স্মরণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মরণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঈশ্বরদীতে ‘ভবঘুরে’র স্মরণে দোয়া -শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক: কবি, লেখক, বাংলা একাডেমির ফেলো এবং ঈশ্বরদী সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মজিবর রহমান বিশ্বাস ‘ভবঘুরে’র ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে।

বুধবার সকালে ঈশ্বরদী সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁর কবর জিয়ারত, দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিষদের সহসভাপতি জাহিদুল আলম সনু, সহসম্পাদক আতাউর রহমান বাবলু, কোষাধ্যক্ষ নূরুল ইসলাম বাবলু, সাংগঠনিক সম্পাদক ওহেদুজ্জামান টিপু, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুস সাত্তার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক পরিতোষ পাল, নির্বাহী সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই চৌধুরী মঞ্জু, আশিকুর রহমান লুলু, সদস্য আব্দুল মতিন এবং সাংবাদিক খোন্দকার মাহাবুবুল হক দুদুসহ অন্যরা।

পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সংগঠনের কার্যালয়ে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

মজিবর রহমান বিশ্বাস ১৯২৫ সালের ৫ মে ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা লক্ষ্মীকুণ্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি পাকুড়িয়া মাইনর ইংলিশ স্কুলে (বর্তমান পাকুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ, পাকশীতে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে ১৯৪৫ সালে মাধ্যমিক পাস করার পর সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়ন শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষও চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী ছিলেন।

কৈশোর থেকেই মজিবর রহমান বিশ্বাস সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৯ সালে ১৪ বছর বয়সে কৃষক সম্মেলনে অংশ নিয়ে বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন। কারাগারে ও মুক্তির পর নানা নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৫৩ সালে মুক্তির পর তাঁর লেখায় সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কমিউনিস্ট আদর্শে আস্থাশীল ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কারাভোগ করেছেন। এ ছাড়া কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ও জ্যোতি বসুর সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

মজিবর রহমান বিশ্বাসের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অচেনা মানুষের ইতিকথা, শঠতা জীবন দর্শন নয়, সাতলাঠির কথা, দীপান্বিতা, বোবা কাহিনি যা স্বাধীনতাউত্তরকালের, আমরা ক'জন স্কুল মাস্টার এবং কৃষক শ্রমিক সমস্যা।

মজিবর বিশ্বাস: গুণী চিনে ভুল করা এক সমাজের আখ্যান

মুজিবুর রহমান বিশ্বাস

ইমাম গাজ্জালী: আজ ১ জুলাই। ১৯৮৯ সালের এই দিনে রোগে ভুগে, অনাদরে-অবহেলায় আর বিনা চিকিৎসায় পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন এক অনন্য মানুষ। তিনি চারণ বুদ্ধিজীবী মুজিবুর রহমান বিশ্বাস। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। প্রিয় শিক্ষকের প্রয়াণদিবসে আমাদের গভীর অনুশোচনা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা।

তখনকার দিনে সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল ধোপাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন মুজিবুর রহমান বিশ্বাস। তবে তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক বিদগ্ধ সাহিত্য সাধক, লেখক এবং বাংলা একাডেমির ফেলো।

এই জ্ঞানতাপসের চালচলন, বেশভূষা আর জীবনযাপন অন্য দশটা মানুষের মতো ছিল না। তাঁর খাদ্যতালিকা ছিল ভীষণ সাধারণ—নরম ভাতে পেঁপে সিদ্ধ আর সামান্য লবণ ছিটিয়েই সেরে নিতেন আহার। তবে নিয়মিত দুধ খেতেন। পরতেন ঢিলেঢালা পায়জামা-পাঞ্জাবি, যা সব সময় খুব একটা পরিষ্কারও থাকত না। কাঁধে ঝোলানো থাকত একটা চটের ব্যাগ, যার ভেতর সারাক্ষণ ঠাসা থাকত বই, খাতা আর কলম। তিনি ছিলেন এক আত্মভোলা মানুষ, সারাক্ষণ ডুবে থাকতেন বইয়ের পাতায় আর নিয়মিত লিখতেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের গ্রামীণ সমাজ এই মহান মানুষকে গ্রহণ করতে পারেনি, বোঝেনি তাঁর ভেতরের মূল্য। উল্টো সমাজ তাঁকে দিয়েছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, উপহাস আর ঠাট্টা-মশকরা। পদে পদে তিনি অপমান, অপদস্থ আর লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। লোকে তাঁকে ডাকত 'মজিবর পাগলা' বলে। সেই যন্ত্রণার কথা বারবার ফুটে উঠেছে তাঁর নিজের লেখায়। তিনি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন: 'কোনো সমাজই কি একটা প্রতিভাকে এইভাবে ধ্বংস করে দেয়? প্রতিভার অবদান নিতে অস্বীকার করে কি? আমি আমার জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করেছি।' 

ব্যক্তিগত জীবনে মুজিবুর রহমান বিশ্বাস বিয়ে করেছিলেন, তবে সেই সংসার টেকেনি। তিনি ছিলেন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ সদস্য। পার্টির জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কাকতালীয়ভাবে, সেই একই জেলে বন্দি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কারাজীবনের সেই দিনগুলোতে দুজনের মধ্যে এক চমৎকার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন 'জেল মিতা' 

মুজিবুর রহমান বিশ্বাসের জন্ম ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীর লক্ষ্মীকুণ্ডা গ্রামে। নিজের জন্মস্থানের প্রতি তাঁর ছিল অসীম অনুরাগ ও ভালোবাসা। সেখানকার সমাজের অনগ্রসরতা ও দুর্দশা তাঁকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করত। ঈশ্বরদীকে ঘিরে তিনি আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখতেন। তিনি চেয়েছিলেন সেখান থেকেই বাঙালির রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ভিত্তি তৈরি করতে।

তাঁর ‘জন্মদিনের কবিতা’ নামের বইয়ে ঈশ্বরদীকে নিয়ে তাঁর সেই আকুলতা স্পষ্ট ধরা পড়ে:  'আমি ঈশ্বরদীর কাছে মানবতা ভিক্ষা চাইছি। পুরবাসী ভিক্ষা দাও বলে আর কত কাতর মিনতি জানাব। ঈশ্বরদী আমাকে চায় না, কিন্তু আমি ঈশ্বরদীকে চাই। আমি ঈশ্বরদীকে মাতা ছাড়া অন্যরূপে ভাবতে পারি না। ঈশ্বরদী যে আমার কাছে মাতৃস্বরূপা...' 

তিনি আরও লিখেছিলেন: '...কই, গত ত্রিশ-চল্লিশ বছরে একটা বড় আকারের সাহিত্য জমায়েত তো হলো না ঈশ্বরদীতে! অথচ আমি ঘরে ঘরে মানুষের সেবা করতে গেলে তারা পা সরিয়ে নেন। বর্তমান সমাজে জীবনের মৌলিক সারল্য বলতে কিছু নেই। ঈশ্বরদী থানার সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে আমার একটি আবেদন আছে—আমি ঈশ্বরদীকে কেন্দ্র করে একটি 'এশিয়া ফাউন্ডেশন' গঠন করতে চাই।' 

সমাজের হীনতা, নিচতা আর সংকীর্ণতা দেখে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটা সমাজের শিক্ষিত মানুষেরা কতটা রক্ষণশীল আর আত্মকেন্দ্রিক হতে পারে, তা কি কেউ ভেবে দেখেছে? মৃত্যুর আগে এক বুক কষ্ট নিয়ে এই সাধক লিখে গেছেন: আমি মহান, অখণ্ড ও অনন্যসাধারণ জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম। এই-ই আমার অপরাধ। এর বিনিময়ে সমাজের কাছে কী পেয়েছি? দয়া, মায়া, স্নেহ, মমতা—কিছুই পাইনি। আমি দেশের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলাম, এটাই আমার অপরাধ।'

শিশুর মতো সরল মন নিয়ে যে মানুষটি আজীবন মানুষের জন্য কাজ করতে চাইলেন, সমাজ তাঁকে কেবল অবহেলাই ফিরিয়ে দিল। গুণীর কদর করতে না পারার এই ব্যর্থতা ও দায় আমাদের সমাজের। আজ এই গুণী শিক্ষকের প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: সাংবাদিক 

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন