জ্বালানি লোডিংয়ে প্রস্তুত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কার মধ্যেই দেশের জ্বালানি খাতে বড় অর্জনের পথে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কেন্দ্রটি ‘কমিশনিং লাইসেন্স’ বা পরীক্ষামূলক পরিচালনার অনুমতি পাওয়ায় এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে শেষ ধাপে রয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম ভরার কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি জ্বালানি কাঠামো স্থাপন করা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী জুলাই বা আগস্টের মধ্যে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষমতা অনেক বেশি। মাত্র ১ কেজি ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তা উৎপাদন করতে প্রায় ২৪ লাখ কেজি কয়লার প্রয়োজন হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিং কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মেগা প্রকল্পটি ২০১৭ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সহযোগিতায় শুরু হয়। পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত এই কেন্দ্রে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি চুল্লি রয়েছে। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকে থাকতে পারবে।

সম্প্রতি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে চুল্লিটি সক্রিয় হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করেছে। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করবে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামা করলেও পারমাণবিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ সাধারণত স্থিতিশীল থাকে। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এটি সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা খুবই জরুরি। তিনি কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম মনে করেন, মানুষের আস্থা বাড়াতে নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে আরও সচেতনতা দরকার। পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। স্বাগত বক্তব্য দেবেন মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রসি এবং রোসাটমের প্রধান নির্বাহী আলেক্সি লিখাচভসহ দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন।

সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের পুরো কারিগরি নিয়ন্ত্রণ দেশীয় প্রকৌশলীদের হাতে চলে আসবে। নির্মাণ ব্যয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও রূপপুর প্রকল্পকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন