মোখার চোখরাঙানি মনে করিয়ে দিচ্ছে ভয়াল সেই রাতের কথা

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত এলাকার একটি চিত্র। ছবি: ইন্টারনেট

নিজস্ব প্রতিবেদক: অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ কক্সবাজার উপকূলের আরও কাছে চলে এসেছে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলের মানুষজন ছুটছেন আশ্রয়ের খোঁজে।

মোখার এই চোখরাঙানি মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী সেই ঘূর্ণিঝড়ের কথা। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে হারিকেনের শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়। ভয়াল সেই রাতে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ। প্রায় ১ কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারান। মানুষের পাশাপাশি অগণিত গবাদি পশুও মারা যায়।

প্রলয়ঙ্করী সেই ঘূর্ণিঝড় এবং ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী বিপর্যয়ের কথা আজও ভুলতে পারেন না ষাটোর্ধ্ব আব্দুল করিম। পাবনার বাসিন্দা হলেও সে সময় কর্মসূত্রে তিনি ছিলেন পতেঙ্গাসংলগ্ন বিমানবন্দর এলাকায়।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালের সেই ২৯ এপ্রিল সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। দুপুরের দিকে বৃষ্টির তোড় কিছুটা বাড়ে। সঙ্গে শুরু হয় বাতাস। বিকেলে আমি একবার পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টির কারণে পারিনি। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হয় দমকা বাতাস। রাত ৮-৯টার দিকে শুরু হয় ভয়াবহ তাণ্ডব। আমি থাকতাম দোতলা একটি ভবনে। প্রবল বাতাসে আমার ঘরের একটি জানালা খুলে যায়। কিন্তু বাতাসের বেগ এতো বেশি ছিল যে ভোরের আগে সেই জানালা আর বন্ধ করতে পারিনি।’

দোতলায় থাকার কারণে সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বলে জানান আব্দুল করিম। তবে বিপদ সংকেত আমলে না নেয়ায় সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন ওই ভবনের নিচতলার কয়েকজন বাসিন্দা।

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে আব্দুল করিম জানান, দুয়েকদিন আগে থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের কথা প্রচার করা হচ্ছিল রেডিও ও টেলিভিশনে। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের কথা ঘোষণা দিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছিল। এছাড়া স্থানীয় সরকারি,বেসরকারি সংস্থা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করে মাইকিং করা হচ্ছিল। কিন্তু অনেকেই সেই সতর্কবার্তা আমলে নেননি বলে জানান আব্দুল করিম।

তিনি বলেন, আমি যে ভবনটিতে থাকতাম সেটির নিচতলায় আমার একজন বন্ধু থাকতেন। সন্ধ্যায় আবহাওয়ার পরিস্থিতি দেখে তাকে আমার সঙ্গে দোতলায় এসে থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। ও তেমন পাত্তা না দিয়ে বলেছিল, এমন সতর্ক সংকেত তো আগেও কত দিয়েছে কিছু হবে না। আমি একাই আমার রুমে চলে এলাম। রাতে যখন প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলো তখন আর নিচে নামার অবস্থা ছিল না। তখনো জানি না যে ২০/২৫ ফুট উঁচু ঢেউ এসে তছনছ করে দিয়েছে সব। আচমকা আসা ঢেউয়ের তোড় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে আমার বন্ধুকে। সেদিন আমাদের ভবনের নিচতলার বাসিন্দারা কেউ আর বাঁচতে পারেনি।

ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ভোর ৪/৫টার দিকে ভাটা শুরুর পর ঝড়ের গতিবেগ কিছুটা কমে। জোয়ারের পানিও নেমে যায়। তবে তখনও বৃষ্টি হচ্ছিল। দোতলায় থাকা আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই কোমর পানি ঠেলে নিচে নামি। ভোরের সেই আলোতে সেদিন যে দৃশ্য দেখেছি তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমাদের পাশ দিয়ে মানুষ আর গরুর মরদেহ ভেসে যেতে দেখেছি।’

ঘূর্ণিঝড়ের পর খাদ্য ও পানির সংকট দেখা দিয়েছিল জানিয়ে আব্দুল করিম আরও বলেন, ‘তিনদিন শুধু সঙ্গে থাকা আম আর চিড়া খেয়ে ছিলাম।’

জলোচ্ছ্বাসের পানি নেমে যাওয়ার পর মানুষ আর গবাদি পশুর মরদেহগুলো পচে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলেও স্মৃতি হাতড়ে জানান তিনি। স্মরণ করেন গাছের ডালে মরদেহ আটকে থাকতে দেখার ভয়াবহ স্মৃতি।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় নিহতের সংখ্যা বিচারে স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে একটি। ওই ঝড়ের সময় জোয়ার মিলে যাওয়ায় তা এতো ভয়ংকর রূপ নেয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এছাড়া ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘূর্ণিঝড়’ খ্যাত ১৯৭০–এর ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশে তেমন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানেনি। তাই উপকূলীয় জনগণ বিপদ সংকেতকে তেমন আমলে নেয়নি। আর সে সময় জোয়ারের কারণে ঢেউয়ের তোড়ে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। এছাড়া সে সময় উপকূলীয় এলাকার দুর্বল গৃহকাঠামোও ছিল ব্যাপক প্রাণহানির অন্যতম কারণ।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন