শিল্প-সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শিল্প-সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শিল্পী কামরুল হাসানের জীবনী

নিজস্ব প্রতিবেদক: কামরুল হাসান (১৯২১–১৯৮৮) ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যতম পথিকৃৎ, যিনি তাঁর চিত্রকর্মে লোকজ উপাদান আর গভীর দেশপ্রেমের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাঁকে "পটের রাজা" বলা হয়, কারণ তাঁর চিত্রকর্মে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যের প্রতিফলন গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, গ্রাফিক ডিজাইনার, এবং সমাজসচেতন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অগ্রণী যোদ্ধা।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

কামরুল হাসানের জন্ম ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর, ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটেছিল। কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্ট থেকে তিনি চিত্রকলার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি আধুনিক শিল্পের পাশাপাশিই বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে গভীরভাবে অনুধাবন করেন।

কর্মজীবন ও অবদান

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ, কৃষক, জেলে, নারী এবং প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি তাঁর চিত্রকর্মের প্রধান উপজীব্য। তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রঙের ব্যবহারের সহজাত গুণ এবং অঙ্কনের সাবলীলতা। বিশেষত তাঁর পটচিত্র শৈলী বাংলার লোকশিল্পকে আধুনিক শিল্পকলার সাথে সংযুক্ত করেছে। কামরুল হাসান ঢাকা আর্ট কলেজের (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন এবং সেখানে শিক্ষকতা করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কামরুল হাসান তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে বাঙালির সংগ্রামের চেতনাকে জাগ্রত করেছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টি “এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে” পোস্টারটি মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং মুক্তিকামী জনতাকে উদ্বুদ্ধ করে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

কামরুল হাসান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশ সরকারের শিল্পকলার সর্বোচ্চ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।

ব্যক্তিগত জীবন

সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী কামরুল হাসান ছিলেন এক দৃঢ়চেতা দেশপ্রেমিক। তিনি শিল্পের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য আজীবন কাজ করেছেন।

মৃত্যু

১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, একটি জাতীয় সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তি ছিল, “আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু তোমরা আমার দেশটাকে ভালো করে গড়ে তুলবে।”

কামরুল হাসান শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির এক চিরঞ্জীব প্রেরণা। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও বাংলার মাটির গন্ধ বহন করে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সৃজনশীলতার মশাল জ্বালিয়ে রাখছে।

ঘরে ফেরা সোজা নয় : আসাদ চৌধুরী

শিহাব শাহরিয়ার: ‘ঘরে ফেরা সোজা নয়’ তাঁর একটি গ্রন্থের নাম। তিনি নিজেও আর ঘরে ফিরতে পারলেন না! ঘর থেকে হাসপাতালে গেলেন, কিন্তু কিছুতেই ঘরে ফেরা হলো না তাঁর। সোজা তো নয়ই, কিছুতেই নয়! কবিতার বইয়ের নামটি জীবনের সঙ্গে সত্য করে দিলেন তিনি।  

কবি তো সৃজন-ঈশ্বর, তাই তারা আগেভাগেই অনেক কিছু বলে দেন। বলে দিতে পারেন। তিনি যেন কোথায় গেলেন, আর দেখা যাবে না তাঁর ঘরে, মঞ্চে, পর্দায়, পথে, আর খাবেন না ‘তবক দেওয়া পান’। রবীন্দ্রনাথের মতো আশি বছরের সমান বয়সী হয়ে অনন্তলোকের দিকে যাত্রা করলেন তিনি। তিনি সমকালীন বাংলা কবিতার খ্যাতিমান কবি, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, অনুবাদক, জীবনীলেখক, ভ্রমণলেখক, ভারী কণ্ঠের বক্তা, আবৃত্তিশিল্পী, দেশসেরা উপস্থাপক, মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা একাডেমির ফেলো, সাবেক পরিচালক, রসিক, বাংলাদেশের অসাধারণ প্রকৃতি ও ঐতিহ্য-রঙের এক দীর্ঘ সাক্ষীসুতো আসাদ চৌধুরী।

নদী মেখলা বরিশালে জন্ম নেয়া কবি, শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন তাঁর দ্বৈত নাগরিকের দেশ কানাডার অশোয়া শহরের লে’ক রিজ হাসপাতালে। মরণব্যাধি ব্লাড-ক্যান্সার কেড়ে নিলো তাঁকে। রোগকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই, তাঁর জীবন এখানেই শেষ হবে হয়তো লেখা ছিল। জীবনের বাতি সবারই নিভে যাবে। কিন্তু কিছু মানুষের চিরতরে চলে যাওয়া অনেকের মন ভীষণ খারাপ করে দেয়! আমিও বিষণ্ন, বিমর্ষ, বিস্মিত, বিপন্ন বোধ করছি। কারণ কবি তো বটেই, তাঁর চেয়ে বেশি বড় আমাদের প্রজন্মের অভিভাবক, আরো খুলে বললে, স্নেহদড়ি লাগিয়ে রাখা যেন একজন সিনিয়র ফ্রেন্ড অর্থাৎ একসঙ্গে দীর্ঘ পথ চলা বন্ধু।

এই বন্ধুবৎসল কবি ও অভিভাবকের সঙ্গে শেষ দেখাটি হলো না। যদিও শেষ দেখা বলে কিছু নেই। কিন্তু প্রথমবারের মতো কানাডায় গিয়ে, ঠিক এক মাস আগে তাঁর শেষ অবস্থানের খুব কাছের মহাসড়কের দিয়ে অর্থাৎ টরেন্টো থেকে মন্ট্রিয়েল দু’বার যাতায়াত করেও দেখা করতে পারিনি সময়ের অভাবে। এমনি কি সর্বশেষ বাংলাদেশ থেকে যখন অসুস্থ হয়ে কানাডা ফিরে যান, তাঁর ক’দিন আগেই আমাকে সেল ফোনে কল করেছিলেন। আমি সময়ের অভাবে ধরতে পারিনি? হায়রে সময়! পরে যখন তাঁকে ফোন করবো, তখন তিনি হাসপাতাল থেকেই চলে গেছেন স্ত্রী-কন্যা-পুত্রদের কাছে। টরেন্টোতে অনুষ্ঠিত আমার অগ্রজ কবি ও সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের বড়কন্যা অনাদি নিমগ্নের বিয়েতে এসেছিলেন তাঁর বড় পুত্র আসিফ ও কন্যা শাওলি। তাদের সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো, তাঁর খোঁজখবর নিলাম। ওরা বললো, একদিন এসে বাবাকে দেখে যান। কিন্তু যাওয়া হলো কই? সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে কানাডা থেকে উড়াল দিলাম বাংলাদেশে। আর ঠিক এক মাস পর ৫ অক্টোবর তাঁর সুদূরের দেশে ফিরে যাবার খবর পেলাম... মনটা বৃষ্টির জলে যেন ভিজে গেল। অথবা তুষের আগুনের মতো ভিতরটা পুড়তে থাকলো।

কানাডায় পাড়ি জমানোর পর, যখনই ঢাকা আসতেন, এসেই আমাকে ফোন করতেন। বলতেন, শিহাব আমি ঢাকায় এসেছি। আমি বলতাম, জি আসাদ ভাই, চলে আসুন শাহবাগে জাদুঘরে। চলে আসতেন।  কখনো তাঁর প্রাণের প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি হয়ে অথবা যাবার পথে অথবা কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে যাবার পথে। এসেই হ্যান্ডশেক করে কাঁধ থেকে কাপড়ের ব্যাগ বা ভারী ঝোলাটি চেয়ার অথবা সোফায় নামিয়ে রেখেই বলতেন, কেমন আছো শিহাব? কি খাওয়াবে? কফি না চা? আমি বলতার আপনার যেটি পছন্দ। কফিই দাও। কফি খেতে খেতে আমার খোঁজ নিতেন। আমি তাঁকে বলতাম, ক’দিন থাকবেন? বলতেন, আছি বেশ কয়েক দিন। কেন কোনো অনুষ্ঠান আছে? আমি বলতাম, জাদুঘরে একটি সেমিনার আছে। আপনি মূল বক্তা অথবা সভাপতি, অথবা কবিদের বিশেষ কবিতা পাঠ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যেতেন। বলতেন, আমি আসবো। আসতেন, স্বভাবসুলভ চমৎকার বক্তৃতা করতেন। শ্রোতাদের হাসাতেন। চিন্তার খোরাক দিতেন।

