মাতৃভাষার চর্চা: প্রাণ ফিরছে মণিপুরি ভাষায়

মণিপুরি শিশুদের মণিপুরি বর্ণ ও ভাষা শেখানো হচ্ছে। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মঙ্গলপুরে মণিপুরি ল্যাংগুয়েজ সেন্টারে

আকমল হোসেন, মৌলভীবাজার: মণিপুরি জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে মণিপুরি ভাষাতেই কথা বলে। কিন্তু অনেকেই মণিপুরি বর্ণমালা পড়তে ও লিখতে পারে না। নিজের ভাষায় কথা বললেও সেটার মধ্যে বাংলা ভাষার প্রভাব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকায় দেশে মণিপুরি ভাষাচর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মণিপুরি ভাষা বিপন্ন হওয়ার পথে। এমন পরিস্থিতিতে মণিপুরি বর্ণমালায় পড়তে ও লিখতে পারা, মণিপুরি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল স্রোতোধারায় নিজেদের সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টায় মণিপুরি ভাষাচর্চায় নতুন প্রাণ ফিরেছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মণিপুরি–অধ্যুষিত গ্রাম এলাকায় মণিপুরি ল্যাংগুয়েজ সেন্টার (এমএলসি) মূলধারার পাঠ্যসূচির সঙ্গে দিচ্ছে মণিপুরি ভাষাশিক্ষা। এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪০০ শিক্ষার্থী মণিপুরি বর্ণমালা শেখার সুযোগ পেয়েছে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও অনেকেই নিজেদের উদ্যোগে মণিপুরি ভাষা শিক্ষা দিচ্ছেন।

মণিপুরি ল্যাংগুয়েজ সেন্টার পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রদীপ সিংহ বলেন, সেন্টারে আসা সবাই মণিপুরি ভাষায় পড়তে-লিখতে পারে। তারা আগে মণিপুরি বর্ণমালাই চিনত না। এই ভাষাচর্চায় অভিভাবকেরাও উদ্বুদ্ধ। কোভিডের কারণে কিছুটা ব্যাহত হওয়া ছাড়া কেন্দ্রে নিয়মিত ক্লাস হয়ে থাকে।


ইন্টিগ্রেটেড মণিপুরি অ্যাসোসিয়েশন ও বেসরকারি সংস্থা এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো) সূত্রে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলায় মণিপুরি–অধ্যুষিত ১৪টি গ্রামে প্রায় ১০ হাজার মণিপুরিভাষী মানুষের বসবাস। তারা নিজেদের মধ্যে মণিপুরি ভাষাতেই কথা বলে। তাদের প্রায় সবাই বাংলা হরফে কমবেশি মণিপুরি ভাষায় পড়তে ও লিখতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগই মণিপুরি বর্ণমালায় পড়তে ও লিখতে পারে না। তাদের কথার মধ্যে বাংলাসহ অন্য ভাষা সহজেই ঢুকে পড়ছে। এতে এই অঞ্চলের মণিপুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাঁটি মণিপুরি ভাষাচর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বাধা দূর করতে, মণিপুরি ভাষার সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরতে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মণিপুরি ভাষাকে বিপন্ন শ্রেণির ভাষা থেকে রক্ষা করতে একডো ২০১৫ সালে কমলগঞ্জের মণিপুরি–অধ্যুষিত ভানুবিল মাঝেরগাঁওয়ে স্থাপন করে মণিপুরি ল্যাংগুয়েজ সেন্টার। একডো নরওয়ের একটি দাতা সংস্থার সহযোগিতায় ‘এডুকেশন সাপোর্ট ফর মার্জিনালাইজড চিলড্রেন অ্যান্ড প্রমোটিং মণিপুরি ল্যাংগুয়েজ’ প্রকল্পের অধীনে প্রাথমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত মণিপুরি শিশুদের মণিপুরি বর্ণ ও ভাষা প্রশিক্ষণের জন্য এই কেন্দ্র স্থাপন করে। প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে কমলগঞ্জের আলীনগর ও আদমপুর ইউনিয়নের মণিপুরি–অধ্যুষিত এলাকায় তিনটি এমএলসিতে কার্যক্রম চলছে। এসব কেন্দ্রে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মণিপুরি শিক্ষার্থীরা শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন পাঠ্যসূচির পাশাপাশি মণিপুরি বর্ণমালা ও ভাষাশিক্ষা গ্রহণ করছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও কখনো ৩৫ থেকে ৪০ জনও হয়ে থাকে।

ইন্টিগ্রেটেড মণিপুরি অ্যাসোসিয়েশন (ইমা) কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান খোইরোম ইন্দ্রজিৎ বলেন, তাদের (এমএলসি) দেখাদেখি বিন্দা রানী দেবীসহ বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষক নিজেদের উদ্যোগে ভাষা শেখানোর কাজ করছেন। মণিপুর রাজ্যে সবকিছু মণিপুরি হরফে চলবে। এই সিদ্ধান্তও ভাষাশিক্ষায় গতি এনেছে।

একডোর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত মণিপুরিসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের নিজ নিজ ভাষায় পাঠদান চালু করা জরুরি।

স্বত্ব © ২০২৫ সংবাদ সাতদিন