এক
শহিদ বুদ্ধিজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬-১৯৭১) একটি ইতিহাসের নাম। একটি ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তার যাপিত জীবনের পরিক্রমণ ঘটেছিল। ইতিহাসকে তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি জন্মেছিলেন (২-নভেম্বর) ব্রিটিশ-ভূভারতের তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া মহকুমার রামরাইল গ্রামে। নবীনগর উচ্চবিদ্যালয় (১৯০৪) থেকে কুমিল্লা কলেজ হয়ে কলকাতা রিপন কলেজ (১৯১০) পর্যন্ত নানামুখি বিদ্যায়তনিক পরিম-লে বহুবিধ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাহচার্যে তিনি বিদ্যা লাভ করেছিলেন। অধ্যয়ন সমাপান্তে ফিরে এসেছিলেন জন্মভূমি কুমিল্লায়। বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার মতো একটি মহৎ পেশাকে। কিন্তু সেখানে খুব বেশিদিন নিজেকে সুস্থির রাখতে পারেননি। মূলত শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুভসূচনা হলেও বিদ্যায়তনিক পরিম-লের মধ্যে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র। মহাত্মা গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৮) আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কংগ্রেস রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। মূলত সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ এক জীবনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মধ্যে বহুবিধ মানবিক গুণাবলির সুসমাবেশ ঘটেছিল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী (১৯০৫) আন্দোলন থেকে শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন (১৯২১), ভারত ছাড় (১৯৪২) আন্দোলন পর্যন্ত ব্রিটিশ বিরোধী প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এজন্য বহুবার তার ভাগ্যে জুটেছিল সশ্রম কারাদ-। ভারত ছাড় (১৯৪২) আন্দোলনে কারাভোগ শেষে বাইরে বেরিয়ে এসে দুর্ভিক্ষের দুর্দিনে (১৯৪৩) তিনি নিরন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মূলত দ-াদির মাঝে যখনই সময় পেতেন তখনই দেশ ও দশের সেবায় নিজেকে নিবেদন করতেন। মাঝেমধ্যে আইন পেশায় ফিরে আসতেন। কিন্তু ঐ পেশাটিকেও তিনি সেবায় সমর্পণ করেছিলেন। ফি ছাড়াই তিনি অসহায় দীনদুখী মানুষের পাশে সাহস নিয়ে দাঁড়াতেন। কেবল কর্মজীবনে নয়, অধ্যয়নকালেই তার ব্যক্তিজীবনে এই মানবিক অনুভূতি জেগে উঠেছিল। ছাত্রজীবনে তিনি তৎকালীন ত্রিপুরার ‘হিতসাধনী’ (১৯০৭) সভার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কেবল ব্যক্তিজীবন নয়, সাংগঠনিকভাবেই তিনি সৎ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেন। কেবল নিজেনিজে কিংবা একাএকা নয়, অপরকেও রীতিমত উৎসাহ দিতেন। তার এই উৎসাহ (সৎ-স্বভাব) জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তুমুলভাবে বিদ্যমান ছিল।
দুই
পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে গমন একেবারে নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু দেশভাগের (১৯৪৭) পূর্বে ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কথা ভেবে অনেকেই দলেদলে পশ্চিমবঙ্গে গমন করে বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তন্মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ ছিল রাজনীতিবিদ, শিল্পী, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ওপারে এঁরা স্বস্বক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষরও রাখে। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জন্মভূমির মায়া ছাড়তে পারেননি, ছাড়তে পারেননি পূর্ববঙ্গের এই জীবন ও জনপদের অতুল আকর্ষণ। রয়ে গেলেন ভাটির দেশ পূর্ববঙ্গেই। সাম্প্রদায়িক সংঘাতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলেও পাকিস্তান সৃষ্টিলগ্নে মুহম্মদ আলি জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮) ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে স্থান দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তার সেই যোগ্যতাও ছিল। কিন্তু সেখানে তার রাজনৈতিক জীবন খুব একটা সুখের হয়নি। বছর পেরুতে না পেরুতেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আসে। পূর্বপাকিস্তানকে তারা উপনিবেশে পরিণত করতে কূটকৌশল আঁটে। প্রথমেই মাতৃভাষার ওপর আঘাত আসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে পাক শাসকরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা (১৯৫২) ঘোষণা করে। পূর্ববঙ্গের প্রায় সমুদয় সদস্য নিশ্চুপ থাকলেও সেদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত চুপ থাকতে পারেননি। স্পষ্টভাষায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি জানিয়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রাণের দাবি সেদিন তিনি একাই উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যায় স্বল্প হওয়ায় সেদিন তার দাবি হালে পানি পায়নি। এদিকে ঢাকার রাজপথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে তরুণেরা মিছিল বের করে। একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) পাক বাহিনীর গুলিতে ছালাম, রফিক, বরকতসহ মিছিলের অনেকেই শহিদ হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই নির্মম হত্যাকা-ের প্রতিবাদে পাকিস্তান গণপরিষদ বর্জন করেছিলেন। সেদিন সঙ্গে পেয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের (উল্লাপাড়া) মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশকে (১৯০০-১৯৮৬)। এসব কারণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর খুশি হতে পারেনি। তার ওপর রাজনৈতিক অবরোধ (এবডো) আরোপ করে (১৯৬০)। পাকভারত যুদ্ধের (১৯৬৫) সময়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধীরেন্দ্রনাথকে আবার বন্দি করে কারাগারে প্রেরণ করে। মূলত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনের একটি বড় অংশ কারাগারে কাটাতে হয়েছে। মানুষের কাছে থাকলে চাইলেও বারবার তাকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
তিন
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখব, বেশ বরাবরই তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৩৬ সনে ত্রিপুরা জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচন, কংগ্রেসের টিকিটে কুমিল্লা থেকে ব্রিটিশ শাসনকালে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য (১৯৩৭), পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালে খান আতাউর রহমানের (১৯০৭-১৯৯১) মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। এসময় তিনি স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রির দায়িত্বে ছিলেন। মন্ত্রির দায়িত্বে থাকলেও তিনি নিজের সুযোগ-সুবিধাকে উপেক্ষাই করতেন। এসময় তিনি মিন্টো রোডে মন্ত্রিপাড়ায় সরকারি বাসভবনে থাকতেন। এসময় নাতনি আরমা দত্ত তার বাসাতেই থাকতো, পড়তো ভিকারুনন্নেসা নুন স্কুলে। জানা যায়, বাসায় বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আরমা দত্ত বাসা থেকে হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করতো। সমসাময়িক কিংবা বর্তমানেও কি এমন কোন রাজনীতিবিদ কিংবা আমলা পাওয়া যাবে যারা ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না। নিশ্চয়ই না। বাস্তবিকই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মতো মানবিক মানুষ আজ সমাজে বড়ই বিরল।
চার
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি জন্মস্থান কুমিল্লাতেই অবস্থান করছিলেন। চাইলেই তিনি অল্পসময়েই সীমান্ত অতিক্রম করে সপরিবারে আগরতলায় উঠতে পারতেন। ঐ পথে তো লক্ষলক্ষ শরণার্থী আগরতলা হয়ে কলকাতায় গিয়েছে। কিন্তু তিনি যাননি। বিপদের সময়ে হয়তোবা জন্মভূমিকে একা ছেড়ে যেতে চাননি, ছেড়ে যেতে চাননি দেশ ও দেশের মানুষকে। এই মোহমায়াই তার জীবনে নিদারুণ পরিণতি ডেকে আনে। ২৯ মার্চ ময়নামতি সেনানিবাস থেকে ক্যাপ্টেন নাসিম মালিক ও ক্যাপ্টেন আগা বোখারিসহ কতিপয় সেনাসদস্য যমের মতো গভীর রাতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাসায় হানা দেয়। বাসার আসবাবপত্র ভাংচুর করার সঙ্গেসঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে বন্দি করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সঙ্গে কনিষ্ঠ পুত্র দীলিপ দত্তকেও (১৯২৬-১৯৭১)। পিতাপুত্র আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারেনি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সেই সুযোগ দেয়নি। বন্দি অবস্থায় ময়মামতি ক্যানস্টমেন্ট স্কুলে ধীরেন্দ্রনাথের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ক্যান্টনমেন্টের ক্ষৌরকার রমণীমোহন শীল এই নির্যাতন কিছুটা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তার বর্ণনা পড়লে হৃদয় কেঁপে ওঠে। এসময় তার বয়স ছিল প্রায় পঁচাশির কাছাকাছি। এমন অশীতির বৃদ্ধের প্রতিও সামরিক জান্তার এতটুকু মায়া হয়নি। অবশেষে ১৪ এপ্রিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শহিদ হন। স্বাধীনতা স্বচোক্ষে দেখে যেতে না পারলেও স্বাধীনতার বীজ মূলত ধীরেন্দ্রনাথের মতো কিছু দেশপ্রেমিকের হাতেই রোপিত হয়েছিল। শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবিনশ্বর আত্মার শান্তি কামনা করছি।
লেখক: মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজাদপুর সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ

