অর্কিডে সুরম্য প্রাঙ্গণ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়ে আসা নতুন জাতের লেটোরিয়েইট ডেনড্রোবিয়াম অর্কিড। ছবি: লেখক

মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক: প্রকৃতিতে অধিকাংশ অর্কিডের প্রিয় আবাস পরিণত কোনো বৃক্ষ। প্রাকৃতিক বনে সাধারণত বিক্ষিপ্তভাবেই এদের দেখা মেলে। তবে বিক্ষিপ্ত হলেও এদের নান্দনিক উপস্থিতি ক্ষণিকের জন্য হলেও মুগ্ধতা তৈরি করে। দেশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো অজস্র অর্কিডের মধ্যে অধিকাংশই এখন বিপন্ন। মূলত ইউরোপীয়দের হাত ধরেই এই বনসুন্দরীরা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় অর্কিড চাষ অভিজাত ও শৌখিনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এখন তা মধ্যবিত্তদের শখের জগতেও স্থান করে নিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে এর চাষ ও চর্চা বহুগুণ বেড়েছে। নজরকাড়া সৌন্দর্যের কারণে অর্কিডের প্রতি আমাদের আকর্ষণ সহজাত। এ কারণে সারা বিশ্বে শৌখিন অর্কিডপ্রেমীর সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছরই লন্ডনের বিখ্যাত কিউ বোটানিক গার্ডেনে আলাদা করে অর্কিড প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ইউরোপ-আমেরিকার বড় উদ্যানগুলোতে রংবাহারী অর্কিডের জৌলুশ দেখেছি। আমাদের দেশেও অনেক শৌখিন অর্কিড সংগ্রাহক আছেন। এমনই একজন অর্কিডপ্রেমী সালমা বিনতে নূর, যিনি তাঁর শখের উদ্ভিদগুলোর সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন জীবনের দীর্ঘ সময়, সময়ের হিসাবে যা ২৫ বছরের বেশি। অর্কিড সংগ্রহ ও লালন তাঁর প্রধান আগ্রহ হলেও বিচিত্র বর্ণের দেশি-বিদেশি দুর্লভ লিলি এবং নানান রঙের অ্যাডেনিয়ামও রয়েছে সংগ্রহে।

সম্প্রতি তাঁর ধানমন্ডির বাসায় গিয়ে চারটি বারান্দাজুড়েই অর্কিড এবং অন্য উদ্ভিদের সমারোহ দেখা গেল। অর্কিড প্রকৃতিতে যদিও অবিন্যস্ত অবস্থায় থাকে কিন্তু এই বারান্দা-বাগানে বেশ জম্পেশ আয়োজন করেই রাখা হয়েছে ওদের। বসানো হয়েছে আলাদা একটি কাঠামো। তাতে থরে থরে সাজানো হয়েছে অর্কিডগুলো। প্রস্ফুটন মৌসুমে বিচিত্র ফুলের অজস্র পাপড়ি রঙিন প্রজাপতির মতো ভেসে থাকে। সবচেয়ে বড় সুবিধা, দীর্ঘ সময় ধরে ফুলগুলো ফুটতে থাকে। এক জাতের ফুল ফোটা শেষ হলে অন্য জাতের ফুল ফুটতে শুরু করে। ফলে এই অর্কিডের বাগান একেবারেই বিবর্ণ ও শ্রীহীন হয়ে ওঠে না। সব মিলিয়ে এই বাগানে প্রায় ৫০ জাতের দেড় শতাধিক অর্কিড রয়েছে। তার মধ্যে ক্যাটালিয়া জাতের বর্ণাঢ্য রঙের ফুলগুলো বেশ নজরকাড়া। বাগানে রং ছড়ানো ডেনড্রোবিয়াম পারিশিও উল্লেখ করার মতো। এ ছাড়া ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়ে আসা হোয়াইট লেটোরিয়েইট ডেনড্রোবিয়ামসহ, ফালায়েনোপসিস, প্রাইমোরসা, মিনি ডেনড্রোবিয়াম, ডেনড্রোবিয়াম হিরোশি, ডেনড্রোবিয়াম রেব্বিট হোয়াইট, ডেনড্রোবিয়াম ডার্ক অরেঞ্জ, ডেনড্রোবিয়াম ট্রিসারা, ব্রাসোকেট, পারপল টুইস্ট, পিঙ্ক লেডি সপ্ল্যাশ, লাইট পারপল, ব্ল্যাক ক্যাট, এপিডেনড্রোবিয়াম, ডেন্সিফ্লোরাম ইত্যাদি জাতের অর্কিড বাগানজুড়ে রঙের পসরা সাজিয়েছে। জনপ্রিয় দেশি জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ফক্সটেইল, অ্যারিড, ডেনড্রোবিয়াম, ক্যাটলিয়া, ভ্যান্ডা, লেডি স্লিপার ইত্যাদি।

অর্কিড ছাড়াও প্রায় ৬০ রকম দেশি-বিদেশি লিলির বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ রয়েছে সালমা বিনতে নূরের ছাদবাগানে। সেখানে লিলি জিরোন্ডে জাতের হলুদ ফুল, ব্ল্যাক আউট জাতের কালো ফুল আর টরন্টো জাতের গোলাপি ফুল, লিলিয়ামের আবাদিত জাত, এশিয়াটিক লিলির অনেকগুলো রকমফের, অরেঞ্জ সভরেইন অ্যামারিলিস, অ্যামারিলিস প্যাপিলিও বাটারফ্লাই, অ্যামারিলিস এক্সোটিক পিকক, পিংক অ্যামারিলিস বেলাডনা, ব্ল্যাক পার্ল ইত্যাদি ফুল বাগান সুশোভিত করে তুলেছে। আমাদের বহুল পরিচিত লিলির মধ্যে রয়েছে গুলনার্গিস বা ডে-লিলি, ফায়ারবল লিলি, অ্যামারিলিস লিলি, কার্ডওয়েল লিলি ইত্যাদি।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন