প্রশাসনিক জবাবদিহিতে ন্যায়পালের প্রয়োজন

আ ফ ম রাজিবুল আলম ইভান: সারা দেশে সরকারি সেবায় দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে নাগরিকদের পক্ষে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা দেওয়ার মতো একটি শক্তিশালী, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সময়ের দাবি।

ন্যায়পাল বা ওমবুডসম্যান হলো একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। নাগরিক অধিকার রক্ষা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সহজভাবে বললে, কোনো সরকারি দপ্তরের বৈষম্যমূলক বা অন্যায্য আচরণের শিকার হলে নাগরিকেরা যাতে সরকারের প্রভাবের বাইরে থেকে অভিযোগ জানাতে ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ পান, ন্যায়পাল সেই ব্যবস্থাই নিশ্চিত করে।

সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ এবং তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা ন্যায়পালের অন্যতম দায়িত্ব। প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে নজরদারি রাখা এবং কেউ যাতে আইনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে না পারে, সেটিও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

তদন্তে কোনো অনিয়ম বা প্রশাসনিক ত্রুটি প্রমাণিত হলে তা সংশোধনে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশ করতে পারেন ন্যায়পাল। তিনি কোনো মন্ত্রী বা আমলার অধীনে কাজ করেন না। স্বাধীনভাবেই দায়িত্ব পালন করেন।

সাধারণ মানুষ সহজ প্রক্রিয়ায়, অনেক ক্ষেত্রে বিনা খরচে অভিযোগ জানাতে পারেন। আবার গুরুতর কোনো প্রশাসনিক অনিয়ম নজরে এলে ন্যায়পাল নিজ উদ্যোগেও তদন্ত শুরু করতে পারেন। এই ক্ষমতাকে বলা হয় স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত বা সুয়ো মোটু।

আধুনিক ন্যায়পাল ব্যবস্থার সূচনা সুইডেনে। ১৯০৯ সালে দেশটি এ ব্যবস্থা চালু করে। পরে ফিনল্যান্ড ১৯২০, ডেনমার্ক ১৯৫৫ এবং নরওয়ে ১৯৬২ সালে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে এই ব্যবস্থা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ১৯৬৭ সালে ‘পার্লামেন্টারি কমিশনার ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ পদ চালু করা হয়। সেখানে নাগরিকেরা সাধারণত সরাসরি অভিযোগ না করে সংসদ সদস্যের মাধ্যমে অভিযোগ জানান। এ ব্যবস্থা ‘এমপি ফিল্টার’ নামে পরিচিত।

নিউজিল্যান্ড ১৯৬২ সালে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম ন্যায়পাল ব্যবস্থা চালু করে। পরে ১৯৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়া ফেডারেল পর্যায়ে ‘কমনওয়েলথ ওমবুডসম্যান’ নিয়োগ দেয়।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ভারতে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লোকপাল এবং রাজ্য পর্যায়ে লোকায়ুক্ত আইন করা হয়। পাকিস্তানে ১৯৭৮ সালে এবং ফিলিপাইনে ‘তানদবায়ান’ নামে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান চালু হয়। এসব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্তে ভূমিকা রাখছে।

ন্যায়পালের হাতে সব ক্ষেত্রে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও তাঁর তদন্ত ও সুপারিশকে সাধারণত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রশাসনের ওপর জবাবদিহির চাপ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে। এর ভিত্তিতে ১৯৮০ সালে ন্যায়পাল আইনও প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু আইন হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত দেশে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ন্যায়পাল ব্যবস্থা চালু হয়নি। অতীতে ব্যাংকিং ন্যায়পাল বা কর ন্যায়পালের মতো কিছু খাতভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো স্থায়ী রূপ পায়নি।

দেশের ভূমি অফিস, বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা পাসপোর্ট কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা বা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানোর মতো সাহস, সময় ও আর্থিক সামর্থ্য সবার থাকে না।

অন্যদিকে আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগা এবং আইনি প্রক্রিয়ার ব্যয় অনেক নাগরিকের জন্য বড় বাধা। এ বাস্তবতায় ন্যায়পাল হতে পারে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার একটি মাধ্যম। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অবহেলা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে ন্যায়পালের প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের ব্যবস্থা থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়তে পারে। এর ফলে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমানোর সুযোগও তৈরি হবে।

ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান কার্যকর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। দলীয় বিবেচনায় কোনো অনুগত ব্যক্তি কিংবা অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে এই পদে বসানো হলে শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তখন নাগরিক অধিকার রক্ষার বদলে এটি রাজনৈতিক প্রভাবের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন বা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনিক হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে ন্যায়পাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে শুধু একটি পদ সৃষ্টি করলেই হবে না। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে মুক্ত রাখতে হবে এবং ন্যায়পালের সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় উপজেলা কিংবা আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত ন্যায়পাল ব্যবস্থার বিস্তার করা গেলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ হবে। এতে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের শাসনও শক্তিশালী হতে পারে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সচেতন নগরবাসী ফোরাম, ঈশ্বরদী

স্বত্ব © ২০২৬ সংবাদ সাতদিন