![]() |
| সাড়ে তিন বছরেও নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে।ছবি: সংগৃহিত |
নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের নতুন ভবনটি না হওয়ার জন্য ঠিকাদার মীর আমিরুল ইসলামকে দুষছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমিরুল নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এবং নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) আসনের সাংসদ শফিকুল ইসলামের দুলাভাই। মূলত মীর হাবিবুল আলম এবং মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড যৌথভাবে হাসপাতাল ভবন নির্মাণের কাজটি পেয়েছে। তাদের হয়ে কাজটি করছেন আমিরুল।
গণপূর্ত বিভাগ নাটোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের দুটি কমিটি সদর হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণে দেরির বিষয়টি তদন্ত করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেরির জন্য ঠিকাদারকে দায়ী করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, পদস্থ কর্মকর্তারা ঠিকাদারকে আর দেরি না করার জন্য সতর্ক করেছেন। কিন্তু তাতেও কাজের আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না।
নির্মাণকাজে যেখানে প্রতিদিন অন্তত ৩০০ শ্রমিক কাজ করার কথা, সেখানে কাজ করছেন ৫০ থেকে ৬০ জন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মীর আমিরুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের জমি বুঝিয়ে দিতেই প্রায় এক বছর দেরি করেছে। পরে কাজের বিল ও কাজের নকশা সরবরাহ করতেও গড়িমসি করেছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায় না। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেন তিনি।
সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক পরিতোষ কুমার রায় জানান, হাসপাতালের প্রধান সমস্যা অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। গত বছর করোনা মহামারি শুরু হওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। হাসপাতালের বিদ্যমান ১০০টি শয্যার ৭০টি করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে গড়ে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকে। জায়গার অভাবে অন্য রোগীদের অনেককেই ভর্তি করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে নতুন ভবনে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা চালু করার জন্য প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে স্পেকট্রা কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় তারা গ্যাস সরবরাহ লাইনের কাজ শুরু করতে পারেনি।
স্পেকট্রার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আল মামুন জানান, তাঁরা দুই শতাধিক শয্যায় অক্সিজেন সরবরাহ লাইন স্থাপনের কার্যাদেশ পেয়েছেন। কিন্তু নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় তাঁরা কাজ শুরু করতে পারছেন না।
জেলার সিভিল সার্জন কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘সদর হাসপাতালে প্রথমে ৩১ শয্যার কোভিড ওয়ার্ড করা হয়েছিল। প্রতিনিয়ত করোনা রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই দফায় তা বাড়িয়ে ৭০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন ভবনটি চালু করা গেলে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সহজ হতো। দুর্ভাগ্য যে তা আমরা করতে পারিনি।’
গণপূর্ত বিভাগ নাটোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর আরও জানান, আগামী বছরের জুন মাসে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অথচ এখন পর্যন্ত ঠিকাদার ভবনের জন্য লিফট আমদানি করার ঋণপত্র (এলসি) খোলেননি। দেখা যাবে, সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার পর লিফট না থাকার কারণে ভবন ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণসহ অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এরপরও জনবল বাড়ালে এ বছরের মধ্যে ভবনের সব কাজ শেষ করা সম্ভব। ঠিকাদারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
কাজ বাস্তবায়নে গণপূর্ত বিভাগের অবহেলা ও তদারকির অভাব আছে কি না জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘আমি অল্প দিন হলো এসেছি। আসার পর থেকে প্রতিনিয়ত তাঁকে চাপ দিয়ে যাচ্ছি। শুধু কার্যাদেশ বাতিল করা বাকি আছে। ঝামেলা না থাকলে আমরা সেটাই করতাম।’
জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ জানান, তিনি অল্প কিছুদিন হলো জেলায় যোগদান করেছেন। তবু মহামারির কথা বিবেচনা করে সদর হাসপাতালের অসুবিধার প্রতি নজর দিয়েছেন। শিগগির কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ঠিকাদার মীর আমিরুল ইসলামের ছেলে নাফিউল ইসলাম সম্প্রতি নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। এক মাসের বেশি সময় হাজত খাটার পর তিনি কারামুক্ত হয়েছেন। এই ঠিকাদারের ছোট ভাই ঠিকাদার মীর হাবিবুল আলমের বিরুদ্ধে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের মাটি তুলে সড়ক সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আগেই তিনি প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করে সেই মাটির গর্ত ভরাট করে দিয়েছেন।
তাহসিন সরকার বাঁধন/জেএইচ/এমএস

