![]() |
| রাজধানীর মগবাজারে বিস্ফোরণ। ফাইল ছবি |
নিজস্ব প্রতিবেদন: রাজধানীর মগবাজারে বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ভবনটিতে গ্যাসলাইনের কোনো সংযোগ ছিল না। নিচতলায় যেখান থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেই শরমা হাউসের গ্যাসের সিলিন্ডার অক্ষত আছে; বিস্ফোরিত হয়নি। নাশকতার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এমন বোমা বা বিস্ফোরকের কোনো অস্তিত্বও ঘটনাস্থলে মেলেনি। এই অবস্থায় বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে সরকারের একাধিক সংস্থার ধারণা, এই ভবন বা আশপাশের স্যুয়ারেজ লাইন অথবা অন্য কোনো উৎস থেকে সৃষ্ট গ্যাস ভবনের আবদ্ধ কোনো স্থানে জমে গিয়েছিল। তা কোনোভাবে আগুন বা আগুনের স্ফুলিঙ্গের (স্পার্ক) সংস্পর্শে আসায় বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা একাধিক বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেছেন, বিস্ফোরণস্থলে মিথেন গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেছে। স্যুয়ারেজের আবর্জনা ও স্তূপ করে রাখা ময়লা থেকে সাধারণত মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়।
গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর মগবাজার ওয়্যারলেস গেট এলাকায় এই বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত সাতজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। এখনো আটজন চিকিৎসাধীন আছেন। বিস্ফোরণে মূল সড়কের পাশে তিনটি ভবন প্রায় বিধ্বস্ত হয়। আশপাশের অন্তত সাতটি ভবনের কাচ উড়ে গেছে। দুমড়েমুচড়ে গেছে রাস্তায় থাকা তিনটি বাস।
এ ঘটনায় গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, পুলিশ সদর দপ্তর এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আলাদা কমিটি করেছে। কমিটির সদস্যরা গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা সাংবাদিকদের বলেছেন, বিস্ফোরণে ঘটনাস্থল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরণের কারণ ও উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে গ্যাস কীভাবে এবং কোথায় জমেছে, এখনই নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলে হাইড্রোকার্বন গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সব ধরনের গ্যাসেই হাইড্রোকার্বন থাকে বলেও জানান তাঁরা। পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি ছিল। আর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, ওই ভবনসহ আশপাশের তিনটি ভবনে গ্যাসের কোনো সংযোগ নেই।
৭ জনের মৃত্যু, আহত ৩ জন আশঙ্কাজনক
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পুলিশ গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। কিন্তু রোববার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে ওসমান গনি তুষার (২৬) নামের শরমা হাউসের এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ায় সরকারি হিসাবে তাঁর নাম নেই। ওসমানসহ এই ঘটনায় সাতজন মারা গেলেন।
শরমা হাউসের মালিক এম এ রহমান জানান, ওসমান গনি দুই বছর ধরে তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাঁর লাশ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে পাঠানো হয়েছে। ওসমান গনি আহত অবস্থাতেই রাতে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন বলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেকর্ডও বলছে। তবে পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন অর রশীদ বলছেন, এই মৃত্যুর কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের তথ্যমতে, বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ৪১ জন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এক নারী মারা যান। পরে চারজনকে বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে কামিল, হৃদয় ও শামীম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়েছিলেন ১৭ জন। এখন ৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁরা হলেন মো. নুর নবী (৩০), ইমরান হোসেন (২৫), মো. রাসেল (২১), আবু কালাম (৩৩) ও জাফর আহামেদ (৬১)। তাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
শরমা হাউসের পাশের ভবনের দোতলায় রয়েছে লাবণী মাস্টার টেইলার্স। এর স্বত্বাধিকারী মাকসুদ আলম বলেন, ‘ঘটনার সময় দোকানের সামনে মূল রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ সব ওলটপালট করে দেয়। আমি উড়ে গিয়ে চার ফুট দূরে পড়ি। পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। চারদিক ধুলায় ভরে যায়। আমার হাত কেটে যায়। দেখি মানুষ ছোটাছুটি করছে। তাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। রাস্তায় কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে ছিল। বাসের যাত্রীরা রক্তাক্ত অবস্থায় ছোটাছুটি করছিল। আমি বেঁচে গেছি, এটাই অবাক লাগছে।’
শরমা হাউসের মালিক এম এ রহমান বলেন, তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন। ঘটনা জানার পর ঢাকায় আসেন। ওই সময় তাঁর দোকানে দুজন কর্মী এবং দুজন গ্রাহক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কর্মীসহ তিনজন মারা গেছেন।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মগবাজারের আউটার সার্কুলার রোডের ৭৯ নম্বরে বিধ্বস্ত ভবনটির নিচতলা এবং পেছনের অংশ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কয়েকটি পিলার উড়ে গেছে। ভবনের নিচতলায় শরমা হাউস এবং বেঙ্গল মিট নামের মাংস বিক্রির প্রতিষ্ঠান ছিল। তিনতলায় ছিল সিঙ্গারের শোরুম। ভবনটির সামনের সড়কে দুমড়েমুচড়ে পড়ে ছিল তিনটি যাত্রীবাহী বাস। বাসগুলোর ভেতরে ও বাইরে রক্তের দাগ দেখা গেছে। পরে অবশ্য বাস তিনটি পুলিশ সরিয়ে নেয়।
বেঙ্গল মিটের হেড অব রিটেইল আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনার সময় তাঁদের ওই বিক্রয়কেন্দ্রে দুজন কর্মী কাজ করছিলেন। রাসেল ও ইমরান নামের ওই দুই কর্মীই দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, মাংস বিক্রি করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানটিকে সার্বক্ষণিক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রাখতে হয়। এ কারণে সেন্ট্রাল এসি এবং বিদ্যুতের সংযোগ চালু রাখতে একটি জেনারেটর রয়েছে। এসি ও জেনারেটর অক্ষত অবস্থায় আছে।
নিরাপত্তাকর্মী নিখোঁজ
বিস্ফোরণের পর থেকে ওই ভবনের নিরাপত্তাকর্মী হারুনর রশিদ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর মেয়ে হেনা বেগম। বাবার খোঁজে তিনি এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। বাবাকে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে বলছেন, ‘আমার বাবাকে খুঁজে দেন।’ হারুনর রশিদ যে ভবনে বিস্ফোরণ হয়, সেখানে তিনি প্রায় আড়াই বছর ধরে চাকরি করেন। সেখানে সিঁড়িঘরে তিনি থাকতেন। সেটা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। রমনা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একজন নিখোঁজের বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
চার সংস্থার তদন্ত
ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল জিল্লুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন দেবে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আব্দুল হান্নানকে প্রধান করে করা কমিটি আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি করা হয়। তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা) ও তদন্ত কমিটির সদস্য দিনমনি শর্মা বলেন, ‘ভবনে গ্যাসের কোনো সংযোগ ছিল না। আমরা ঘটনার জন্য স্যুয়ারেজ লাইনের গ্যাসকে সন্দেহ করছি। স্যুয়ারেজ লাইনটা গেছে ভবনের পেছন দিয়ে। একটা ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা পাওয়া গেছে। সেখান থেকে গ্যাস উৎপন্ন হয়ে কক্ষের ভেতর পুঞ্জীভূত হতে পারে। বিস্ফোরণটা ভবনের পেছনের অংশে বড় হয়েছে।’ তিনি জানান, শরমা হাউসে থাকা দুটি সিলিন্ডার অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঘটনাস্থলে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হাইড্রোকার্বন হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি উপাদান। তবে শুধু গ্যাস থেকে এত বড় বিস্ফোরণের ঘটনা অস্বাভাবিক। পুরো ঘটনাস্থল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
সকালে ঘটনাস্থলে যান পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিস্ফোরণে বড় ধরনের শক ওয়েভ তৈরি হয়েছিল। তবে এটা ছিল একমুখী। এটা নাশকতা নয়, নাশকতা হলে বিস্ফোরণ চারপাশ ক্ষতিগ্রস্ত করত। তিনি বলেন, ‘ভেতরে এখনো মিথেন গ্যাসের গন্ধ আছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত পেলে বিষয়টি বোঝা যাবে।’
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহ বলেন, শরমা হাউস এবং এর দুই পাশের ভবনে তিতাসের কোনো গ্যাস–সংযোগ নেই। ঘটনাস্থলে এলপিজির সিলিন্ডার দেখতে পেয়েছেন তিতাসের তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক এবং বর্তমানে সেফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খানও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা সবার জন্য সাবধানবার্তা। সঠিক নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা না থাকলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমরা ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি ও বিস্ফোরণের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করেছি। ঘটনাস্থলে আমরা ৮/৯ শতাংশ মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছি।’

