![]() |
| নিহত জাহিদুল টিপু ও প্রীতি | ফাইল ছবি |
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মতিঝিল আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু (৫০) হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এ নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব অনুযায়ী চলছে অভিযান। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলছেন, সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যে ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সে পেশাদার শুটার। তা না হলে এভাবে অতর্কিতে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ফাঁকা গুলি করে আতঙ্ক তৈরি করতো না। তার এলোপাতাড়ি গুলিতে রিকশার আরোহী সামিয়া আফনান প্রীতি (২২) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ওই শুটারকে চিহ্নিত করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার ইন্ধনদাতাদের চেনা যাবে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন দলীয় কোন্দল ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরেকটি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল টিপুর। যার সূত্র ধরে এ হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা টিপুর অনুসারীদের। মামলাতেও দলীয় কোন্দল বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন বাদী টিপুর স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত আসন ১, ১১, ১২ ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি। এছাড়া মোবাইল ফোনে হুমকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়।
টিপুকে চার-পাঁচ দিন আগে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। তবে গোয়েন্দারা বলছেন যারা এমনটা ঘটাবে তারা সাধারণত আগাম হুমকি দেয় না। তারপরও এটি যাচাই করা হচ্ছে।
গোয়েন্দারা বলছেন, ঘটনার সময় গাড়িতে অবস্থান করা আরও দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। চালককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসহ বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এছাড়াও টিপুর পরিবারের সদস্য এবং তার কাছের লোকজনদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। কারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
গোয়েন্দারা আরও বলছেন, পেশাদার শুটার না হলে এভাবে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল আহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এরই মধ্যে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
প্রীতির দাফন সম্পন্ন
দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী সামিয়া আফনান প্রীতির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (২৫ মার্চ) আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে শাহজাহানপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় প্রীতিকে। এর আগে শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় তার। ময়নাতদন্তে শরীরের এক পাশ থেকে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে বলে জানা যায়। নিহতের বাবা মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মেয়েকে কবরে রেখে এসেছি। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না। এ কষ্ট সারাজীবন সইতে হবে। আমরা কোনও মামলা করবো না। বিচার আল্লাহর হাতে দিয়ে রেখেছি।
টিপুর জানাজা অনুষ্ঠিত
মতিঝিল এজিবি কলোনি ঈদগাহ মাঠে শুক্রবার দুপুরে জাহিদুল ইসলাম টিপুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। পরে দাফনের জন্য গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয় তার মরদেহ। এর আগে ঢামেকে তার ময়নাতদন্ত হয়। টিপুর শরীর থেকে সাতটি গুলি উদ্ধার করা হয়।
মামলা
সামিয়া আফনান প্রীতির বাবা মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সন্তান হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করবেন না। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন শাহজাদপুর থানায়। সে মামলায় স্বামীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রীতি হত্যার ঘটনার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল আহাদ বলেন, মামলায় বাদী দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আমরা তদন্তে কাজ করছি। অপরাধীদের গ্রেফতার অভিযান চলছে।
এজাহারে যা আছে
মামলার (নং ১৮) এজাহারে ফারহানা ইসলাম ডলি উল্লেখ করেন, তার স্বামী গত ১০ বছর ধরে বৃহত্তর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি পাঁচবার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। মতিঝিল কাঁচাবাজারে গ্র্যান্ড সুলতান নামে একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে তার। মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন দলীয় কোন্দল ছিল। চার-পাঁচ দিন আগে অজ্ঞাতনামারা টিপুকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। প্রতিদিনের মতো ২৪ মার্চ সকালে তিনি ড্রাইভার মনির হোসেন মুন্নাকে নিয়ে হোটেলের উদ্দেশে রওনা হন এবং রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ডলি জানতে পারেন শাজাহানপুরে টিপুকে পরিকল্পিতভাবে এলোপাতাড়ি গুলি করে গুরুতর জখম করা হয়। দুস্কৃতকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করার সময় পাশের রিকশার আরোহী সামিয়া আফনান প্রীতির বুকের বাম পাশের উপরিভাগে গুলি লেগে জখম হয়। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার মুন্নার ডান হাতের কনুইয়ের নিচে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও রিকশার আরোহী মেয়েটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
মিল্কি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন টিপু
২০১৩ সালে রাজধানীর গুলশানে তৎকালীন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি ছিলেন জাহিদুল ইসলাম টিপু। এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় ওই ঘটনায় জেলও খেটেছেন তিনি। পরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত তাকে অব্যাহতি দেয়। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরই মতিঝিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান জাহিদুল ইসলাম টিপু।

