উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু করোনার দ্বিগুণ

প্রতীকী ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদন:
দেশে করোনার পাশাপাশি এর উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। পাঁচ জেলার পাঁচটি বড় হাসপাতালের বিগত সাত দিনের চিত্র বলছে, এ সময় করোনা শনাক্ত রোগীর মৃত্যুর চেয়ে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন প্রায় দ্বিগুণ মানুষ।

এই পাঁচ জেলা হলো চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফেনী, বরিশাল ও ময়মনসিংহ। কোনো কোনো হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা শনাক্ত রোগীর মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি। যেমন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৮ জুলাই থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সাত দিনে করোনা শনাক্ত হয়ে মৃত্যু হয় ১৩ জনের। বিপরীতে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৫২ জন।

মোটামুটি একই চিত্র ফেনী জেনারেল হাসপাতালের। সেখানে ৭ দিনে ৯ জন শনাক্ত রোগীর মৃত্যুর বিপরীতে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয় ২৮ জনের। একই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা ৩৭, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৬২ জনের।

বিগত এক সপ্তাহে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৭৭ জন। আর করোনা শনাক্ত রোগী মারা গেছেন ৪৬ জন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা শনাক্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা ১৫, উপসর্গ নিয়ে ১৯ জনের।

এর বাইরে খুলনার পাঁচটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে গত এক সপ্তাহে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন চারজন রোগী। আর করোনায় মারা গেছেন ৩৩ জন। অবশ্য কিছুদিন আগেও খুলনায় উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা বেশি ছিল।

হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, করোনার উপসর্গ নিয়ে যাঁরা মারা যান, তাঁদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করা হয় না অথবা পরীক্ষার ফলাফল আসার আগেই রোগীর মৃত্যু হয়। এর একটি কারণ নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে চাপ অনেক বেশি। জেলা পর্যায়ে এক বা দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষা করা ও ফলাফল পাওয়া দুষ্কর। গ্রামের মানুষ রোগীদের এমন সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যান, যখন অবস্থা গুরুতর পর্যায়ে চলে যায়। এতে পরীক্ষা ও ফল পেতে সময় পাওয়া যায় না।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের আরটি-পিসিআর পরীক্ষাগারের দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা ১৮৮টি। সেখানে দিনে ৪৫০ থেকে ৬০০ নমুনা জমা পড়ছে। চাপ বেশি বলে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মাইক্রো ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম আকবর কবির বলেন, নমুনা পরীক্ষার চাপ বেশি বলে অনেক নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হয়। ঢাকায় নেওয়া, পরীক্ষা ও ফল পেতে অনেক সময় লেগে যায়।

উপসর্গ নিয়ে মৃতের তালিকায় যাঁদের নাম ওঠানো হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেশি পাওয়া যায়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এসব রোগীর জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো উপসর্গও থাকছে। তবে তা শুরুর দিকে বেশি দেখা যায়। পরে রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে স্বজনেরা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। অবশ্য কারও কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, গলাব্যথা, ঘ্রাণশক্তি না থাকা ও স্বাদ না পাওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

খুলনায় করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের একজন জিনাত আলী ফকির। তাঁকে গত ৭ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর ছেলে মো. জাকারিয়া বলেন, ‘বাবা খুব বেশি অসুস্থ ছিলেন না। ৮ জুলাই সকালে বাবার করোনার নমুনা দেওয়া হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর তিনি মারা যান। মৃত্যুর দুই দিন পর মুঠোফোনে খুদে বার্তা আসে যে বাবা করোনা পজিটিভ ছিলেন।’

কারও কারও ক্ষেত্রে সব উপসর্গ থাকার পরও পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ আসছে বলে উল্লেখ করেন ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগীরা শ্বাসকষ্ট, কাশিসহ খুব খারাপ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের করোনার সব উপসর্গ থাকে। তবে আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় কোনো কোনো করোনা শনাক্ত হয়নি বলে দেখা যায়।

সারা দেশেই উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বাড়ছে

করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের (সিজিএস) প্রতিবেদনেও। সংস্থাটি দেশে মহামারির শুরু থেকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করোনা নিয়ে দুই সপ্তাহ পরপর প্রতিবেদন দিয়ে আসছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ১৯ মার্চ থেকে এ বছরের ৬ জুলাই পর্যন্ত সময়ে করোনার উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ২ হাজার ৯৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২৩ জুন থেকে ৬ জুলাই—এই দুই সপ্তাহে। এ সময় সারা দেশে উপসর্গ নিয়ে ৪৮৬ জন মারা যান।

সিজিএস বলছে, করোনার উপসর্গ নিয়ে এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মৃত্যু কম ছিল। তবে জুন থেকে তা বেড়েছে। সিজিএসের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দেশে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়েছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

‘দাফনের আগে হলেও পরীক্ষা করাতে হবে’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর বিষয়ে ঢিলেমি দেখা গেছে। পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রোগীকে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। রোগী করোনায় মারা গেলেন কি না, তা শনাক্ত করা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বুঝতে পরীক্ষা করা দরকার।

করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম  বলেন, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হলে অবশ্যই দাফনের আগে হলেও করোনার পরীক্ষা করাতে হবে। ফলাফল অনুযায়ী ওই ব্যক্তির আশপাশের মানুষকে সতর্ক করা জরুরি। অনেকেই অবশ্য পরীক্ষার সে সুযোগ পাচ্ছেন না।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন