অনিয়ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনিয়ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঈশ্বরদীতে ১৫ বছর একই পদে পৌর নির্বাহী, অভিযোগের শেষ নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: নিরবচ্ছিন্ন ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মকর্তাদের তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে না রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ঈশ্বরদী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, জহুরুল ইসলাম ২০১১ সালে ঈশ্বরদী পৌরসভার সচিব হিসেবে যোগ দেন। তবে স্থানীয় সূত্র ও কার্যালয়ের নথিতে তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একই স্থানে থাকার তথ্য পাওয়া যায়, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি চাকরিবিধি ও নীতিমালায় তিন বছরের বেশি একই স্থানে পদায়নের সুযোগ না থাকলেও একজন কর্মকর্তা কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, তা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি ঈশ্বরদীর প্রয়াত আলহাজ্ব আবুল মনসুর খান স্টেডিয়ামে খেলাধুলা বন্ধ রেখে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাঠ ভাড়া দিয়েছিলেন। সেখানে নির্মাণসামগ্রী রাখার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি অরণকোলা পশুর হাটের জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরিতে তাঁর যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া 'স্মার্ট প্রকল্প' চালুর নামে নাগরিকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০০ টাকা আদায় করেও সেবা না দেওয়া, অযৌক্তিকভাবে পৌরকর বৃদ্ধি এবং পৌর ট্রাক টার্মিনালের ময়লার ভাগাড় ভরাটের মাটি রাতের আঁধারে বিক্রির ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তার দাবি, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় এবং প্রভাবশালীদদের নিজের পক্ষে রেখে তিনি পদে টিকে আছেন। এমনকি পৌরসভার বিলাসবহুল গাড়িও তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব দুর্নীতির তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৪ জুন পাবনা জেলা সমন্বিত দুর্নীতি দমন কমিশন পৌরসভা কার্যালয়ে দিনভর অভিযান চালায়। প্রাথমিক তদন্তে পৌরসভার বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন অভিযান পরিচালনাকারী দল।

পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার কারণে জহুরুল ইসলামের প্রভাব ও কর্তৃত্ব বেড়েছে। তাঁদের দাবি, পৌরসভার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়টি প্রশাসনের গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত বলেও তাঁরা মনে করেন।

ঈশ্বরদীর কয়েকজন পৌরবাসীও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মকর্তা একই পদে থাকায় পৌরসভার সেবা ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, পৌরসভার বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বদলি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।

পাবনা জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরদী পৌরসভার নিয়মবহির্ভূতভাবে জমি হস্তান্তর করা ও দুর্নীতিসহ তাঁর বিরুদ্ধে ৮-১০ টি মামলা হয়েছে। আরও ৩-৪টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পৌরবাসীর ভাষ্য, নাগরিকদের কাছ থেকে কর ও বিভিন্ন সেবার জন্য অর্থ নেওয়া হলে তার বিনিময়ে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পৌরসভার উন্নয়নকাজ, কর নির্ধারণ এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, একই পদে দীর্ঘদিন থাকলে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। বদলির সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব জানান, একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন কীভাবে এক স্থানে রয়েছেন, তা অনুসন্ধান করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জহুরুল ইসলাম জানান, নিজের ইচ্ছায় তিনি একই কর্মস্থলে চাকরি করছেন না। কর্তৃপক্ষ বদলির আদেশ দেয়নি, তাই তিনি রয়েছেন।

ঈশ্বরদীতে টাকা দিলেই সেবা মেলে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র, সংশোধন এবং ভোটার স্থানান্তরের কাজে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিটি সেবার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নানা অজুহাতে সেবা প্রার্থীদের হয়রানি করা হয় এবং তাদের দিনের পর দিন আসতে হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজ দেরিতে সম্পন্ন হওয়ায় পাসপোর্ট, চাকরি এবং অন্যান্য জরুরি কাজে অনেকেই বিপাকে পড়ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাচন অফিসের দফতরি (পিয়ন) শওকত আলী স্থানীয় কয়েকটি কম্পিউটার দোকানের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম পরিচালনার নামে অর্থ আদায় করছেন বলে দাবি উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এসব দোকানে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দিলে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, সংশোধন কিংবা ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মতো কাজ সহজেই সম্পন্ন হচ্ছে। অথচ এসব সেবার জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত কোনো ফি নেই। অভিযোগ রয়েছে, কেউ যদি অর্থ না দেন, তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলেও নানা অজুহাতে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হচ্ছে সেবাপ্রার্থীদের।

জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে আসা সাহাপুর ইউনিয়ন তিলকপুর এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘এক কাজের জন্য কয়েকবার নির্বাচন অফিসে আসতে হচ্ছে। এখানে গজিয়ে উঠেছে দালালের সিন্ডিকেট। দালালদের টাকা দিলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজ হয়ে যায়। যারা দালালের সাহায্য নিচ্ছে না বা টাকা দিচ্ছে না তাদের ঘুরতে হচ্ছে মাসের পর মাস।’

পৌরসভার পূর্বটেংরী এলাকার বাসিন্দা নাইম উদ্দিন বলেন, ‘জন্মনিবন্ধনের সমস্যা আছে বলে আমার এক আত্মীয়ের কাছে নতুন ভোটার করার জন্য ৬ হাজার টাকা চেয়েছে শওকত আলী। টাকা না দেওয়ায় কাজ আর হয়নি।’ 

দিয়াড় বাঘইল এলাকার বাসিন্দা শিপন বেপারি বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে ভোটার হওয়ার জন্য আইডি কার্ড করতে শওকত আলী ৩ হাজার টাকা চেয়েছে। টাকা দিতে পারিনি বলে কাজ স্থগিত রয়েছে।’

উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের দফতরি শওকত আলী অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো মিথ্যা। আমি এমন কিছু করি না। অফিসের অন্য কেউ এসবের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।’

উপজেলার আশপাশের কিছু কম্পিউটার দোকানে চুক্তির মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কারও সঙ্গে কোনো চুক্তি করিনি। চাইলে আপনারা যাচাই করে দেখতে পারেন।’ এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আশরাফুল হক বলেন, ‘এমন কোনো অভিযোগ পাইনি। তাই এসব বিষয়ে অবগত নই। আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। বিষয়টি নজরে থাকবে।’

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন