![]() |
| আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিস ভবনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষে ৪৯ জনের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ পায়।ছবি: সংগৃহিত |
৪৯ জনের মরদেহ এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে রয়েছে। আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। তাঁরা ধারণা করছেন, হয়তো এই ৪৯ জনের মধ্যে তাঁদের স্বজন আছেন। ডিএনএ নমুনা মিললে তাঁরা অন্তত প্রিয়জনের লাশটি পাবেন।
পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, যেসব ব্যক্তি (স্বজন) ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে মর্গে থাকা মরদেহের ডিএনএর মিল পাওয়া গেলে লাশ হস্তান্তর করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর কারখানা ভবনের নিচতলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১৯ ঘণ্টার চেষ্টায় শুক্রবার দুপুরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনের ঘটনায় ৫২ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
আগুন লাগার পর ভবনে আটকে পড়া কয়েকজন ছাদ থেকে লাফ দেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিস ভবনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষে ৪৯ জনের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ পায়।
ভবনে আগুন লাগার পর নিখোঁজ থাকা শ্রমিকদের স্বজনেরা কারখানার আশপাশে জড়ো হন। তাঁরা সেখানে রাতভর অপেক্ষা করেন। পরদিন ভবনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষে ৪৯ জনের লাশ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা ভবনের কাছে ছুটে আসেন। যখন একে একে লাশ বের করে আনা হচ্ছিল, তখন তাঁরা নিখোঁজ স্বজনকে খুঁজতে থাকেন। নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে নিয়ে তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে তাঁরা ছুটে যান মর্গে।
একাধিক স্বজনের ভাষ্য, আগুনের ঘটনায় তাঁদের যে প্রিয়জন নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁরা চতুর্থ তলায় কাজ করতেন। আগুন লাগার পর তাঁরা ফোন করে পরিস্থিতি জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া চারতলা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম শ্রমিকদের সঙ্গেও তাঁরা কথা বলেছেন। তাঁরা জেনেছেন যে আগুন লাগার পর কারখানার চতুর্থ তলার চকলেট উৎপাদন বিভাগের ব্যবস্থাপক মাহাবুবুল আলম শ্রমিকদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই কর্মকর্তার পরামর্শই তাঁদের স্বজনদের জন্য কাল হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
কক্ষটিতে বসতেন মাহাবুবুল
চতুর্থ তলার যে কক্ষ থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়, সেখানে বসতেন মাহাবুবুল আলম। কারখানাটির একাধিক কর্মকর্তক এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে আগুনের ঘটনায় মাহাবুবুলের নামও রয়েছে নিখোঁজের তালিকায়।
গত শনিবার রাতে কারখানাটির প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘চকলেট উৎপাদন বিভাগের ব্যবস্থাপক মাহাবুবুল আলম নিখোঁজ আছেন। তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।’
গত রোববার কক্ষটিতে গিয়ে একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র দেখা যায়। যন্ত্রটি পুড়ে ছাই রং ধারণ করেছে। সেখানে একটি পোড়া ফ্রিজও দেখা যায়। এ ছাড়া কক্ষে ছিল অনেক পোড়া চকলেট।
মৌলভীবাজারের কঙ্কা বর্মণ নামের একটি কিশোরী চারতলায় কাজ করত। সে নিখোঁজের তালিকায় আছে। তার চাচাতো বোন কিশোরী তিথি সরকারও একই তলায় কাজ করত। সে ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছে। তিথি জানায়, কঙ্কা সেদিন মাহাবুবুল আলমের কক্ষে ছিল। আর সেসহ ১২ জন চারতলা থেকে বেরিয়ে ভবনের ছাদে চলে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস তাদের উদ্ধার করে।
তিথি সরকার বলে, ‘সেদিন কঙ্কাসহ অনেকে মাহাবুবুল স্যারের রুমে ছিল। স্যার সবাইকে ওই রুমে থাকতে বলেছিল। স্যার বলেছিল, রুমে এসি আছে। আগুন নিভে যাবে।’
কঙ্কার মা তিথি রানী বর্মণ বলেন, ‘আমার মেয়েসহ ৪৯ জন এক রুমে আগুনে পুড়ে মরল। মাহাবুবুল স্যার আমার মেয়েসহ অন্যদের এসি রুমে থাকতে বলেছিল বলে শুনেছি।’
কারখানা থেকে লাশ উদ্ধারের তৎপরতায় সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মনির হোসেন। তিনি বলেন, ‘চারতলার উত্তর-পশ্চিম কোণের একটি কক্ষে একসঙ্গে অনেকগুলো পুড়ে যাওয়া লাশ পড়ে থাকতে দেখি। এই দৃশ্য দেখে পুরোপুরি বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম।’
গত রোববার ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান ঘটনাস্থলে বলেন, একটি তলায় (চতুর্থ) কেন এতগুলো মানুষ পুড়ে মারা গেল, তা তদন্তের পর জানা সম্ভব হবে।
লোহার তারের দরজা
ছয়তলা ভবনের নিচতলা বাদে বাকি পাঁচটি ফ্লোরে ঢোকার পথে লোহার তারের দরজা রয়েছে। কেউ যদি লিফট বা সিঁড়ি ব্যবহার করে এই ফ্লোরগুলোতে ঢুকতে চান, তাহলে এই দরজা খুলে প্রবেশ করতে হয়।
কারখানায় কর্মরত অন্তত ১২ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিচতলা ও ছয়তলা বাদে বাকি চারটি ফ্লোরে চকলেট, বিস্কুট, কোমল পানীয়, লাচ্ছা সেমাইসহ নানা প্রকারের খাদ্যপণ্য তৈরি হতো। প্রতিটি ফ্লোরে ঢোকার পথে লোহার তারের বেড়া আছে। ফলে এক বিভাগের লোক অন্য বিভাগে সহজে যেতে পারত না। আর অধিকাংশ সময়ই এই দরজায় তালা মেরে রাখা হতো। চাবি থাকত সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে।
কারখানার একজন কর্মচারী বলেন, চুরি ঠেকাতে এই বেড়া দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। এক বিভাগের লোক আরেক বিভাগে যেতে তালা খুলতে হতো।
আগুন নেভানোর পর ভবনের বিভিন্ন তলায় লোহার তারের বেড়ায় তালা লাগানো দেখতে পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। গত রোববার ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান ঘটনাস্থলে বলেন, কারখানায় অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। আবার ভবনের অনেক ফ্লোরে লোহার তারের বেড়া দেখা যায়। তারের বেড়ায় তালাও দেখা গেছে।
বেঁচে যাওয়া কয়েক শ্রমিক জানান, সিঁড়ি দিয়ে চারতলা থেকে পাঁচতলায় যাওয়ার পথের দরজায় সেদিন তালা দেখা গেছে। পাঁচতলা থেকে ছয়তলায় যাওয়ার পথের দরজায়ও সেদিন তালা মারা ছিল। পাঁচতলায় আটকে পড়া কয়েকজন সেই তালা ভেঙে ছাদে চলে যেতে সক্ষম হন। ফলে তাঁরা সবাই বেঁচে যান।
আগুন লাগার খবর জানানো হয়নি
ভবনটির নিচতলার দক্ষিণাংশে তৈরি হতো কার্টন। উত্তর পাশে রাখা ছিল ফয়েল পেপার। কারখানায় আগুন লাগার বিষয়টি সবার আগে দেখেছিলেন নিচতলায় প্রবেশপথে দায়িত্বরত নিরাপত্তারক্ষী মোহাম্মদ ফাহাদ। তখন বিকেল ৫টা ৪৩ মিনিট। ঠিক কোন জায়গা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি। তবে তিনি জানান, আগুন যখন ফয়েল পেপারে লাগে, তখন তা দ্রুত ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে।
আগুনের লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী যখন ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন পর্যন্ত শ্রমিকদের কিছুই জানানো হয়নি। কারখানার একাধিক শ্রমিক এ কথা বলেন। তাঁদের ভাষ্য, আগুনের উত্তাপ ও কালো ধোঁয়া যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন শ্রমিকেরা। যাঁরা দুই তলার ফ্লোরে অবস্থান করেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বাঁচেন। তবে অনেকে আহত হন।
আগুনের একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, কেউ কেউ ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ছেন। অনেকে ছাদে আছেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ছাদ থেকে লোকজনকে নিচে নামিয়ে আনছেন।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেন, কারখানার ভেতর আগুন নিয়ন্ত্রণ বা আগুন লাগার তথ্য প্রতিটি ফ্লোরে জানানার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব নূর হাসান আহম্মেদ বলেন, ভবনে কীভাবে আগুন লাগল, কীভাবে তা বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ল, কেন চারতলার একটি কক্ষে ৪৯ জন পুড়ে মারা গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তদন্তে সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করা যায়।
তাহসিন সরকার বাঁধন/জেএইচ/এমএস

