শহীদ জিয়া: সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়ক

আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভান: ৩০ মে ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ক্ষণজন্মা এই নেতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শুধু অংশই নেননি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সামরিক ও বেসামরিক জনগণকে সংগঠিত করতেও ভূমিকা রেখেছিলেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের কারণে তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় অধ্যায়। একজন সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা মূলত ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। প্রথমে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালে তাঁর সমর্থনে জাগদল গঠিত হয়। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা প্রবর্তন করেন। এটি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ থেকে ভিন্ন একটি দর্শন, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ভূখণ্ডভিত্তিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতায় সংবিধানে কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়, যার মধ্যে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ সংযোজন অন্যতম।

তাঁর শাসনামলে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন। ১৯৭৫ সালের প্রবর্তিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) বিলুপ্ত করে দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করেন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ এবং কৃষিতে সেচব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নেন। তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের অংশ নেওয়া নিশ্চিত করতে চালু করেন ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা।

পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক গঠনের প্রস্তাবদাতাদের অন্যতম হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি করে। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি এখনো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়েছে।

লেখকের মতে, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং কৃষি উন্নয়ন, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। লেখকের বিশ্বাস, এসব উদ্যোগে অনেকেই শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মপ্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখতে পান।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক,  পাকশী রেলওয়ে ডিগ্রী কলেজ। 

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন