘোষের কথা বলছি। তিনি ছিলেন মহান গুরু ও পথপ্রদর্শক। তাঁর কাছে শিক্ষা পেয়েই আমরা পৃথিবীর পথে ও জীবনের পথে হাঁটতে শিখেছি। তিনিই তো আমাদের অনেকের শিক্ষা ও দীক্ষাদাতা ছিলেন।’
উল্লেখ্য, মণীন্দ্র ঘোষের ছেলে বিখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ। মণীন্দ্র ঘোষ ছিলেন ঈশ্বরদীর পাকশীর চন্দ্রপ্রভা স্কুলের শিক্ষক।
৫ মে এই মহান শিক্ষক মুজিবর রহমান বিশ্বাসের ১০১তম জন্মদিন। এই দিনে তাঁর প্রতি রইল অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।
লেখক: সাংবাদিক
