নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রাক-স্বাধীনতা যুগের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ঈশ্বরদীর পাকশী রেলওয়ে হাসপাতাল। পদ্মা নদীর তীরে ৩ একর জমির ওপর নির্মিত শতবর্ষী এই সেবা প্রতিষ্ঠানটি আজ তীব্র জনবলসংকট, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব ও চরম অব্যবস্থাপনায় অতীত জৌলুস হারিয়ে প্রায় পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। একসময় যেখানে রোগী সামলাতে চিকিৎসক ও সেবিকারা ব্যস্ত সময় পার করতেন, সেখানে এখন কেবলই সুনসান নীরবতা। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় দুই বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ সেবা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৯০৯ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণকালে ‘পাকশী রেলওয়ে ডিসপেনসারি’ নামে এর যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬৩ সালে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত করে এর নতুন নামকরণ করা হয় 'রেলওয়ে হাসপাতাল পাকশী'। খুলনা থেকে হিলি এবং জয়দেবপুর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের রেলকর্মীদের চিকিৎসায় এটি ছিল প্রধান ভরসাস্থল।
বর্তমানে ৪৪ শয্যার এই হাসপাতালে ৮৬টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন। চিকিৎসকের পাঁচটি পদের বিপরীতে দুজন থাকলেও তাঁরা রাজবাড়ী ও রাজশাহীর বিভিন্ন হাসপাতালে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। ৬ জন সিনিয়র সেবিকার জায়গায় রয়েছেন মাত্র একজন। নেই কোনো গুদাম রক্ষক বা প্যাথলজিস্ট। গত ২৮ বছর ধরে হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ্য বরাদ্দ না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে রোগী ভর্তি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৯টা পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক বা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের সেবিকার পরামর্শে ওষুধ বুঝিয়ে দিচ্ছেন ফার্মাসিস্টরা। ঐতিহ্যবাহী মাতৃমঙ্গল ইউনিট ১৯৯০ সালে এবং ডায়রিয়া, যক্ষ্মা ও ময়নাতদন্তের কক্ষটি (মর্গ) ১৯৯৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কোনো গুরুতর রোগী এলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতাল কিংবা ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো ছাড়া কর্তৃপক্ষের উপায় থাকে না।
চিকিৎসা নিতে আসা রেলওয়ে কর্মচারীদের স্বজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কোনো রোগনির্ণয় পরীক্ষা ছাড়াই অনুমাননির্ভর ওষুধ খেয়ে তাঁদের চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, তীব্র জনবলসংকটই এই বেহাল দশার মূল কারণ। পাকশী বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (ডিএমও) ডা. মো. শাকিল আহমেদ ও বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও লোকবলের অভাবে সার্বিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. আনিছুল হক বলেন, পশ্চিমাঞ্চল রেলে ৩৭ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে মাত্র ৭ জন দায়িত্ব পালন করছেন। শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। লোকবল নিয়োগ পেলে দ্রুতই হাসপাতালটির সার্বিক চিকিৎসাসেবা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

