নিজস্ব প্রতিবেদক: কামরুল হাসান (১৯২১–১৯৮৮) ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যতম পথিকৃৎ, যিনি তাঁর চিত্রকর্মে লোকজ উপাদান আর গভীর দেশপ্রেমের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাঁকে "পটের রাজা" বলা হয়, কারণ তাঁর চিত্রকর্মে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যের প্রতিফলন গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, গ্রাফিক ডিজাইনার, এবং সমাজসচেতন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অগ্রণী যোদ্ধা।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
কামরুল হাসানের জন্ম ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর, ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটেছিল। কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্ট থেকে তিনি চিত্রকলার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি আধুনিক শিল্পের পাশাপাশিই বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে গভীরভাবে অনুধাবন করেন।
কর্মজীবন ও অবদান
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ, কৃষক, জেলে, নারী এবং প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি তাঁর চিত্রকর্মের প্রধান উপজীব্য। তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রঙের ব্যবহারের সহজাত গুণ এবং অঙ্কনের সাবলীলতা। বিশেষত তাঁর পটচিত্র শৈলী বাংলার লোকশিল্পকে আধুনিক শিল্পকলার সাথে সংযুক্ত করেছে। কামরুল হাসান ঢাকা আর্ট কলেজের (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন এবং সেখানে শিক্ষকতা করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কামরুল হাসান তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে বাঙালির সংগ্রামের চেতনাকে জাগ্রত করেছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টি “এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে” পোস্টারটি মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং মুক্তিকামী জনতাকে উদ্বুদ্ধ করে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
কামরুল হাসান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশ সরকারের শিল্পকলার সর্বোচ্চ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।
ব্যক্তিগত জীবন
সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী কামরুল হাসান ছিলেন এক দৃঢ়চেতা দেশপ্রেমিক। তিনি শিল্পের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য আজীবন কাজ করেছেন।
মৃত্যু
১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, একটি জাতীয় সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তি ছিল, “আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু তোমরা আমার দেশটাকে ভালো করে গড়ে তুলবে।”
কামরুল হাসান শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির এক চিরঞ্জীব প্রেরণা। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও বাংলার মাটির গন্ধ বহন করে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সৃজনশীলতার মশাল জ্বালিয়ে রাখছে।
শিল্পী কামরুল হাসানের জীবনী
এই সময়ে
শনিবার, ডিসেম্বর ০৭, ২০২৪
.jpg)