অনুষ্ঠান শেষে সম্মানীর খাম হাতে দিলে রসিকতা করে বলতেন, খামে কি শিহাব? বলতাম সম্মানী।  সম্মানীও দিলে! বাহ, তারপর তাঁর সেই জগত বিখ্যাত হাসি, হা হা হা হা...। এই হাসি বাতাসে মিশতে অনেকক্ষণ সময় লাগতো। গত কয়েক বছর জাদুঘরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও সেমিনারে আমন্ত্রণ জানাতে পেরেছি। জাদুঘরের কথ্যইতিহাস কার্যক্রমের আওতায় বরেণ্য ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। কানাডা থেকে একবার আসার পর তাঁর কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে আর্কাইভে সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেছি।

আমি যখন আশির দশকে টেলিভিশন দেখা শুরু করি, তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় অসাধারণ বাচনভঙ্গি, শুদ্ধ উচ্চারণ, স্বতঃস্ফূর্ত থ্রুয়িং দিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন যারা, যেমন সাংবাদিক ফজলে লোহানী, কবি আবু হেনা মুস্তফা কামাল, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রমুখ এবং তাঁদেরই সঙ্গে অপরিহার্য একটি নাম কবি আসাদ চৌধুরী। সে সময় একটি টিভি চ্যানেল বিটিভিতে ‘প্রচ্ছদ’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি। আমিও এখন টেলিভিশন, বেতার ও মঞ্চে উপস্থাপনা করি। যার মূলমন্ত্র এবং আমার আইকন উল্লিখিত উপস্থাপকগণ। এর মধ্যে আসাদ চৌধুরী তো অবশ্যই। আর একটি নাম যুক্ত করি যিনি এঁদের পরে অত্যন্ত চমৎকার উপস্থাপনা করে জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি আনিসুল হক (যিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন)। বিটিভি’র পর অনেকগুলো প্রাইভেট হয়েছে, সেখানেও তিনি গানের অনুষ্ঠান, সাহিত্যের অনুষ্ঠান কিম্বা সংস্কৃতির নানা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন। দেখা গেছে, রাত গভীরে বিভিন্ন চ্যানেলে এই প্রজন্মের গানের শিল্পীদের সরাসরি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন। মনে পড়বে আপনাদের টিভি চ্যানেল বাংলা ভিশনের একটি আউটডোর প্রোগ্রাম, যেটি আবার রাতে বিভিন্ন পার্কে, খোলা জায়গায় নিয়মিত করতেন, ভাবেন তখন তাঁর বয়স সত্তর অথবা সত্তর উর্ধ্ব! অনুষ্ঠানকে কীভাবে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়, জনপ্রিয় করা যায়, তাঁর মধ্যে সেই মেধা ও মনন ছিল।

আগেই বলেছি তাঁর উপস্থাপনা দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়ে বিটিভি’র নানা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি এবং করছি। বর্তমানে সাহিত্য বিষয়ক একটি অনুষ্ঠান আমার পরিকল্পনা, গ্রন্থণা ও উপস্থাপনায় প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানে তাঁকে বেশ কয়েকবার অতিথি হিসেবে নিয়েছি। তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম, সেটি বিটিভি’র আর্কাইভে আছে কি না জানি না? বাংলাদেশে শেষ আসার আগে যখন এলেন, সেই সুন্দর করে ফোন করলেন, বললেন তোমার ওখানে আসছি। আসলেন। আমি বললাম, আসাদ ভাই আমার বিটিভি’র সাহিত্যের অনুষ্ঠান ‘কথা ও কবিতা’র রেকর্ডিং আছে, আপনি যেতে পারবেন? বলো কি যাবো না মানে? তোমার সঙ্গে সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভালোই লাগে। বলে রাখি, ষাটের দশকের প্রায় অধিকাংশ কবিই প্রচুর পড়াশুনা করেছেন। আসাদ চৌধুরীও তাঁদের অন্যতম। যে কারণে তাঁর সাহিত্যালোচনা খুব সমৃদ্ধ হতো। অনুষ্ঠানের মান বেড়ে যেতো।

তিনি কি আর আসবেন ঢাকায়? ফোন করে বলবেন, শিহাব আমি ঢাকায়। এখানে বলে রাখি, কানাডা থেকে একবার বোধহয় একাই এসেছিলেন। উঠেছিলেন তাঁর কল্যাণপুরের বাসায়। একদিন আমার অফিসে জাদুঘরে আসলেন লাঠি ভর করে। আমি দেখে অবাক! জিজ্ঞেস করলাম আসাদ ভাই, লাঠি কেন, শরীর খারাপ? আর বলো না শিহাব, বাসায় বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি কাছে গিয়ে সোফায় বসিয়ে বললাম, এখন কেমন লাগছে? তাঁর কণ্ঠস্বর খুব নেমে গেল, শিশুর মতো করে বললেন, খুব চোট পেয়েছি, ভয়ও পেয়েছি। চোখটা যেন একটু ছলছল হয়ে গেল। খারাপই লাগলো। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, হায়রে বয়স আর হায়রে স্বদেশ, হায়রে বিদেশ, হায়রে জীবন? বললাম, আসাদ ভাই দুপুরের খাবার আনাই? আনাও। খাবার আনিয়ে একসঙ্গে দু’জন খেলাম। বিকেল পর্যন্ত আমার অফিস কক্ষেই রেখে দিলাম, তারপর ধরে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিলাম। 

বাংলা একাডেমি, কবি আসাদ চৌধুরীর দীর্ঘ দিনের কর্মক্ষেত্র। যতটা মনে পড়ে, ১৯৮৪ সালে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়, আমার সহোদর কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেদিনই দেখেছি, খুব আন্তরিকভাবে আমাকে নিলেন, যেন এক ধরনের স্নেহছায়ায় ভরিয়ে দিলেন। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কবিতা লিখতে শুরু করেছি। ভাইয়ের কাছে বললেন, বাহ ভালোই তো! জিয়া হায়দারদের মতো একই পরিবারে দুই ভাই লেখক, বেশ। তারপর যখনই বাংলা একাডেমিতে গেছি, যখনই দেখা হয়েছে, নানা কুশলাদি, লেখালেখি নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন। বিশেষ করে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রতিদিনই প্রায় দেখা হতো। লম্বা বাবরি চুলের পাঞ্জাবি পরা, কিম্বা শার্ট-প্যান্ট পরা কিম্বা কখনো ফতোয়া পরা কিম্বা কখনো টি-শার্ট পরা আসাদ চৌধুরীকে দেখে খুব আপনজন মনে হতো। ১৯৯৫ সালের কথা বলি, আমি বাংলা একাডেমি আয়োজিত ও ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে জুনিয়র ফোকলোর ফেলোশিপ করছি। একাডেমির পরিচালক ও বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের তত্ত্বাবধানে ‘বাংলাদেশের পুতুলনাচ’ বিষয়ে এক বছরের ফিল্ডওয়ার্ক ভিত্তিক গবেষণার কাজ করছি। তখন নিয়মিত দেখা হতো একাডেমির কর্মকর্তা ও বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখক শামসুজ্জামান খান তো বটেই, তারপর রশীদ হায়দার, রফিক আজাদ, সেলিনা হোসেন, আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, ফরহাদ খান, হান্নান ঠাকুর প্রমুখদের সঙ্গে। কাজের ফাঁকে এঁদের সঙ্গ পেয়ে এবং আড্ডায় থাকতে পেরে বিশেষ করে বাইরে থেকেও অনেক লেখকরা আসতেন, বেশ সমৃদ্ধ হতাম।

যাহোক ঐ এক বছরে প্রায় দিনই আসাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো। তো কোর্স শেষ হলে ডিসেম্বরে, পাণ্ডুলিপি জমা দিলাম। ’৯৬ সালে পাণ্ডুলিপিগুলোর প্রিভিউ হলো। যেদিন প্রিভিউ কমিটি বসেছে, সেদিন আমি ও লোকসংগ্রাহক মোহাম্মদ সাইদুর বর্ধমান হাউজের নিচে বসে আছি এবং ফোকলোরের উপর অন্য একটি নিয়ে কাজ করবো, এ বিষয় নিয়ে কথা বলছি। তখন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, এমন সময় উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে কবি আসাদ চৌধুরী নিচে নামছেন। নিচে আসবার পর আমি সালাম দিতেই তিনি কাছে এসে আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, অভিনন্দন শিহাব। আমি বললাম, কি বিষয়ে আসাদ ভাই? বললেন, আরে ভাই প্রিভিউ কমিটির মিটিং শেষ করে নামলাম, তোমাদের জুনিয়র ফোকলোর ফেলোদের পাণ্ডুলিপির গ্রন্থ চূড়ান্তকরণ, সেখানে আমি সভাপতি ছিলাম, পর্যালোচনায় তোমার পাণ্ডুলিপি প্রথম হয়েছে। আমি এ খবর শুনে আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠলাম। পরে ১৯৯৭ সালে ‘বাংলাদেশের পুতুলনাচ’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যেটি আমার লেখক জীবনের প্রথম বই। এই স্মৃতি সারাজীবন মনে থাকবে।  

আমার অগ্রজ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল একদিন বললেন, চল আসাদ ভাইয়ের বাসায় যাই। বললাম, কেন? গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসি। বললেন, প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ঢাকায় এসেছেন, উঠেছেন পান্থপথে আসাদ ভাইয়ের বাসায়। তাহলে, চলো। শাহবাগ থেকে রিকশায় যেতে যেতে আমি বললাম, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এই অমর গানের গীতিকার গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছে লন্ডনে, ব্রেডি আর্ট সেন্টারে, ২০০৬ সালে কবি শামসুর রাহমানের স্মরণ সভায়। ভাইয়া বললেন, তুই কি জানিস, গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে আসাদ ভাইয়ের সম্পর্ক? বললাম, না। তারা দু’জন চাচা-ভাতিজা। আমি একটু চমৎকৃত হলাম। আমাদের রিকশা গিয়ে আসাদ ভাইয়ের বাসার গেটে থামল, নেমে উপরে উঠলাম। ভিতরে ঢুকেই দেখলাম গাফফার ভাই একটা হাফশার্ট ও লুঙ্গি পরে ডাইনিং চেয়ারে বসে চা খাচ্ছেন। অন্যান্য চেয়ারগুলোতে আসাদ ভাই, ভাবী ও তাদের একমাত্র কন্য শাওলি বসে আছেন। সালাম দেয়ার পরেই গাফফার ভাই বললেন, দুলাল কেমন আছো, শিহাব কেমন আছো? আমরা বললাম ভালো। তখন আসাদ ভাই বললেন, আপনি কি জানেন, দুলাল ও শিহাব সহোদর। গাফফার ভাই বললেন, না তো জানি না! যাহোক সেদিন আসাদ ভাইয়ের বাসায় অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে ফিরে আসি। আসার সময় ভাইয়া বললেন, আসাদ ভাই জার্মানীতে ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগে দু’বছর কাজ করেছেন। পরবর্তীতে তার কন্যা শাওলিও কাজ করেছে। যেমন করেছে ষাটের দশকের আরেক কবি জাহিদুল হক।

আসাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন ‘বাসায় এসো’। তিনি প্রথম এলিফ্যান্ট রোডের অর্থাৎ সায়েন্সল্যাবের ওপোজিটে ফ্ল্যাট কিনলেন, সেখানে একদিন গিয়েছিলাম। আসাদ ভাই খুব খুশি হয়েছিলেন, সেদিন ভাবী চা-নাস্তা দিলেন, অনেকক্ষণ তাঁর বাসায় থেকে শিল্প-সাহিত্য, বেতার-টেলিভিশন, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। একজন লেখকের বাড়িতে বই থাকবে সেটাই স্বাভাবিক, আসাদ ভাইয়ের বাসায় তাই-ই দেখলাম, শোকেস ও আলমারিতে অসংখ্য বই সাজানো আছে। আগেই বলেছি আসাদ ভাই, প্রচুর পড়াশোনা জানা মানুষ। যখন সাহিত্য নিয়ে কথা বলতেন, তখন তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু জানতাম, শিখতাম। বাংলাদেশ বেতার আমরা নানা ধরনের অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলাম। তবে বেতারের সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ মাসে চারটি অনুষ্ঠান হতো। আসাদ ভাই দুইটি এবং আমি দুইটি গ্রন্থণা ও উপস্থাপনা করতাম। টেলিভিশনেও কবিতা পড়তে গেলে দেখা হতো, দেখা হতো  বইয়ের পাড়া শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। প্রায় নিয়মিত কাঁধে কাপড়ের সেই লম্বা ব্যাগ ঝুলিয়ে আসতেন। যে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তবক দেওয়া পান’ দিয়ে বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছেন অর্থাৎ হৃদয় জয় করেছেন; মাঝখানে বেশ কিছুদিন প্রচুর পান খেতেন। মসলাসহ সেই পানের ডিব্বাটি সঙ্গে নিয়ে চলতেন। যেখানেই বসতেন পানের কৌটাটা বের করে মসলা দিয়ে পান তৈরি করতেন আর কথা বলতেন। তাঁর পান খাওয়া দেখলে মনে হতো পৃথিবী শান্তি ও তৃপ্তিময়। আমিও অনেক সময় বলতাম, আসাদ ভাই পান খাবো, তখন জিজ্ঞেস করতেন, চুন-সুপারি খাও কিনা, জর্দা খাও কিনা? বলে, নিজেই সুন্দর করে পান বানিয়ে দিতেন। এবং খাওয়া-খাওয়ির মধ্যেই তিনি অনেক মূল্যবান কথা বলতেন। রসিকতা করতেন।

একদিন আজিজ মার্কেটে আমার অগ্রজের বইয়ের প্রকাশনা ও সেল সেন্টার ‘পাঠশালা’য় বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, আসাদ ভাই, পাঠশালা থেকে সুকুমার বড়ুয়ার একটি ছড়াগ্রন্থ করতে চাই। নাম ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’। আপনি একটু ভূমিকা লিখে দেন। সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হলেন এবং পরদিন সকালে নিজেই এসে দিয়ে গেলেন এবং এজন্য তাঁকে সম্মানী দিলাম। এখানে জানিয়ে রাখি এই বইটি অসংখ্য কপি বিক্রি হয়েছে।

একবার মৌলভীবাজার যাচ্ছি একটি সাহিত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে। প্রধান অতিথি হিসেবে কবি আসাদ চৌধুরী, অন্যান্য অতিথি হিসেবে আমি, কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন ও আরো কয়েকজন। আমরা একটি মাইক্রোবাসে করে ঢাকা থেকে যাচ্ছি। আসাদ ভাই খুব মজার মানুষ, গাড়িতে উঠেই নানা ধরনের রসিকতা, ষাটের দশকের কবি-সাহিত্যিকদের দারুণ দারুণ ঘটনা বলতে বলতে জমিয়ে তুললেন। তারপর বললেন, হাইওয়ের পাশে টঙের দোকানে লোকেরা চা বেঁচবে আর আমরা চা খাবো না, তাতো হয় না? যেই কথা সেই কাজ। নরসিংদীর বেলাবোর কাছে আমাদের গাড়ি থেমে গেল। আমরা নামলাম। বাইরে শীতের মিষ্টি রোদ। চায়ের দোকানে গিয়ে কাঠের বেঞ্চে আরাম করে সবাই বসলাম। আসাদ ভাই পান সাজাতে থাকলেন। চা এলো, খেলাম। আসাদ ভাই বললেন, আমরা যেখানে বসে আছি তার পিছনেই উয়ারি-বটেশ্বর পাশাপাশি দুটি গ্রাম, প্রত্নতাত্ত্বিকরা লাল মাটি খনন করে আড়াই হাজার বছরের আগের বাঙালিকে আবিষ্কার করেছেন। এটি না দেখে কি চলে?

এখানেও যেই কথা সেই কাজ। গাড়িতে উঠে চললাম বটেশ্বর গ্রামের দিকে। মাত্র পনের মিনিট সময়ের মধ্যেই গিরিশচন্দ্র মহাশয়ের বাড়ির সন্নিকটে উয়ারি গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হলাম এবং গাড়িতে যেতে যেতেই আসাদ ভাই এই গ্রামের একজন কীর্তিমান লেখক, শিক্ষক ও ফোকলোর গবেষক হাবীবুল্লাহ পাঠানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি এসে হাজির এবং আমাদের রিসিভ করে খননস্থল ঘুরে দেখালেন এবং এখানে পাওয়া আড়াই হাজার বছর আগের কিছু নিদর্শন দিয়ে তাঁর বাড়িতে গড়ে তোলা একটি জাদুঘরে নিয়ে গেলেন। আমরা সেই নিদর্শনসমৃদ্ধ জাদুঘরটি দেখে অনেক কিছু জানলাম। আসাদ ভাইয়ের মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই প্রত্নস্থান দেখে চললাম মৌলভীবাজারের দিকে। বিকেলে গিয়ে পৌঁছালাম এবং অনুষ্ঠানে আসাদ ভাইয়ের একটি দারুণ বক্তৃতা উপভোগ করলাম, এরপর রাতে আড্ডা অবস্থানশেষে পরদিন ঢাকা ফিরে এলাম।

কবি আসাদ চৌধুরী তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মের জন্য ৮০ বছর বয়সেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি। তাতে কি- মরণোত্তর হয়তো পাবেন? পেয়েছেন তো একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশের অসংখ্য সেরা সেরা পুরস্কার ও পদক। তবে ইতিহাসের অপরিহার্য গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ ও জাতির পিতার জীবনীগ্রন্থ ‘সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থদ্বয়ের অসাধারণ পরিশ্রম ও মননের জন্য জীবিতাবস্থায় স্বাধীনতা পুরস্কারটি পেলে তৃপ্তি পেতেন একথা বলা যায়। আসলে প্রকৃত লেখকরা কোনো প্রাপ্তির আশায় সৃজনে থাকেন না, কিম্বা বলা যায় তাঁদের আকাঙ্ক্ষা কম। সেই আসাদ চৌধুরীও নির্লোভ। তাঁর মুখ দেখলে কখনো মনে হয়নি তাঁর এটি পেতেই হবে। কিন্তু তিনি লিখে গেছেন নিরন্তর। তাঁর ১৮টি কবিতার বইসহ মোট গ্রন্থেও সংখ্যা প্রায় ৪১টি। কয়েকটি বইয়ের নাম দেখুন কি সুন্দর: তবক দেওয়া পান (১৯৭৫), বিত্ত নাই বেসাত নাই (১৯৭৬), প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড় (১৯৭৬), জলের মধ্যে লেখাজোখা (১৯৮২), যে পারে পারুক (১৯৮৩), মধ্য মাঠ থেকে (১৯৮৪), মেঘের জুলুম পাখির জুলুম (১৯৮৫), দুঃখীরা গল্প করে (১৯৮৭), নদীও বিবস্ত্র হয় (১৯৯২), বাতাস যেমন পরিচিত (১৯৯৮), বৃন্তির সংবাদে আমি কেউ নই (১৯৯৮), কিছু ফল আমি নিভিয়ে দিয়েছি (২০০৩), ঘরে ফেরা সোজা নয় (২০০৬)। এই শেষ কাব্যগ্রন্থটির নাম দিয়েই লেখা শুরু করেছিলাম, দেখুন তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামগুলো যেমন সুন্দর, তেমনি তাঁর কবিতা অসংখ্য পাঠকে সুন্দরের শীর্ষে নিয়ে যায়।

তাঁর লেখা একটি প্রেমের কবিতা দিয়ে শেষ করি: আপনার শুধু কবি আসাদ চৌধুরীর এই ক’টা কবিতা পড়ুন, দেখুন কতটা আপনাকে নাড়াবে? ‘রিপোর্ট ৭১’, ‘শহীদদের প্রতি’, ‘প্রথম কবি তুমি প্রথম বিদ্রোহী, ‘বারবারা বিডরালকে’, ‘তখন সত্যি মানুষ ছিলাম সত্যি ফেরারি’ ‘সত্যি ফোরি’। শেষ করি তাঁর একটি কবিতার চরণ দিয়ে:
‘কোন ঘাসে ছিল
দুঃখ তোমার     
কোনে ঘাসে ছিল
প্রেম
কোথায় ছিলেন
রূপালি জ্যোৎস্না
ঢের সূর্যের হেম
কখনো নদীতে
সোনালি গীতিকে
একথা বলেছিলেম।’

বাকেরগঞ্জের ঘাস, নদী, গীতি, ঢাকার প্রেম আর অসোয়ার জ্যোৎস্না গায়ে মেখেই কবি আসাদ চৌধুরী হারিয়ে গেলেন সুদূরের কোন নদীতে কিম্বা ঘাসের বিছানায়। আর হবে না দেখা, কথা। বুকে হাহাকার লাগছে আসাদ ভাই- বিদায়।

গল্পটা আমাদের দুজনের ছিল

মোহছেনা ঝর্ণা: গল্পটা আমাদের দুজনের ছিল। আমাদের জুড়ে শুধুই আমরা। ‘আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি, সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ’ কবিতার এই লাইনগুলোর মতোই সুখ ছিল আমাদের। ভেতরে ভেতরে যে গোপন দুঃখ ছিল না তা নয়। তারপরও দুঃখকে জয় করার মন্ত্র শিখে নিয়েছিলাম আমরা, আমাদের মতো করেই। তবে গল্পে আমাদের তিনজনেরই থাকার কথা ছিল। কিংবা হতে পারত চারজনের। আমাদের মধ্যে যে কোনো সময় তৃতীয় একজন ঢুকে পড়বে এমন একটা সম্ভাবনা ছিল সবসময়ই। যদিও মাঝে মাঝে এই সম্ভাবনাকে আমি আশঙ্কা ভেবে স্তিমিত হয়ে যেতাম। শুধু আমি না, আমরা দু'জনেই হয়তো আশঙ্কায় থাকতাম। আমরা দুজন একে অন্যের গায়ে গায়ে লেগে থাকতাম। বৃষ্টি হলে ছাদে গিয়ে ভিজতাম। আমাদের দুজনের বেদনার জায়গাটা একই হওয়াতে আমাদের মন খারাপের সময়গুলোতে আমরা একে অন্যের বুকের সাথে শক্ত করে লেপ্টে থাকতাম। ইন্টার ট্রান্সফারের মতো আমাদের গোপন কষ্ট একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে চলে যেত।

ছুটির দিনগুলো ছিল আমাদের জীবনের সেরা দিন। কারণ এ দিনগুলোতে সারাক্ষণ আমরা একসঙ্গে থাকতাম। একসঙ্গে খেলতাম। ঘর গোছাতাম। গাছের যত্ন নিতাম। অনেক ধরনের গাছ ছিল আমাদের। সন্ধ্যামালতী, নয়নতারা, অলকানন্দা, বেলী, হাসনাহেনা, রুয়েলিয়া, রেইনলিলি, অ্যালোভেরা, কাটামুকুট, বোগেনভিলিয়াসহ আরও বিভিন্ন রকম পাতাবাহার। গাছগুলোর সঙ্গে আমাদের খুব মায়ার সম্পর্ক ছিল। গাছগুলোতে যেদিন সুগন্ধী ফুল ফুটতো, সেদিন সে কিছুক্ষণ গভীর আবেগে ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখতো। বিশেষ করে যেদিন থোকায় থোকায় বেলী ফুটত সেদিন দেখতাম কিছু ফুল তুলে এনে পড়ার টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট ফটো ফ্রেমটার সামনে ছড়িয়ে রাখতো। বেলী ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে আমাদের ঘরটা বড্ড মায়াবী হয়ে উঠতো।

বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলেও একসঙ্গেই যেতাম আমরা। আমাদের একজনকে দেখলে পরিচিত মানুষজনেরা ডানে-বামে, কিংবা আগেপিছে তাকিয়ে আরেকজনকে খুঁজে নিতো। ছুটির দিনের সকাল বেলার সময়টা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। কারণ ঘুম ভাঙার পরও সেই দিনগুলোতে আমরা অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে আলসেমি করতাম। শুয়ে শুয়েই কত এলোমেলো কথা বলতাম। আমি অবশ্য শ্রোতাই থাকতাম বেশির ভাগ সময়ই।

তারপর আমরা দু'জনে মিলেই নাস্তার আয়োজন করতাম। ছুটা কাজের মানুষটা আসলে আমাদের রান্নার কষ্ট তেমন করতে হতো না। সেই রান্নাবান্না করে যেতো। আর যেদিন ছুটা বুয়াটা আসতো না, সেদিন আমাদের বেশ বিপত্তিই হয়ে যেতো। তবে দিনটা ছুটির দিন থাকলে কিন্তু আমরা থাকতাম স্বর্গলোকে। সেদিন আমাদের ধরাবাঁধা কোনো শৃঙ্খল থাকতো না। কোনো কোনো ছুটির দিনে বিকাল বেলায় আমরা বটতলী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে থাকতাম। আমরা ভাবতাম কোনো একটা ট্রেন হয়তো শুধু আমাদের জন্যই এই প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবে। বিকালবেলায় যারা হাঁটতে বের হয় তাদের অনেকে রেললাইনের প্ল্যাটফর্মের পাশের খোলা জায়গাটায় হাঁটে। সে হন্টনরত মানুষগুলোর মধ্যে কেউ কেউ খুব উৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকাতো। হুঁইসেল বাজিয়ে এক একটা ট্রেন প্ল্যাটফর্ম স্পর্শ করতো, আমরা কেমন অবাক করা চোখে ট্রেন থেকে বের হওয়া মুখগুলো দেখতাম। ভ্রমণ ক্লান্তি পেরিয়ে এক একটা মুখে এত প্রশান্তি থাকতো তা দেখে আনমনে আমরা গোপন দীর্ঘশ্বাস ছাড়তাম। মনে হতো এই ট্রেন আমাদের জন্য নয়। আমাদের যাত্রী এই ট্রেনে নেই। আমাদের যাত্রী যে আসলে কোন ট্রেনে তা আমাদের বোঝার সাধ্যি ছিল না। আমাদের আসলে কোনো যাত্রীই ছিল না। তবুও এমন প্রতীক্ষা আমরা করেই যেতাম।

ছুটির দিনে আলস্যে ভরা সময়টাতে মাঝেমধ্যে আমাদের গল্পে তৃতীয়জনের কথা আসতো। ভবিষ্যৎ সেই তৃতীয়জনের কথা ভেবে কখনো আমরা মজা করতাম, কখনো অভিনয় করে তার আকার, আকৃতি, হাবভাব দেখিয়ে খিকখিক করে হাসতাম, কখনো ভয়ও পেতাম। আবার মাঝেমাঝে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিও রোমন্থন হতো। সেই রোমন্থনে অবশ্য আমি খুব ভালো সঙ্গী হতে পারতাম না।

তারপর একদিন ঘটনাটা ঘটেই গেলো। ঘটবে ঘটবে সম্ভাবনা যখন জেগেছে তখন থেকেই আমার মনে শঙ্কা হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল এবার তবে সত্যিই বাঁধন ছিঁড়ল। সত্যি বলতে আমি অনেক কেঁদেছিলামও। কিন্তু তার গোপন কান্নাও আমি দেখেছি। এমন একটা ঘটনা ঘটবে ঘটবে করেও অনেকগুলো দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা ধরেই নিয়েছি এমন আর কিছু হয়তো আপাতত ঘটবে না। খুব ভালো কি ছিলাম আমরা? তবে খুব যে খারাপ ছিলাম তা বলা যাবে না কোনোভাবেই। কারণ আগেই বলেছি আমরা বেঁচে থাকার মন্ত্র শিখে গিয়েছিলাম। আমরা দুষ্টুমির ছলেই বলতাম ভবিষ্যৎ তৃতীয়জনের কথা। আমার কিংবা আমাদের বিশেষ বিশেষ দিনে আমরা খুব বিষণ্ণ থাকতাম ফেলে আসা তৃতীয়জনের জন্য। যেই গল্পটা আমাদের তিনজনেরই হওয়ার কথা ছিল। কিংবা হতে পারতো চারজনের।

তারপর যেদিন থেকে গল্পটা নতুন করে আমাদের তিনজনের হতে চলল, সেদিন থেকে মূলত গল্পটা আমার একার হয়ে গেলো। বাবা বিয়ে করেছেন। যাকে বিয়ে করেছেন তাকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। বাবাই চেয়েছেন তাকে আমার জন্য। মা হারা ছেলে আমি। আমার যখন চার বছর বয়স তখন আমার আরেকটি জীবন্ত খেলার সঙ্গী আনতে গিয়ে মা নিজেই হারিয়ে গেলেন। আমাদের গল্পটা আর চারজনের হলো না। তিনজনেরও থাকলো না। প্রথম কিছুদিনের স্মৃতি আমার সেরকম স্পষ্ট মনে নেই। শুধু মনে আছে বাবা যতক্ষণ বাসায় থাকতো তার বেশির ভাগ সময়ই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতো। কাঁদতো না। কিন্তু চোখ ভেজা থাকতো। সারাক্ষণ মনে হতো এই বুঝি মুখ ধুয়ে এসেছে।

ধীরে ধীরে সব ক্ষতরই প্রকাশ্য রূপটা হালকা হয়ে আসে। আমাদের বেলায়ও তাই ঘটেছে। শোক, সান্ত্বনা দেয়ার মানুষগুলো নিজেদের দৈনন্দিন ছক বাঁধা জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জীবন, জীবিকার তাগিদে বাবাকেও শোক আড়াল করে উঠে দাঁড়াতে হয়েছে। আমার তখনও এসব বোঝার কথা ছিল না। আমি শুধু বুঝেছি এই পৃথিবীতে এত এত মানুষ, শুধু আমার মা নামক ঘ্রাণটি নেই। মার শরীরের ঘ্রাণ ছিল কাগুজি লেবুর মতো। তারপর ধীরে ধীরে একটা সময় বাবার শরীরে আমি কাগুজি লেবুর ঘ্রাণটা পেতে থাকি। আমার মনে আছে মা আমাকে গান শোনাতো। ‘আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস জ্বেলে করবো নিবেদন, আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন’- কবিগুরুর এই গান প্রতিদিন আমাকে নতুন করে মার চেহারা মনে করিয়ে দিতো। কিন্তু মা নেই তাতে খুব বেশি হাহাকার লাগতো না। কারণ বাবা নিজেকে একই সাথে আমার বাবা এবং মা হিসেবে রূপান্তর করে নিচ্ছিল প্রতিদিন।

কিন্তু সমস্যা করতো আমার দাদি। দাদি গ্রামেই থাকে আমার জেঠুর সাথে। শহরের বদ্ধ ঘরে তার নাকি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তাই তিনি শহরে আসেন কালেভদ্রে, নেহায়েত কোনো প্রয়োজনে। আমি আর বাবাই দু'তিন মাস পরপর দাদিকে দেখতে যাই গ্রামে। যখনই দেখতে যাই দাদি আমাকে ডেকে ঘ্যানঘ্যান করে, দীপ্ত, দাদু ভাই, একটা মা দরকার আছে তো। কতদিন বাবাটা একলা থাকবে? তুমি, তোমার বাবাকে বলো, তোমার মা চাই।

দাদি যখন এমন কথা বলতো, আমার খুব মন খারাপ হতো। কখনও খুব কান্নাও আসতো। আমার মনে হতো, কই আমার আর বাবার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। দাদিকে খুব পঁচা লাগতো। দাদিকে দেখতে যেতেও ইচ্ছে করতো না।

তারপর যখন আরেকটু সময় গেলো আমার দুই ফুফু আমাকে বোঝাতে থাকলো, একটা সময় যখন আমি বড় হয়ে যাবো, পড়ালেখায় ব্যস্ততা বেড়ে যাবে, বাবা নাকি তখন খুব একা হয়ে যাবে। নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে। সত্যি বলতে ফুফুদের মুখে এমন কথা শুনে তখন বাবার জন্য আমার অনেক খারাপ লাগতো। সবাই বলতো, বাবার বয়স এখনও অনেক কম। তাই বাবার নিজের কথাও ভাবা উচিত। আবার আমার কথা ভেবেও নতুন একজন মা আনা উচিত। বাবার নতুন করে জীবন শুরু করা উচিত। আর বলতো, তুই যখন বড় হবি, যখন তোর নিজের জীবনে অন্য কেউ আসবে, তোর নিজের সংসার হবে তখন তোর বাবাকে দেখবে কে? তখন তোর বাবা একা থাকবে কিভাবে? এসব কথা শুনে বাবার কেমন লাগতো আমি জানি না, তবে আমার খুবই কষ্ট হতো। যেদিন এসব কথা হতো সেদিনগুলোতে রাতে ঘুমানোর সময় বাবাকে আমি অন্যদিনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরতাম।

প্রজ্ঞা আন্টি বাবার সাথে একই অফিসে কাজ করে। কথাও বলে সুন্দর করে। কথার মধ্যে বেশ মায়াও আছে। আমারও ভালো লাগতো প্রজ্ঞা আন্টিকে। আমরা একসাথে বাবার অফিসের পিকনিকে যখন গিয়েছি তখন অনেকটা সময় প্রজ্ঞা আন্টি আমাকে আগলে রেখেছেন। পিকনিকের আয়োজক কমিটিতে নাম থাকায় বাবাকে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। সেই ফাঁকে প্রজ্ঞা আন্টির সাথে আমার বেশ ভাব হয়ে যায়। উদালিয়া চা বাগানের সেই মেঠো পথ ধরে যখন আমি আর প্রজ্ঞা আন্টি হাঁটছিলাম তখন প্রজ্ঞা আন্টি আমাকে দেখিয়েছিল সবুজ ঘাসের উপর কেমন করে মানুষ পদচিহ্ন আঁকতে আঁকতে একটা সময় মসৃণ পথ বানিয়ে ফেলে। চা বাগানের ভেতর ঢুকে আমরা নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলেছিলাম। অন্য মায়েরা যেভাবে তাদের সন্তানদের নিয়ে আদিখ্যেতা করে প্রজ্ঞা আন্টি আমার সাথে তাই করছিলেন। সেই মুহূর্তগুলোতে আমার খুব মায়ের কথা মনে পড়ছিল। আমার মাও কি এমন করতো!

বাবা যখন প্রজ্ঞা আন্টিকে বিয়ে করার কথা বললো তখন থেকে আমার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যেতে লাগলো। এই প্রথম আমার খুব একা একা লাগলো নিজেকে। আমার মনে হলো আমাদের দুইজনের গত নয় বছরের গল্পটার ইতি ঘটছে। আমার আরও মনে হলো যে ঘরটা এক সময়ে আমার বাবা মায়ের ছিল, তারপর মা হারিয়ে যাওয়ার পর যে ঘরটা আমাদের দুজনের হলো আজ থেকে সে ঘরটাতেই আমি বহিরাগত। কেন যে এত কান্না পেয়ে গেলো! কান্নার দমকে বাবা ভয় পেয়ে গেলেন। আমাকে বুকের সাথে লাগিয়ে বললো, আমার বাবাটা কাঁদছে! সব বাদ। সব। আমাদের কাউকে দরকার নেই। এটা শুধুই আমাদের সংসার। আমাদের বাপ-বেটার সংসার। বাবার গলায় এত দরদ ছিল যে আমার ভেতর থেকে উঠে আসা কান্না কোনো ভাবেই সামাল দেয়া যাচ্ছিল না। আমি দেখেছি বাবার চোখেও পানি।

বাবার বিয়েতে বরযাত্রীর মধ্যে আমিও ছিলাম। বাবার এটা দ্বিতীয় বিয়ে হলেও প্রজ্ঞা আন্টির প্রথম। তাই তাদের পক্ষ থেকে আয়োজনের ঘাটতি ছিল না। বাবাকেও কেন জানি কিছু সময়ের জন্য হলেও দেখলাম বেশ আনন্দের ভেতর আছে। প্রজ্ঞা আন্টির সাথে প্রথম থেকেই যখন বাবাকে গল্প করতে দেখেছি আমার মনে হয়েছিল বাবার সময়টা ভালো কাটছে। বাবার চোখে মুখে সতেজ একটা ভাব থাকতো। বাবা আমার জন্য তার জীবনের নয়টা বছর একাকীত্বের ভেতর কাটিয়েছে, এ কথা বাবা আমাকে না বললেও আমাদের আত্মীয় স্বজনরা আমাকে প্রায় মনে করিয়ে দিতো।

বাবার সময়গুলো ভাগ হয়ে যাচ্ছিল। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তা হচ্ছিল। ছুটির দিনগুলোতে আমার খুব হাঁসফাঁস লাগতো। আমি ছবি আঁকায় মন দিতাম। বই পড়তাম। আর বারান্দার গ্রিল ধরে দূরের আকাশ দেখতাম। জানালার কার্ণিশে চড়ুই পাখি বাসা বেঁধেছিল। আমি সেই চড়ুইদের হুটোপুটি দেখতাম। আমার ছোট্ট একটা একোরিয়াম ছিল। সেখানে দুইটা গোল্ড ফিশ ছিল। বাবা বলতো গোল্ড ফিশদের সংসার আর আমাদের সংসারের সদস্য এক। তারপর প্রজ্ঞা আন্টিকে বিয়ে করার পর বাবা আরও দুইটা গোল্ড ফিশ এনেছিল। কয়েকদিন পর একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি একটা গোল্ড ফিশ মরে ভেসে আসে। কি যে কান্না এসেছিল আমার। মনে হচ্ছিল আমার নিজের কেউ হারিয়ে গেছে। বাবা অফিস থেকে ফিরে আমার চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা হয়েছে। যতই বলছি, গোল্ড ফিশটা কেন মরে গেল বাবা? সবাইকে কেন মরে যেতে হয়? আরও কি কি এলোমেলো বকেছিলাম এখন আর মনে পড়ে না। শুধু মনে আছে অনেকদিন পর সেদিন রাতে বাবা আমার সাথে ঘুমিয়েছিল। সেদিন বাবার গায়ে কাগুজি লেবুর ঘ্রাণটা আবার খুঁজে পেয়েছিলাম।

আমার নাকের কাছে হঠাৎ করে কাগুজি লেবুর ঘ্রাণ লাগতেই চেয়ারে বসে নিচু করে রাখা মাথাটা সামনের দিকে তুলে ধরতেই দেখি ডাক্তার তূর্ণা আমার সামনে। এই ভদ্রমহিলা কি পারফিউম মাখে কে জানে? একদম মায়ের শরীরের ঘ্রাণটা মনে করিয়ে দেয় বারবার। ডাক্তার তূর্ণার চেহারাটা মলিন। আমি উঠে দাঁড়াতেই আস্তে করে বললো- মানুষের ক্ষমতা খুব সীমিত। মুহূর্তেই আমার মনে হলো আমার চোখের সামনে ঢেউ খেলছে। সব কেমন ঝাপসা লাগছে। ডাক্তার তূর্ণাকেও খুব ঝাপসা লাগছে।

আমি বলেছিলাম আমাদের জীবনে তৃতীয় কেউ না হলেও চলবে। কুমকুম বুঝতে চায়নি। হয়তো সব মেয়ের বেলায় এ কথাই সত্যি। মাতৃত্বের অনুভব সে তো ছেলে হয়ে বোঝার ক্ষমতা প্রকৃতি আমাকে দেয়নি। তাই হয়তো কুমকুমকে আমি বোঝাতে পারিনি। ৫ মাসের দিকেই ডাক্তার বললেন, কুমকুমের হিমোগ্লোবিন অনেক কম। বেশি বেশি খেতে হবে। ৭ মাসের সময় বললো, ওর বেড রেস্ট দরকার। প্লাসেন্টা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। আর তারপর হঠাৎ করেই আজ দুপুরের দিকে ফোন। বাসায় ছুটে এসে কুমকুমকে দেখে মনে হচ্ছিল ওর বুকের উপর বোধহয় ভারি একটা পাথর চেপে রেখেছে কেউ। দরদর করে ঘামছিল। ম্যাক্সির নিচের দিকটা লাল স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল। চেহারাটা দলা পাকানো কাগজের মুচড়ে যাচ্ছিল বারবার। ডাক্তার তূর্ণাকে ফোন করে হসপিটালে আনার সময়টুকুন আমি ভুলে যেতে চাই। মানুষের চাপা গর্জন কি ভয়ানক হয়, মানুষের শরীরের মধ্যে প্রাণটা কিভাবে নেচে বেড়ায় সব যেন স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছিল আমার চোখের সামনে।

ওটির বাইরে অপেক্ষা করতে করতে মার কথা খুব মনে পড়ে। মারও কি এমন কষ্টই হয়েছিল। সব মায়েরই এমন কষ্ট হয়! বাবা কিছুক্ষণ পরপর ফোন করছে। প্রজ্ঞা আন্টি ফোন করছে। ওদের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা প্রকট। কুমকুমকে ওটিতে নেয়ার পর হঠাৎ করে আমি খেয়াল করলাম আমার অস্থিরতা অনেক কমে গেছে। অধিক শোকে পাথর হয়ে যাওয়ার মতো কাছাকাছি একটা অনুভূতি। জীবনের অমূল্য সম্পদ যে একবার হারিয়ে ফেলে সে আর নতুন করে হারানোর ভয় পায় না। তেত্রিশ বছরের জীবনের দ্বিতীয় বছরই যে হারানোর স্থূল বেদনা দিনে দিনে প্রকটভাবে সূক্ষ্ম হয়ে জীবনের সাথে অক্টোপাসের মতো আলিঙ্গন করে আছে সে জীবনে নতুন করে আর হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকার মতো অবস্থা হয় না। ধরে নিতে হয় এটাই নিয়তি। প্রজ্ঞা আন্টির ঘরে আমার আদরের একটা পাখি আছে। আমার ছোট বোন তিতলি। তিতলি কিছুক্ষণ আগে ফোন করে বললো, ভাইয়া গতকাল রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি একটা ছোট্ট পুতুল নূপুর পায়ে টুনটুন শব্দে সারাঘর জুড়ে ছুটোছুটি করছে। আমরা সবাই ওর পিছুপিছু ছুটছি। কিন্তু ওকে ধরতেই পারছি না। ও শুধু খিলখিল করে হাসছে আর ছুটছে। স্বপ্নটা দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু মাকে স্বপ্নের কথা বলার পর মা বললো, আমি নাকি ভালো স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে মানুষ যা দেখে তা নাকি উল্টো হয়। এই তথ্যটা কি সত্যি ভাইয়া?
আমি তিতলির কথার জবাব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ফোন রেখে দেই।

ওরা সবাই অপেক্ষা করে আছে কুমকুমের জন্য। আমাদের দু'জনের সংসারের তৃতীয়জনের জন্যও। আমিও অপেক্ষা করে আছি। কিন্তু ডাক্তার তূর্ণার কথায় কেন জানি সবকিছু দোদুল্যমান হয়ে যাচ্ছে বারবার। আমার খুব ভয় হচ্ছে গল্পটা আমাদের দু'জনের থাকবে তো! নাকি আবার গল্পটা আমার একার হয়ে যায়! কুমকুম কেন যে বুঝতে চাইলো না একার জীবনটা খুব বিষাদের হয়। খুব বেশি বিষণ্ণতায় ভরা!

 এক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব শহিদ বুদ্ধিজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

এক

শহিদ বুদ্ধিজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬-১৯৭১) একটি ইতিহাসের নাম। একটি ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তার যাপিত জীবনের পরিক্রমণ ঘটেছিল। ইতিহাসকে তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি জন্মেছিলেন (২-নভেম্বর) ব্রিটিশ-ভূভারতের তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া মহকুমার রামরাইল গ্রামে। নবীনগর উচ্চবিদ্যালয় (১৯০৪) থেকে কুমিল্লা কলেজ হয়ে কলকাতা রিপন কলেজ (১৯১০) পর্যন্ত নানামুখি বিদ্যায়তনিক পরিম-লে বহুবিধ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাহচার্যে তিনি বিদ্যা লাভ করেছিলেন। অধ্যয়ন সমাপান্তে ফিরে এসেছিলেন জন্মভূমি কুমিল্লায়। বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার মতো একটি মহৎ পেশাকে। কিন্তু সেখানে খুব বেশিদিন নিজেকে সুস্থির রাখতে পারেননি। মূলত শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুভসূচনা হলেও বিদ্যায়তনিক পরিম-লের মধ্যে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র। মহাত্মা গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৮) আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কংগ্রেস রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। মূলত সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ এক জীবনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মধ্যে বহুবিধ মানবিক গুণাবলির সুসমাবেশ ঘটেছিল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী (১৯০৫) আন্দোলন থেকে শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন (১৯২১), ভারত ছাড় (১৯৪২) আন্দোলন পর্যন্ত ব্রিটিশ বিরোধী প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এজন্য বহুবার তার ভাগ্যে জুটেছিল সশ্রম কারাদ-। ভারত ছাড় (১৯৪২) আন্দোলনে কারাভোগ শেষে বাইরে বেরিয়ে এসে দুর্ভিক্ষের দুর্দিনে (১৯৪৩) তিনি নিরন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মূলত দ-াদির মাঝে যখনই সময় পেতেন তখনই দেশ ও দশের সেবায় নিজেকে নিবেদন করতেন। মাঝেমধ্যে আইন পেশায় ফিরে আসতেন। কিন্তু ঐ পেশাটিকেও তিনি সেবায় সমর্পণ করেছিলেন। ফি ছাড়াই তিনি অসহায় দীনদুখী মানুষের পাশে সাহস নিয়ে দাঁড়াতেন। কেবল কর্মজীবনে নয়, অধ্যয়নকালেই তার ব্যক্তিজীবনে এই মানবিক অনুভূতি জেগে উঠেছিল। ছাত্রজীবনে তিনি তৎকালীন ত্রিপুরার ‘হিতসাধনী’ (১৯০৭) সভার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কেবল ব্যক্তিজীবন নয়, সাংগঠনিকভাবেই তিনি সৎ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেন। কেবল নিজেনিজে কিংবা একাএকা নয়, অপরকেও রীতিমত উৎসাহ দিতেন। তার এই উৎসাহ (সৎ-স্বভাব) জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তুমুলভাবে বিদ্যমান ছিল। 


দুই
পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে গমন একেবারে নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু দেশভাগের (১৯৪৭) পূর্বে ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কথা ভেবে অনেকেই দলেদলে পশ্চিমবঙ্গে গমন করে বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তন্মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ ছিল রাজনীতিবিদ, শিল্পী, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ওপারে এঁরা স্বস্বক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষরও রাখে। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জন্মভূমির মায়া ছাড়তে পারেননি, ছাড়তে পারেননি পূর্ববঙ্গের এই জীবন ও জনপদের অতুল আকর্ষণ। রয়ে গেলেন ভাটির দেশ পূর্ববঙ্গেই। সাম্প্রদায়িক সংঘাতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলেও পাকিস্তান সৃষ্টিলগ্নে মুহম্মদ আলি জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮) ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে স্থান দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তার সেই যোগ্যতাও ছিল। কিন্তু সেখানে তার রাজনৈতিক জীবন খুব একটা সুখের হয়নি। বছর পেরুতে না পেরুতেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আসে। পূর্বপাকিস্তানকে তারা উপনিবেশে পরিণত করতে কূটকৌশল আঁটে। প্রথমেই মাতৃভাষার ওপর আঘাত আসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে পাক শাসকরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা (১৯৫২) ঘোষণা করে। পূর্ববঙ্গের প্রায় সমুদয় সদস্য নিশ্চুপ থাকলেও সেদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত চুপ থাকতে পারেননি। স্পষ্টভাষায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি জানিয়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রাণের দাবি সেদিন তিনি একাই উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যায় স্বল্প হওয়ায় সেদিন তার দাবি হালে পানি পায়নি। এদিকে ঢাকার রাজপথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে তরুণেরা মিছিল বের করে। একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) পাক বাহিনীর গুলিতে ছালাম, রফিক, বরকতসহ মিছিলের অনেকেই শহিদ হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই নির্মম হত্যাকা-ের প্রতিবাদে পাকিস্তান গণপরিষদ বর্জন করেছিলেন। সেদিন সঙ্গে পেয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের (উল্লাপাড়া) মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশকে (১৯০০-১৯৮৬)। এসব কারণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর খুশি হতে পারেনি। তার ওপর রাজনৈতিক অবরোধ (এবডো) আরোপ করে (১৯৬০)। পাকভারত যুদ্ধের (১৯৬৫) সময়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধীরেন্দ্রনাথকে আবার বন্দি করে কারাগারে প্রেরণ করে। মূলত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনের একটি বড় অংশ কারাগারে কাটাতে হয়েছে। মানুষের কাছে থাকলে চাইলেও বারবার তাকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তিন
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখব, বেশ বরাবরই তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৩৬ সনে ত্রিপুরা জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচন, কংগ্রেসের টিকিটে কুমিল্লা থেকে ব্রিটিশ শাসনকালে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য (১৯৩৭), পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালে খান আতাউর রহমানের (১৯০৭-১৯৯১) মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। এসময় তিনি স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রির দায়িত্বে ছিলেন। মন্ত্রির দায়িত্বে থাকলেও তিনি নিজের সুযোগ-সুবিধাকে উপেক্ষাই করতেন। এসময় তিনি মিন্টো রোডে মন্ত্রিপাড়ায় সরকারি বাসভবনে থাকতেন। এসময় নাতনি আরমা দত্ত তার বাসাতেই থাকতো, পড়তো ভিকারুনন্নেসা নুন স্কুলে। জানা যায়, বাসায় বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আরমা দত্ত বাসা থেকে হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করতো। সমসাময়িক কিংবা বর্তমানেও কি এমন কোন রাজনীতিবিদ কিংবা আমলা পাওয়া যাবে যারা ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না। নিশ্চয়ই না। বাস্তবিকই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মতো মানবিক মানুষ আজ সমাজে বড়ই বিরল।  

চার
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি জন্মস্থান কুমিল্লাতেই অবস্থান করছিলেন। চাইলেই তিনি অল্পসময়েই সীমান্ত অতিক্রম করে সপরিবারে আগরতলায় উঠতে পারতেন। ঐ পথে তো লক্ষলক্ষ শরণার্থী আগরতলা হয়ে কলকাতায় গিয়েছে। কিন্তু তিনি যাননি। বিপদের সময়ে হয়তোবা জন্মভূমিকে একা ছেড়ে যেতে চাননি, ছেড়ে যেতে চাননি দেশ ও দেশের মানুষকে। এই মোহমায়াই তার জীবনে নিদারুণ পরিণতি ডেকে আনে। ২৯ মার্চ ময়নামতি সেনানিবাস থেকে  ক্যাপ্টেন নাসিম মালিক ও ক্যাপ্টেন আগা বোখারিসহ কতিপয় সেনাসদস্য যমের মতো গভীর রাতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাসায় হানা দেয়। বাসার আসবাবপত্র ভাংচুর করার সঙ্গেসঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে বন্দি করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সঙ্গে কনিষ্ঠ পুত্র দীলিপ দত্তকেও (১৯২৬-১৯৭১)। পিতাপুত্র আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারেনি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সেই সুযোগ দেয়নি। বন্দি অবস্থায় ময়মামতি ক্যানস্টমেন্ট স্কুলে ধীরেন্দ্রনাথের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ক্যান্টনমেন্টের ক্ষৌরকার রমণীমোহন শীল এই নির্যাতন কিছুটা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তার বর্ণনা পড়লে হৃদয় কেঁপে ওঠে। এসময় তার বয়স ছিল প্রায় পঁচাশির কাছাকাছি। এমন অশীতির বৃদ্ধের প্রতিও সামরিক জান্তার এতটুকু মায়া হয়নি। অবশেষে ১৪ এপ্রিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শহিদ হন। স্বাধীনতা স্বচোক্ষে দেখে যেতে না পারলেও স্বাধীনতার বীজ মূলত ধীরেন্দ্রনাথের মতো কিছু দেশপ্রেমিকের হাতেই রোপিত হয়েছিল।  শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবিনশ্বর আত্মার শান্তি কামনা করছি।      

লেখক: মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজাদপুর সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ

১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলার প্রস্তাব বাংলা একাডেমির

বইমেলার স্টলে বই পড়ছে দুই কিশোরী। ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক: অমর একুশে বইমেলা ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত শর্ত সাপেক্ষে করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলা একাডেমি।

আজ মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির বইমেলা আয়োজক কমিটির এক সভায় এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এটি এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব আকারে পাঠানো হবে। তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

বইমেলা আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব জালাল আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জালাল আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানা ও টিকা নেওয়ার শর্তে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বইমেলা আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরুর কথা থাকলেও গত ১৬ জানুয়ারি তা দুই সপ্তাহের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়।

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক আর নেই

 হাসান আজিজুল হক। ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

আজ সোমবার রাত নয়টায় রাজশাহী শহরে নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মলয় ভৌমিক  এ তথ্য জানিয়েছেন।

হাসান আজিজুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি করে গেছেন। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

৮২ বছর বয়সী হাসান আজিজুল হক বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। গত ২১ আগস্ট এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) দুই সপ্তাহের বেশি সময় চিকিৎসা নেন তিনি। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে রাজশাহীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

গত ১৬ আগস্ট হাসান আজিজুল হকের ছেলে ইমতিয়াজ হাসানের একটি ফেসবুক পোস্টে তাঁর বাবার অসুস্থতার কথা প্রথম জানা যায়। সে সময় পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছিল, হাসান আজিজুল হক অসুস্থ হয়ে প্রায় এক মাস বাসায় ছিলেন। করোনার কারণে বাসায় রেখেই চলছিল তাঁর চিকিৎসা।

বার্ধক্যজনিত সমস্যা ছাড়াও আগে থেকেই তাঁর হার্টে সমস্যা, ডায়াবেটিস ছিল। তাঁর শরীরে লবণের ঘাটতিও ছিল। করোনার কারণে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শমতো বাড়িতেই তাঁর চিকিৎসা চলছিল। তিনি একবার পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তাঁকে ঢাকায় আনা হয়েছিল।

হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন।

এর পর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে নগরের চৌদ্দপায় আবাসিক এলাকায় বসবাস করতেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য হাসান আজিজুল হক ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। ২০১৯ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

কবি শঙ্খ ঘোষ আর নেই

 

 কবি শঙ্খ ঘোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ আর নেই। আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কলকাতার নিজের বাসায় ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই সঙ্গে বাংলা কবিতার এক যুগের অবসান, বাংলা সাহিত্যের এক যুগের অবসান হলো।

এমনিতেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন কবি। কয়েক মাস ধরে নানা শারীরিক নানা সমস্যায় কাতর ছিলেন। গত ২১ জানুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালেও ছিলেন কয়েক দিন। বাসায় ফিরে চিকিৎসার মধ্যেই ছিলেন। এই আবহে কিছুদিন আগে জ্বর আসে শঙ্খ ঘোষের। সঙ্গে পেটের সমস্যা দেখা দেয়। এরপর তাঁর করোনা টেস্ট করা হয়। ১৪ এপ্রিল বিকেলে রিপোর্ট এলে জানা যায়, তিনি সংক্রমিত হয়েছেন। তাই কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ঝুঁকি না নিয়ে বাড়িতেই আইসোলেশনে ছিলেন। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ক্রমেই তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমছিল। একসময় তাঁকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন কবি। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ভেন্টিলেটর খুলে নেওয়া হয়।

ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, কবির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজে শঙ্খ ঘোষের ছোট মেয়েকে ফোন করে সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রচারসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শঙ্খ ঘোষ কোভিডে আক্রান্ত হলেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য হবে। তবে কবি নিজে আড়ম্বর পছন্দ করতেন না বলে গানস্যালুটের আয়োজন থাকবে না।

শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার বাবা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মা অমলা ঘোষ। ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুর জেলায় তাঁর জন্ম। বংশানুক্রমিকভাবে পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়ায়। তবে শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন পাবনায়। বাবার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনে শঙ্খ ঘোষ যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা ভূমিকায় দেখা গেছে কবিকে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতীর মতো প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনাও করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব আইওয়ায় ‘রাইটার্স ওয়ার্কশপ’-এও শামিল হন। তাঁর সাহিত্য সাধনা এবং জীবনযাপনের মধ্যে বারবার প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রাজনৈতিক সত্তা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে বারবার তাঁকে কলম ধরতে দেখা গেছে। প্রতিবাদ জানিয়েছেন নিজের মতো করে। ‘মাটি’ নামের একটি কবিতায় নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

বাংলা কবিতার জগতে শঙ্খ ঘোষের অবদান অপরিসীম। ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসেবেও তাঁর নামডাক ছিল। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। ‘শব্দ আর সত্য’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘এখন সব অলীক’ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ। তাঁর লেখা ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, ‘জন্মদিনে’, ‘আড়ালে’, ‘সবিনয়ে নিবেদন’, ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’ বছরের পর বছর দুই বাংলায় চর্চিত, জনপ্রিয়।

২০১৯ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে রের হয় ‘সন্ধ্যানদীর জলে: বাংলাদেশ’। ‘সন্ধ্যানদীর জলে’ বইটি মূলত বাংলাদেশ প্রসঙ্গেই নানান সময়ে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা, ভ্রমণপঞ্জি ও অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণময় লেখাগুচ্ছের সংকলন। ‘একুশে, একাত্তর ও নববর্ষ’, ‘ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান’, ‘গানের ভিতর দিয়ে’, ‘শিক্ষা আন্দোলন’ ও ‘স্মৃতি, ভ্রমণ’—এই পাঁচটি পর্বে বিভক্ত হয়েছে বইটি।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে একাধিক সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটি অনুবাদ করেও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতীর দ্বারা দেশিকোত্তম সম্মানে এবং ২০১১ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন শঙ্খ ঘোষ।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন