নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগে গতি আনা এবং পণ্য পরিবহন সহজ করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পরিকল্পনা গ্রহণের এক যুগ পার হলেও প্রকল্পটির দৃশ্যমান ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখন প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৮২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ১৪ হাজার ২৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকার এই প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা রয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ৪০৮ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের খুব সামান্য অংশ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের বাস্তবায়নে শুরু থেকেই গতি মেলেনি। প্রথমে চীন সরকারের অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ২০২১ সালে তা বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এতে অর্থায়নে রাজি হয়। অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের কারণে নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশার কাজ শুরু করতে হয়, যা প্রকল্পটিকে দীর্ঘ মেয়াদে স্থবির করে ফেলে।
চলতি বছরের ২৭ জুন জাইকার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চূড়ান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর অধীনে জাইকা ৬ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা (৯২ হাজার ৭৭ মিলিয়ন ইয়েন) দেবে। বর্তমানে জাইকার অধীনে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে, যা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মনিরুল ইসলাম ফিরোজী জানান, অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই বিলম্ব। নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, আগের প্রাক্কলনটি ছিল কয়েক বছর আগের দর অনুযায়ী। ইতোমধ্যে ডলারের দাম ও উপকরণের মান নির্ধারিত মানদণ্ডে পরিবর্তন এসেছে। বিস্তারিত নকশার পর নতুন বাজারদর অনুযায়ী সংশোধিত ডিপিপি (আরডিপিপি) তৈরি করা হবে।
জাপানি পরামর্শকদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের চেয়ে ৮২ শতাংশ বেশি।
প্রকল্পের আওতায় ১৬২ কিলোমিটার মূল রেললাইন, প্রায় ২৫ কিলোমিটার লুপ লাইন এবং ১১ কিলোমিটারের বেশি বিদ্যমান লাইন পুনর্নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৬৬টি বড় সেতু, ১৩৮টি ছোট সেতু ও ৩টি রোড ওভারব্রিজ তৈরি করা হবে। একটি নতুন স্টেশন নির্মাণসহ মোট ৪২টি স্টেশনের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ৭১৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ, ২,৯৯১টি পরিবার পুনর্বাসন এবং প্রায় ৭৫ হাজার গাছ কাটার প্রয়োজন হবে। তবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যাপকভাবে বিকল্প বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমানে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী একক (সিঙ্গেল) লাইনে দিনে ২৫টি ট্রেন চালানোর সক্ষমতা থাকলেও বাধ্য হয়ে ৩৬টি ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। প্রকল্পটি শেষ হলে দৈনিক ৫৬টি ট্রেন চালানো সম্ভব হবে এবং ঢাকা থেকে ভ্রমণের সময় ৬ ঘণ্টা থেকে কমে প্রায় ৪ ঘণ্টায় নামবে। পাশাপাশি যমুনা রেলসেতুর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারের জন্যও এই রুটটি অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “এই করিডোরটি বর্তমানে একটি বড় ‘বটলনেক’ বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কনটেইনার পরিবহন সহজ হবে এবং রেলের রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারলে ব্যয় আরও বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।”
তিনি আরও মনে করেন, শুধুমাত্র অর্থায়ন বদল নয়—পরিকল্পনার ত্রুটি এবং বড় প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবলের অভাবও এই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণকাজ শেষ করাই এখন রেলওয়ের মূল চ্যালেঞ্জ।
