কোন্দল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কোন্দল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঈশ্বরদীতে বিএনপির দুই গ্রুপের মুখোমুখি অবস্থান: পদ্মার বালুমহল-আধিপত্য নিয়ে চরম উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈশ্বরদীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও পদ্মা নদীর বালুমহলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মুখামুখি অবস্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও মানববন্ধনের ঘটনায় যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। অস্থিতিশীলতা নিরসন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তাঁরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের অনুসারী ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান (হাক্কে মণ্ডল)-এর সমর্থকেরা ঈশ্বরদী-বাঘা আঞ্চলিক মহাসড়কের আরামবাড়িয়া বাজার এলাকায় একটি মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেন। উক্ত মানববন্ধনে স্থানীয় অধিবাসীদের পাশাপাশি বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় সন্ত্রাসী জুয়েল ও বিপুর বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সামাজিক নৈরাজ্য সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগ আনেন। অনতিবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান তাঁরা।

এর আগে টানা দুই দিন জাকারিয়া পিন্টুর সমর্থকেরা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মানববন্ধন করে হাসিবুর রহমান হাক্কে মণ্ডলের অনুসারীদের বিরুদ্ধে পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের পাল্টা অভিযোগ তোলেন।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন যুবদল নেতা হেকমত উল্লাহ (কনক মণ্ডল)। তাঁর ভাষ্যমতে, তাঁরা আইনসম্মত উপায়ে বালু ক্রয় করে বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে পিন্টুর সমর্থকেরা তাঁর বাবা হাসিবুর রহমান ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। কনক মণ্ডল আরও অভিযোগ করেন, নদীর বালুমহলের দখলদারত্বকে কেন্দ্র করে অতীতেও জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারীরা একাধিকবার সশস্ত্র সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, পিন্টু সমর্থিত ছাত্রদল নেতা ইকবাল হোসেন ও প্রিন্স মাহমুদ জানান, এলাকায় একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়েই তাঁরা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন।

আরামবাড়িয়া এলাকার মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন স্থানীয় সংগঠক তহিদুল ইসলাম, সাব্বির হোসেন, জয় ইসলাম, যুবদল নেতা আতাউর রহমান, মনোয়ার হোসেন, সাজেদুল হোসেন, আকরাম হোসেন, জাকারিয়া সেন্টু এবং মহিলা দলের নেত্রী আনজু খাতুন ও রনিফা বেগম।

এলাকাবাসীর অনুযোগ, পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন ও এলাকাভিত্তিক প্রভাব খাটানো নিয়ে দলটির দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। প্রায়শই ফাঁকা গুলি বর্ষণ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে একাধিক পয়েন্টে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। তবে সুযোগ বুঝে অসাধুচক্র পুনরায় তৎপর হওয়ার চেষ্টা করে। সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলন ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জোরদার রাখা হয়েছে।’

ঈশ্বরদীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘাতে বাড়ছে অস্থিরতা ও আতঙ্ক


নিজস্ব প্রতিবেদন:  ঈশ্বরদীতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন কেবল দলীয় বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত দুই বছর ধরে দলটির স্থানীয় দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও অস্ত্রের মহড়া জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের পাশাপাশি বালুমহাল, ঝুট ব্যবসা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন স্ট্যান্ড এবং মাদক ব্যবসার দখল নিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম শরিফকে লক্ষ্য করে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনার জন্য পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন ভুক্তভোগী শরিফ।

এর আগে গত ১৭ আগস্ট মাথা ও শরীরে কাফনের কাপড় জড়িয়ে এবং হাতে অস্ত্র নিয়ে ঈশ্বরদী শহরের বিভিন্ন সড়কে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ ওঠে হাবিবপন্থী সাবেক ছাত্রদল নেতা জুবায়ের হোসেন বাপ্পীর বিরুদ্ধে। এই ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ও দলীয় নেতাকর্মীরা থানার সামনে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে পরদিন জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারীরা থানা ঘেরাও করেন।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারীদের মধ্যকার এই বিরোধ দীর্ঘদিনের। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সেই সুপ্ত কোন্দল প্রকাশ্য সংঘর্ষ ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের রূপ নেয়।

এর পরদিনই সাহাপুরের জিগাতলায় ছাত্রদল কর্মী শচীন বিশ্বাসকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর ২৯ আগস্ট দুই পক্ষের মধ্যে ফের গুলিবিনিময় ঘটে। পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর আরামবাড়িয়া বাজারে যুবদল নেতা সোহান পারভেজ বিপু এবং ১২ ও ১৩ নভেম্বর পাকশী ইপিজেড ও মাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। ৮ ডিসেম্বর পাকশীর বাঘইল কাঁঠালতলায় সংঘর্ষে হাবিবপন্থী যুবদল কর্মী হাজি সেলিমসহ দুজন এবং ১৩ ডিসেম্বর চরাঞ্চলের খাসজমি দখল নিয়ে সংঘর্ষে আরও একজন আহত হন।

২০২৫ সালজুড়ে এই সহিংসতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। ১ ফেব্রুয়ারি সাঁড়া ইউনিয়নের মাজদিয়ায় এবং ১১ ফেব্রুয়ারি সাবেক মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলুর কারামুক্তির আনন্দ মিছিলকে কেন্দ্র করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১২ ও ১৩ এপ্রিল ঈশ্বরদী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা এবং দাশুড়িয়ার ট্রাফিক মোড়ে সিএনজি স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

পরবর্তীতে ২১ এপ্রিল ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সামনে সংঘর্ষ, ৩০ এপ্রিল গুলি বর্ষণ, ২২ মে সাঁড়ার বালুরঘাট এবং ৫ জুন সাঁড়াঘাটের বালুমহাল দখল নিয়ে ৪০ থেকে ৫০ রাউন্ড গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ১১ জুন রূপপুর প্রকল্প এলাকা, ৩০ জুন মাদক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, এবং ৪, ১২ জুলাই ও ২১ জুলাই পদ্মা নদীর বালুরঘাট ও সাহাপুরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বছরের শেষভাগে ৩ ও ৬ অক্টোবর এবং ২৮ অক্টোবর ইপিজেডে টেন্ডার জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে অস্ত্রসহ মহড়ার অভিযোগ ওঠে।

চলতি বছরেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ২৮ জানুয়ারি জাকারিয়া পিন্টুর নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর, ৪ ফেব্রুয়ারি বাচ্চু হোসেনকে মারধর এবং ১২ ফেব্রুয়ারি আরামবাড়িয়া বাজারে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। ২৩ মার্চ রেলগেট ও পোস্ট অফিস মোড়ে ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে ফুল দেওয়া নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও পুলিশের হস্তক্ষেপে বড় সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়।

তবে ২ এপ্রিল রাতে পিন্টুপন্থি ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেন সোহাগকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ২০ এপ্রিল পাকশীতে গাড়ি ভাঙচুর, ২৫ এপ্রিল মাদক বিরোধে গুলিবর্ষণ, ২৭ নাজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে হামলা, ৩ মে চররূপপুরে মারধর, ৫ মে স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য রবিনকে ছুরিকাঘাত এবং ৯ জুন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি আব্দুল খালেক খাঁকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ৩০ জুন সলিমপুরে একটি স্কুলের বিদায় অনুষ্ঠানে হামলা এবং ২১ জুলাই ঝুট ব্যবসার দুটি ট্রাক ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এই অস্ত্রের মহড়া ও সহিংসতার শিকার হয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

জাকারিয়া পিন্টুর ভাই ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব মেহেদী হাসান বলেন, ধারাবাহিক অস্ত্রবাজি ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় জননিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। অস্ত্রধারীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও একটি পক্ষ তাদের ছাড়িয়ে নিতে প্রভাব খাটায়।

তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, অহেতুক বিভিন্ন অনৈতিক ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়ানো হচ্ছে। পিন্টুর চার ভাই দল থেকে বহিষ্কৃত এবং মূলত তারাই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

সার্বিক বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশাদুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমনটি বলার অবকাশ নেই।


স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন