শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির দাবি

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে সমন্বিত নীতিরও কোনো বিকল্প নেই।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সমৃদ্ধি-২০৫০’ শীর্ষক সম্মেলনে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নীতিগত সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে এসব কথা বলেন।

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আয়োজক কমিটির সহ-আহ্বায়ক এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন আলোচনা দলের সমন্বয়ক ড. কাজী খলীকুজ্জামান।

বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরে বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটার্নাল ডিবেট (বিডব্লিউজিইডি), ক্লাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ আর্থ সোসাইটির সঙ্গে যৌথভাবে আরও ৯টি সংগঠন এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। সরকার এজন্য একটি পরিকল্পনা করেছে। সেই পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের কথা বলছে। প্রযুক্তির বিকাশের কারণে এখন আর বিষয়টিকে উচ্চাভিলাসী মনে করা হচ্ছে না।’

সম্মেলনে বলা হয়, ‘এখন প্রতি ওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্যানেলের দাম নেমে এসেছে ২৩ সেন্টে। এর আগে ২০০৮ সালের দিকেও এটি ছিল ১২ থেকে ১৩ ডলার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদেন সহজ এবং ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ায় সারাবিশ্বই নবায়নযোগ্য জ্বালনিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সারা বিশ্বে গত এক বছরে যত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে তার ৮০ ভাগই নবায়যোগ্য জ্বালানির।’

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কেন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করব তা সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধ, কর্মসংস্থান, জ্বালানি সাশ্রয় কতটা হচ্ছে বিষয়গুলো আমাদের চিন্তা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয় আর আমরা যদি পরিবেশ দূষণ করি ৮ শতাংশ, তাহলে আমাদের জিডিপির ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে। আমাদের এমন উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে হবে যা টেকসই হবে।’

বিদ্যুৎ জ্বালানির সমন্বিত মাষ্টার প্লান প্রণয়নের সমালোচনা করে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এই কাজ করতে গিয়ে জাইকা বা বিদ্যুৎ বিভাগ পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরির্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসেনি।’

এককভাবে এ ধরনের পরিকল্পনা করাটা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। এই পরিকল্পনাকে অবশ্যই মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে বলে মন্তব্য করেন সাবের হোসেন।

তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এখন শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি কার্যকর করা সম্ভব, যা এক সময় অসম্ভব এবং ব্যয়বহুল বলে মনে করা হত। তাই এখন জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন এবং কতটুকু জ্বালানি নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে আসা উচিত তাও আলোচনায় আসতে হবে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয় এবং ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে যেতে একটি রোডম্যাপ ঠিক করা জরুরি।’

হাসানুল হক ইনু আরও বলেন, ‘এর বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিকদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। প্রযুক্তিগত সীমিত সামর্থ্য, সমন্বয়ের অভাব এবং গ্যাস মজুদের ঘাটতির মত চ্যালেঞ্জগুলি কাটিয়ে ওঠা জরুরি।’

জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত প্রকল্পে ৫-৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে মনে করিয়ে দিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ বাংলাদেশের জনগণের জীবন বাঁচাতে জলবায়ু অভিযোজনে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদার বেশিরভাগই জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে মেটানো হয়। এরমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ ৩ শতাংশের মতো। এটিকে ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব তা সবার আগে চিন্তা করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি আরও বাস্তববাদী হওয়ার আহ্বান জানান।’

সম্মেলনে ক্লাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান তানভীর শাকিল জয় বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সারা বিশ্বের মতো আমরাও জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিয়ে চিন্তিত। সরকার ইতেমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে কাজ শুরু করেছে।’

এটিকে আরও গতিশীল করার আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন ব্রাইট গ্রিন ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন দীপল চন্দ্র বড়ুয়া, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী শরীফ জামিল এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন